শুক্রবার, নভেম্বর ৬, ২০২৬

৭ নভেম্বর: সার্বভৌমত্ব, জাতীয় সংহতি ও বাংলাদেশের ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণ

জহিরুল ইসলাম (জহির)

চেরাগি নিউজ ডেস্ক

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতার পর, আমাদের দেশের বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে বিশৃঙ্খলা এবং ক্ষমতার লড়াই শুরু হয়। রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড একটি সাধারণ বিষয় হয়ে উঠে। শিল্প-কল-কারখানা গুলোর উৎপাদনশীলতা স্বাধীনতার পূর্ববর্তী স্তরে ফিরে আসেনি। মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার মূল্যের সাহায্যের প্রবাহ সত্ত্বেও, বাংলাদেশে বৈদেশিক মুদ্রার তীব্র ঘাটতি ছিল। রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার কারণে দরিদ্রতম অসহায় মানুষের কাছে সাহায্য বিতরণ করা কঠিন হয়ে পড়েছিল। ১৯৭৪ সালে, খাদ্যশস্যের প্রাপ্যতা সত্ত্বেও এক ভয়াবহ বন্যার পর, দুর্ভিক্ষ শুরু হয় যার ফলে প্রায় দশ লক্ষ লোক মারা যায়। বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান পরিস্থিতি বাঁচানোর জন্য মরিয়া হয়ে সংবিধান সংশোধন করেন এবং স্বৈরশাসনকে “প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ “ করেন। বিচার বিভাগ ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা খর্ব করেন। বাকশাল তথা একদলীয় শাসনের কবলে পড়ে প্রিয় স্বদেশ। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীন মাতৃভূমি অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই বাকশালি স্বৈরাচারী শাসনের কবলে পড়ে।

সাংবিধানিক সংশোধনীর আট মাস পর, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরের দিকে এক অভ্যুত্থানে শেখ মুজিব তার পরিবারের সদস্যদের সাথে নিহত হন , যা দেশকে আরও গভীর অস্থিরতার দিকে ঠেলে দেয়। আওয়ামী লীগ তার সহকর্মীদের একটি অংশ, খুনিদের সমর্থনে, তার দীর্ঘদিনের বন্ধু খন্দকার মোশতাক আহমেদের নেতৃত্বে রাষ্ট্রের দায়িত্ব গ্রহণ করে।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ‘চেইন অব কমান্ড’ ১৯৭৫ সালের আগস্টের ঘটনাবলির কারণে প্রায় ভেঙে পড়ে। শেখ মুজিব ও তাঁর পরিবারের হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ত কিছু মধ্যম সারির মুক্তিযোদ্ধা অফিসার খন্দকার মোশতাক আহমাদের অভিভাবকত্বে যেভাবে সরকার চালাচ্ছিল তা সিনিয়র অফিসারদের অনেকেই মেনে নিতে পারছিলেন না। অনেকে, বিশেষ করে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)-এর সশস্ত্র শাখা ‘গণবাহিনী’র সদস্যরা, লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবু তাহের (অব.)-এর নেতৃত্বে সেনাবাহিনীতে বিরাজমান উত্তপ্ত ও অস্থির অবস্থার সুযোগ গ্রহণ করতে তৈরি হচ্ছিল। সাফায়াত জামিলের নেতৃত্বাধীন ঢাকা ব্রিগেডের সহায়তায় ৩ নভেম্বর ১৯৭৫ ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ অভ্যুত্থান ঘটালে জিয়াউর রহমানকে সেনাপ্রধানের পদ থেকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয় এবং তাঁকে গৃহবন্দি করে রাখা হয়। ৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতার বিপ্লব তাঁকে সেনাপ্রধানের পদে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করে এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রে নিয়ে আসে।” অন্যদিকে, খালেদ মোশাররফ ও তাঁর দুজন সহকর্মী কর্নেল হুদা ও কর্নেল হায়দার ৭ নভেম্বর সূর্য ওঠার আগে সেনাদের হাতে নিহত হন।

