১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক তাৎপর্যপূর্ণ ও ঘটনাবহুল দিন। নানা রাজনৈতিক ও সামরিক অস্থিরতা, অনিশ্চয়তা এবং রাষ্ট্রীয় সংকটের ঘনঘটায় যখন পুরো দেশ দিশাহীন, তখন সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। এই দিনটি জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশের রাজনীতিতে দিনটির গুরুত্ব ও তাৎপর্য অপরিসীম।
১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নে যখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর বর্বর হত্যাযজ্ঞ শুরু করে, তখন দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের বড় একটি অংশ ছিল বিচ্ছিন্ন ও নেতৃত্বের সংকটে। শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হয়ে কারাবন্দি হন। এমন এক সংকটময় মুহূর্তে চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। তাঁর সেই সাহসী ভূমিকা মুক্তিকামী মানুষের মধ্যে সাহস, প্রত্যয় ও প্রতিরোধের প্রেরণা জুগিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে তিনি সম্মুখযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়ে দেশ স্বাধীন করার সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।
স্বাধীনতার পর জাতির প্রত্যাশা ছিল গণতন্ত্র, আইনের শাসন, অর্থনৈতিক মুক্তি ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা। কিন্তু স্বাধীনতার অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই দেশ রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক বিপর্যয়, দুর্ভিক্ষ, প্রশাসনিক দুর্বলতা ও আইনশৃঙ্খলার অবনতির মুখে পড়ে। ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে বাকশাল প্রতিষ্ঠা এবং একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে গভীর বিতর্ক ও অসন্তোষ সৃষ্টি করে।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হওয়ার মধ্য দিয়ে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। এরপর একের পর এক সামরিক অভ্যুত্থান, পাল্টা অভ্যুত্থান ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বে রাষ্ট্রীয় কাঠামো কার্যত অস্থিরতার ঘূর্ণাবর্তে পড়ে। সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে বিভক্তি, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং ক্ষমতার টানাপোড়েনে সাধারণ মানুষের মধ্যেও উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়ে।
এমন এক অনিশ্চিত সময়ে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সংঘটিত হয় সিপাহী-জনতার বিপ্লব। সেনানিবাসে বন্দি অবস্থায় থাকা তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান মুক্ত হন। সৈনিকদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে সংঘটিত এই ঘটনাপ্রবাহ দেশের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করে। পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসেন এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
ইতিহাসের এই অধ্যায়কে শুধু একটি সামরিক ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করলে এর রাজনৈতিক তাৎপর্য পুরোপুরি উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে জড়িয়ে আছে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ সংকট, সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ, জাতীয়তাবাদী চেতনা এবং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণের প্রশ্ন। এ কারণেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে দিনটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক জীবনের দিকে তাকালে দেখা যায়, দেশের দুটি ঐতিহাসিক সংকটকালে তাঁর নাম বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে। প্রথমটি ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নে কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ এবং মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদান। দ্বিতীয়টি ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থানের পর বন্দিদশা থেকে মুক্তি পেয়ে রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে আসীন হওয়া।
পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্র পরিচালনায় জিয়াউর রহমান বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন, উৎপাদনমুখী অর্থনীতি, গ্রামীণ উন্নয়ন, কৃষি ও জনশক্তিকে কাজে লাগানোর বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও নতুন পরিচিতি ও কূটনৈতিক সম্পর্ক সম্প্রসারণের সুযোগ পায়। তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম ভিত্তি ছিল বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ। এসব উদ্যোগ ও অবদান তাঁকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি স্বতন্ত্র অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
তবে ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহের ঐতিহাসিক মূল্যায়ন নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক মহলে ভিন্নমত রয়েছে। থাকাটাই স্বাভাবিক কিন্তু এ কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে, দিনটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক গতিপথ পরিবর্তনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ।
আজকের প্রজন্মের কাছে ৭ নভেম্বরের ইতিহাস তুলে ধরার ক্ষেত্রে আবেগের পাশাপাশি প্রয়োজন তথ্যনিষ্ঠতা, ইতিহাসের যথাযথ মূল্যায়ন এবং জাতীয় স্বার্থের প্রতি দায়বদ্ধতা। ইতিহাসের কোনো অধ্যায়কে অস্বীকার করে নয়, বরং সত্যনিষ্ঠ আলোচনার মধ্য দিয়েই জাতির প্রকৃত ইতিহাস সংরক্ষণ করতে হবে।
শহীদ জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের আলোচনায় ৭ নভেম্বর শুধু তাঁর মুক্তির দিন নয়; এটি বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক অনুষঙ্গ। স্বাধীনতার ঘোষণা থেকে শুরু করে ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক সংকটের পর রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বে তাঁর আবির্ভাব—এই দুই অধ্যায় তাঁকে বাংলাদেশের ইতিহাসে স্মরণীয় করে রেখেছে।
জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের মূল শিক্ষা হোক—জাতীয় ঐক্য, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের সুরক্ষা, গণতন্ত্রের চর্চা, জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং সংকটকালে দেশ ও জাতির স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া।
বাংলাদেশের ইতিহাসে ৭ নভেম্বর তাই একটি স্মরণীয় দিন—সিপাহী-জনতার বিপ্লব, জাতীয় সংহতি এবং শহীদ জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্থানের ঐতিহাসিক অধ্যায়।
লেখক : সাবেক দপ্তর সম্পাদক, জাসাস, চট্টগ্রাম উত্তর জেলা ও সভাপতি, রাউজান প্রেস ক্লাব।

