১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের মধ্য দিয়ে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ যখন নতুন স্বপ্ন সম্ভাবনা নিয়ে সংবিধান রচনায় ব্যস্ত তখন প্রথমেই শেখ মুজিব সরকার ব্যর্থতার পরিচয় দেয়। পাহাড় সমতল সহ সারাদেশের মানুষ জাতি-উপজাতি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব জনগোষ্ঠী কে বাঙালি জাতীয়তাবাদ চাপিয়ে দিয়ে। মুজিবের চাপিয়ে দেওয়া বাঙালি জাতীযতাবাদ পাহাড়ি জনগোষ্ঠী মেনে না নিয়ে সরাসরি বিদ্রোহ করে যার ফলাফল স্বাধীনতার ৫৫ বছর পর আমাদের প্রকৃতির লীলাভূমি অপরুপ সুন্দর তিন পার্বত্য এলাকা আজও অশান্ত।
১৯৭২ সালের ৩১ অক্টোবর বাংলাদেশের গণপরিষদে যখন বাংলাদেশের সংবিধান রচিত হচ্ছিল তখন জাতিগত পরিচয় বাঙালিত্ব গ্রহণের সময় বিতর্কে অংশগ্রহণ করে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা বলেছিলেন, ‘আমি একজন চাকমা। একজন মারমা কখনো চাকমা হতে পারে না। একজন চাকমাও বাঙালি হতে পারে না। আমি একজন চাকমা। আমি বাঙালি নই। আমি বাংলাদেশের নাগরিক। একজন বাংলাদেশি। আপনিও একজন বাংলাদেশি, কিন্তু জাতিগত পরিচয়ে একজন বাঙালি। তারা উপজাতীয়রা কখনো বাঙালি হতে পারে। এখানে উল্লেখ্য মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন ১৯৭০ সালেও ।

মানবেন্দ্র লারমার যুক্তি সঠিক হলেও তার যুক্তি শোনার ধৈর্য কারো ছিল না। শেখ মুজিবুর রহমান উপজাতীয়দের বাঙালি হয়ে যাবার নির্দেশ দিয়েই খালাস। ফলে সমগ্র জনসমষ্টি বাঙালি হয়ে গেল সংবিধান অনুযায়ী। বাংলাদেশে বসবাসকারী অন্তত ৫৭টি উপজাতীয় জনগণ সন্ত্রস্ত হয়ে উঠল। জাতীয় এবং আঞ্চলিক পর্যায়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হলো। সৃষ্টি হলো সংশয়। বাংলাদেশে বসবাসকারী সকলেই যদি বাঙালি হয়, তাহলে মারমা, চাকমা, টিপরা, সাঁওতাল, মনিপুরীরা কী? ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বাংলাভাষীরাই বা কী? মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা যা বলেছিলেন তা কী ফেলে দেবার মতো?
৭২ এর সংবিধানের সকলকে বাঙালী বলে সংজ্ঞায়িত করা হলে পরবর্তীতে উপজাতি জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় এবং তারা বাঙালী বলে স্বীকার করাকে নিজেদের অস্তিত্ব বিনাশের কারণ হবে বলে মনে করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালী জাতীয়তাবাদের বিপরীতে জন্ম নেয়। ‘জুম্ম জাতীয়তাবাদ’। ফলে এই নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে তৈরি হয় বিরোধ, যা একসময় গেছে তা সশস্ত্র ধারায়এর ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর পুরো জাতি যখন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে ব্যস্ত তখন প্রতিবেশী দেশ ভারতের ইন্ধনে ১৯৭৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার নেতৃত্বে গঠিত হয় পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতিজনসংহতি সমিতির সহযোগী সংগঠন ছিল এর সামরিক শাখা শান্তি বাহিনীএমএন লারমা শান্তি বাহিনী নামে এই সশস্ত্র শাখা গঠন করেন ১৯৭৩ সালে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা আত্মগোপনে চলে যান এবং ১৯৭৬ সাল থেকে শান্তি বাহিনী পার্বত্য অঞ্চলে সামরিক অপতৎপরতা শুরু করে। পরবর্তীতে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বীর উত্তম সংবিধানে উল্লেখিত বাঙালী জাতীয়তাবাদকে ঘিরে পার্বত্য চট্টগ্রামে সৃষ্ট বিরোধ নিরসনের লক্ষ্যে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। সংশোধিত সংবিধানের ৬ নং ধারার (২) উপধারায় বলা হয়, বাংলাদেশের নাগরিকগণ বাংলাদেশী বলিয়া পরিচিত হইবেন। এ সংশোধনের মধ্য দিয়ে বহু অবাঙালী ও উপজাতি বাংলাদেশেরই মানুষ বলে স্বীকৃতি পায়। সেই সাথে সারাদেশের মানুষ জাতি-উপজাতি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে একক রাষ্ট্রীয় পরিচয় লাভ করে। এর মাধ্যমে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রীয় চেতনার বিষয়টি প্রতিষ্ঠা করেন।