খালেদ মোশাররফের স্বল্পস্থায়ী ক্ষমতা দখলের ফলে ক্রমবর্ধমান বিভ্রান্তির মধ্যে রাষ্ট্রপতির পদে পরিবর্তন ঘটে। ৬ নভেম্বর ১৯৭৫ খন্দকার মোশতাককে ক্ষমতা ছাড়তে হয় এবং সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি আবুসাদাত মোহাম্মদ সায়েম রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ৭ নভেম্বর তিন বাহিনীর প্রধানগণ অর্থাৎ সেনাবাহিনীর মেজর জেনারেল জিয়া, নৌবাহিনীর রিয়ার অ্যাডমিরাল এমএইচ খান এবং বিমানবাহিনীর এয়ার ভাইস-মার্শাল এমজি তাওয়াব উপ-প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক নিযুক্ত হন। বিচারপতি সায়েম ২৯ নভেম্বর ১৯৭৬ তৃতীয় সামরিক আইন ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের পদ ছেড়ে দিলে জিয়া সেই পদে নিযুক্ত হন। বিচারপতি সায়েম ২১ এপ্রিল ১৯৭৭ বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করলে জিয়া বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হন। তখন তাঁর বয়স মাত্র ৪১ বছর ৩ মাস। আজ পর্যন্ত এই পদে তিনি সর্বকনিষ্ঠ ব্যক্তি।

১৯৭৫ সালে মর্মান্তিক এক হত্যাকান্ডের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হয়েছিল। দেশে রাজনৈতিক শূন্যতা বিরাজ করে। তিনটি সেনা-অভ্যুত্থান আর ঘাত-প্রতিঘাতে দেশে এক অনিশ্চয়তা নেমে আসে। সেই সংকটময় পরিস্থিতির মধ্যে আবির্ভাব ঘটে সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। একজন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আত্মপ্রকাশ ১৯৭৫ সালের নভেম্বর মাসে। বাংলাদেশের ইতিহাসের পাতায় দিনটি চির স্মরণীয়। ৩রা নভেম্বর থেকে ৬ নভেম্বর বাংলাদেশের ইতিহাসে কালো অধ্যায়ের সূচনা করে। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল খালেদ মোশাররফ নিজেকে সেনাপ্রধান হিসেবে ঘোষণা করে স্বাধীনতার ঘোষক বীর সেনানি জিয়াউর রহমানকে বন্দি করে। দেশ অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হয়। কিন্তু ৭নভেম্বর সিপাহী জনতার ঐক্যবদ্ধ বিপ্লবের মাধ্যমে এদেশের রাজনীতির গতিপথ নতুন করে নির্মিত হয়। সিপাহী-জনতার বিপ্লব শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে বাংলাদেশের রাজনীতির কেন্দ্র বিন্দুতে নিয়ে আসে। সিপাহী-জনতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে রাজনীতির কেন্দ্র বিন্দুতে টেনে এনে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিকে অপবিত্র ও অধীনস্থ করার ষড়যন্ত্র নস্যাত করে দেয়। সিপাহী-জনতার বিপ্লব জিয়াউর রহমানকে জনমানুষের অবিসংবাদিত নেতায় পরিণত করে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে পদচারণা শুরু হয়েছিল বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের আদর্শে বিশ্বাসী রাজনৈতিক দল বিএনপি’র। মহান স্বাধীনতার ঘোষক এবং বাংলাদেশের নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মেজর জিয়াউর রহমান একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, সেনাপ্রধান এবং বাংলাদেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা, সেই সাথে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাতা। নানা ঘাত-প্রতিঘাত, বাধা-বিপত্তি, চড়াই-উৎরাই পার হয়ে সে দলটি আজ ৪৮বছরে পদার্পন করছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দৃঢ়চেতা নেতৃত্বে কারনে পলাতক ফ্যাসিস্ট হাসিনা শতো চেষ্টা করেও বিএনপি ভাঙ্গতে পারে নাই। দীর্ঘ ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলন সংগ্রামের পর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে বিজয়ী হয়ে রাষ্ট্র মেরামতের দায়িত্ব পালন করছেন বিএনপি’র চেয়ারম্যান ও গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া’র যোগ্য উত্তরসূরী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