কিন্তু দুঃখজনক হলো স্বাধীনতার পর পর এম এন লারমার নেতৃত্বে প্রতিবেশী দেশ ভারতের ইন্ধন, ষড়যন্ত্রআশ্রয়-প্রশ্রয় ও সহায়তায় গঠিত পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি ও সশস্ত্র শান্তি বাহিনী ততদিনে পার্বত্য চট্টগ্রামকে নিয়ে স্বাধীন জুম্মল্যান্ড প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে বিভোর হয়ে ওঠেফলে তারা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র তৎপরতা অব্যাহত রাখে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর থেকে সেনাবাহিনী ও নিরস্ত্র বাঙালীদের উপর তাদের সশস্ত্র হামলা ক্রমেই বৃদ্ধি পেতে থাকে। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান দেশের এক-দশমাংশ ভূ-খন্ডের অস্তিত্ব রক্ষা, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা, দেশদ্রোহিতা দমন, শান্তি বাহিনীর ষড়যন্ত্র ও সন্ত্রাস দমনের জন্য পার্বত্য চট্টগ্রামের সর্বত্র সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ ও আনসার বাহিনী মোতায়েন করে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেনএর সাথে সাথে প্রশাসনিক উন্নয়ন ও বিকেন্দ্রীকরণের জন্য পার্বত্য চট্টগ্রামের লামা, কাপ্তাই ও খাগড়াছড়ি থানাকে মহকুমায় উন্নত করেন এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে থানার সংখ্যা ১২টি থেকে বাড়িয়ে ২০টিতে উন্নীত করেন।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান পাহাড়ের মানুষের উন্নয়নের জন্য সড়ক যোগাযোগ
ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নতি করেন, তিনি পাহাড়ের পতিত জমি লিজ প্রথা চালুর মাধ্যমে রাবার বাগান ও হর্টিকালচার সৃষ্টি করে উৎপাদনের আওতায় আনেন। প্রেসিডেন্ট জিয়ার সময় বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটি জেলায় প্রতিটি ২৫ একর করে ২০০০টি রাবার ও হটিকালচার বাগানের জন্য ভূমি লিজ দেওয়া হয়দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষের দারিদ্র্য দূরীকরণ ও পার্বত্য চট্টগ্রামের অনাবাদী জমিকে আবাদের আওতায় আনার জন্য সমতলের ভূমিহীন, গৃহহীন ও ভাসমান ছিন্নমূল গরীবদের পাহাড়ে পুনর্বাসন করেন। ১৯৭৯-১৯৮১ সালে তিন পার্বত্য চট্টগ্রামে পুনর্বাসনের প্রথম পর্যায়ে ৩০৭৮০টি পরিবারদ্বিতীয় পর্যায়ে ১৬৪১৩টি পরিবার, তৃতীয় পর্যায়ে ৭১০৬টি এবং সর্বশেষ চতুর্থ পর্যায়ে ১২৮৫টি পরিবারসহ মোট ৫৫৫১৭টি পরিবারকে পুর্নবাসন করা হয়েছে। এতে ব্রিটিশ আমলের বর্ণ বৈষম্য নীতি পরিহার করে উদারনীতি ও মানবিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করে শান্তি প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিয়ে যান।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়া চাকমা রাণী বিনীতা রায়কে পার্বত্য উপদেষ্টা ও বান্দরবানের বোমাং সার্কেল চিফ অংশৈই প্রু চৌধুরীকে খাদ্য প্রতিমন্ত্রী নিযুক্ত করেনশহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়া পাহাড়ি নেতৃবৃন্দের সাথে বৈঠক করে ট্রাইবাল কনভেনশন গঠন করে পার্বত্য চট্টগ্রামে বিরাজমান সমস্যাকে সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা ও অর্থনৈতিক সমস্যা হিসাবে চিহ্নিত করে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড প্রতিষ্ঠা করেন এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে ব্যাপক সামাজিক উন্নয়ন শুরু করেন। তিনি তার সময়ে পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাওয়ায় বতর্মানে পাহাড়ের জনগণ এর সুফল ভোগ করছে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম ইস্যুতে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভূমিকা ছিল উজ্জ্বল এবং অনুকরণীয়। পরবর্তীতে ১৯৮১ সালের ৩০ মে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ সংবিধান পরিপন্থী ও বৈষম্যমূলক স্থানীয় সরকার পরিষদ (যা পরবর্তীতে পার্বত্য জেলা পরিষদ নামে পরিচিত) সৃষ্টি করে পাহাড়ে জাতিগত বৈষম্যের বিষ বৃক্ষ রোপণ করেন, যার ধারাবাহিকতা এখনও চলমান।
বাংলাদেশ স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব যতদিন অটুট থাকবে পার্বত্য চট্টগ্রামে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের যুগান্তকারী ও দূরদর্শী ভূমিকার কথাও ততদিন স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। কেননা, পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল সম্প্রদায়ের একক জাতিগত ও সাংবিধানিক পরিচয় দিয়েছেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বীর উত্তম। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বীর উত্তম এর ৪৫ শাহাদাত বার্ষিকী উপলক্ষে বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই।
লেখক: জহিরুল ইসলাম, সাবেক সহ-দপ্তর সম্পাদক, চট্টগ্রাম মহানগর যুবদল।মোবাইল : ০১৮১৯৬১৭৩৮০