৪৮ বছরের পথচলার মধ্যে দলটি রাষ্ট্রক্ষমতায় যেমন ছিল, তেমনি বিরোধী দলেও ছিল। বিএনপির আজকের অবস্থা এবং অবস্থান নিয়ে কথা বলতে গেলে দলটির প্রতিষ্ঠাকালীন কথা অবশ্যই বিবেচনায় রাখতে হবে। এটা অনস্বীকার্য যে, দেশের এক বিশেষ প্রেক্ষাপটে জন্ম হয়েছিল বিএনপির। জাতির চরম ক্রান্তিকালে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের হাল ধরেছিলেন। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য এই ক্ষণজন্মা মহানায়কের শাসনকাল স্বার্থানেশী সেনা কর্মকর্তা দীর্ঘায়িত করতে দেয় নাই।
১৯৮১ সালের ৩০ মেচট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে নির্মমভাবে হত্যা করে কিছু উশৃংখল, উচ্চাভিলাষী অফিসার। শহীদ জিয়া পাঁচ বৎসরের কিছু বেশি সময় রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেয়েছিলেন। এই স্বল্প সময়ে তিনি দেশকে উন্নয়নের চরম শিখরে পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাঁর নিরলস কর্মপ্রচেষ্টায় এবং রাষ্ট্রনায়কোচিত ভূমিকার কারণে দেশের প্রতিটি মানুষ দেশপ্রেমে উজ্জীবিত হয়। তিনি জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে উন্নয়ন ও উৎপাদনের রাজনীতি প্রবর্তন করেছিলেন। শহীদ জিয়ার রাজনীতি ছিল স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার রাজনীতি, সাম্রাজ্যবাদ ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে, দারিদ্র ও ক্ষুধা নির্বারণের রাজনীতি, সকলের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠার রাজনীতি। তিনিই বাংলাদেশকে বিশ্বদরবারে মর্যাদাশীল রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। সেজন্যই দেশের মানুষের অন্তরে এখনও তিনি খোদিত আছেন। শহীদ জিয়া তাঁর আপন কর্মের মধ্যদিয়ে ইতিহাসের পাতায় স্থায়ী আসন করে নিয়েছেন। সেনা থেকে রাষ্ট্র পরিচালনা প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি সফল হয়েছেন কর্মের মাধ্যমে। সেজন্যই ইতিহাস তাঁকে অমরত্ব দিয়েছে।

বাংলাদেশকে উন্নতি ও সমৃদ্ধির এক বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে অধিষ্ঠিত করে জিয়া ইতিহাসে নিজের অক্ষয় স্থান নিশ্চিত করেন। রাষ্ট্রপতি হিসেবে বহুদলীয় ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, অর্থনীতির পুনরুজ্জীবন, সময়োপযোগী গতিশীল পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণের মাধ্যমে বিশ্ব রাজনীতিতে বাংলাদেশের স্বতন্ত্র অবস্থান ও গতিপথ নির্ধারণ এসব বহুমাত্রিক সাফল্যের কথা সুবিদিত এবং বহুল চর্চিত। শহীদ জিয়া ছিলেন মাটি ও মানুষের নেতা। এ দেশের গরিব মেহনতি মানুষের জীবনমান উন্নয়ন ছিল তার অন্যতম জীবন সাধনা।

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ছিলেন একজন ক্ষণজন্মা ব্যক্তি ও মহান রাষ্ট্রনায়ক। জিয়া বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায়। জাতীয় ইতিহাসের এক ক্রান্তিলগ্নে একজন পরিত্রাণকারী হিসেবে রাজনীতিতে জিয়ার আবির্ভাব। তিনি শতধা বিভক্ত জাতিকে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের চেতনায় ঐক্যবদ্ধ করেছেন। জিয়া দেশপ্রেমে উজ্জ্বল এক অনুভূতির নাম। ‘প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ, জীবন বাংলাদেশ আমার মরণ বাংলাদেশ’- ছিল জিয়ার বিশ্বাস ও ধ্যান। তিনি আধুনিক বাংলাদেশের রূপকার। একজন সফল রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে শুধু রাজনীতি, প্রশাসন, অর্থনীতি ও পররাষ্ট্রনীতির তার কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেননি, স্বাধীন বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক উন্নয়ন ও অগ্রগতিতেও তার বলিষ্ঠ ভূমিকা ও অবদান রেখে গেছেন। ইতিহাস থেকে কারো অবদান জোর করে মুছে দেয়া যায় না। ফ্যাসিস্ট শাসনামলে সাময়িকভাবে জিয়াকে হেয় করা, তার সোনালি অবদানকে অস্বীকার করার অপতৎপরতা আমরা দেখছি। কিন্তু এ অপপ্রয়াস সফল হয়নি। শহীদ জিয়াকে ভুলিয়ে দেয়া, তার অবদানকে মুছে ফেলার সাধ্য এ দেশে কারো হবে না। জিয়া থাকবেন দেশপ্রেমিক বিবেকবান প্রতিটি মানুষের অন্তরে এক জীবন্ত প্রত্যয় হিসেবে। ৭ নভেম্বর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের মাহেন্দ্রক্ষণে মহান স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বীর উত্তম কে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।

 

লেখক: জহিরুল ইসলাম (জহির)
বি.এস.সি ইন ইইই, এল.এল.বি,
সহ- দপ্তর সম্পাদক
চট্টগ্রাম মহানগর যুবদল।
মোবাইল: ০১৮১৯৬১৭৩৮০
E-mail: zahir.affable@gmail.com

- Advertisement -spot_img
  • সর্বশেষ
  • পঠিত