একটি সন্ধ্যার হাঁটা, কিছু ছবি এবং একটি প্রশ্ন
সেদিন সন্ধ্যায় বাড়ির কাছাকাছি হাঁটতে বেরিয়ে হঠাৎ চোখে পড়ল পূজামণ্ডপের পাশে বসা একটি মেলা। রাস্তার পাশে ছোট ছোট দোকান, নানা রঙের খেলনা, কাচের চুড়ি, কাঠের তৈরি গৃহস্থালির জিনিসপত্র আর খাবারের স্টল। কোথাও গরম তেলে জিলাপি ভাজা হচ্ছে, কোথাও মানুষ দরদাম করছেন, আবার কোথাও শিশুরা পছন্দের খেলনাটির দিকে তাকিয়ে আছে।
দৃশ্যগুলো খুব পরিচিত মনে হলো। অথচ একটু ভালো করে তাকাতেই মনে প্রশ্ন জাগল – আমাদের চেনা মেলাগুলো কি আগের মতোই আছে, নাকি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মেলার অর্থ ও চরিত্রও বদলে যাচ্ছে?
এই প্রশ্ন থেকেই মেলাকে একটু অন্যভাবে দেখার চেষ্টা। মেলা শুধু কেনাকাটার জায়গা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের শৈশব, পারিবারিক আনন্দ, লোকজ সংস্কৃতি এবং অনেক মানুষের জীবিকা।
ছবি: কাঠের তৈরি গৃহস্থালির সামগ্রী
যে মেলায় ছিল গ্রামের প্রাণ:
ছোটবেলায় গ্রামের মেলার কথা মনে পড়লে প্রথমেই চোখে ভাসে মাটির হাঁড়ি-পাতিল, মাটির পুতুল, কাঠের খেলনা, বাঁশ-বেতের জিনিস, হাতপাখা, কাচের চুড়ি আর ছোট ছোট দোকানের সারি। খাবারের দোকানে গরম জিলাপির গন্ধ, আর ছেলেদের হাতে বাঁশের বাঁশি, ঘুড়ি – সব মিলিয়ে অন্য রকম এক আনন্দ।
সেই মেলায় কেনাকাটা ছিল, কিন্তু আনন্দটা শুধু কেনাকাটার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। পরিবারের সবাই মিলে ঘুরতে যাওয়া, পরিচিত মানুষের সঙ্গে দেখা হওয়া, শিশুদের নতুন কিছু দেখা, আর বিক্রেতাদের সঙ্গে দরদাম – সবকিছু মিলিয়েই তৈরি হতো মেলার পরিবেশ।
মেলার অনেক পণ্য তৈরি করতেন স্থানীয় কারিগর ও ছোট উদ্যোক্তারা। সারা বছর কাজ করে তাঁরা মেলায় পণ্য নিয়ে আসতেন। কয়েক দিনের বিক্রি তাঁদের সংসার চালানোর পাশাপাশি পরবর্তী কাজের পুঁজিও জোগাত।
আজও মেলার কিছু দৃশ্যে সেই পুরোনো দিনের ছাপ দেখা যায়। কাঠের তৈরি জিনিস, সাধারণ খেলনা কিংবা হাতে বানানো সামগ্রী সামনে এলে বোঝা যায়, আধুনিকতার ভিড়েও আমাদের পুরোনো অভ্যাসগুলো পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি।
ছবি: কাঠের তৈরি বিভিন্ন ব্যবহার্য সামগ্রী
ঐতিহ্য যখন শহরের উৎসব:
সময়ের সঙ্গে মেলার ধরন বদলেছে। গ্রামের খোলা মাঠের মেলার পাশাপাশি শহরে এখন বড় আয়োজন, সাজানো স্টল, ব্র্যান্ডের পণ্য আর নানা ধরনের বাণিজ্যিক প্রদর্শনী দেখা যায়।
পয়লা বৈশাখের মেলা তার একটি উদাহরণ। একসময় গ্রামীণ সংস্কৃতি, লোকজ পণ্য ও বৈশাখী আনন্দকে ঘিরে যে আয়োজন ছিল, এখন তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নানা ধরনের বিপণন ও বাণিজ্যিক প্রচার। পান্তা-ইলিশও অনেক ক্ষেত্রে বৈশাখ উদ্যাপনের একটি পরিচিত প্রতীক হয়ে উঠেছে।
এ পরিবর্তনকে এক কথায় ভালো বা মন্দ বলা যায় না। সময়ের সঙ্গে উৎসবের ধরন বদলাবে, নতুন পণ্য আসবে, ব্যবসার সুযোগ তৈরি হবে – এটাই স্বাভাবিক। প্রশ্ন হলো, এই পরিবর্তনের মধ্যে আমাদের লোকজ সংস্কৃতি ও ছোট কারিগরদের জায়গা কতটা থাকছে?
মেলা যদি শুধু পণ্য বিক্রির আরেকটি মাধ্যম হয়ে ওঠে, তাহলে তার বিশেষত্ব কমে যেতে পারে। কারণ মেলার আসল আকর্ষণ কেবল কী কিনলাম, তা নয়; বরং কী দেখলাম, কী শিখলাম, কার সঙ্গে সময় কাটালাম – সেটাও গুরুত্বপূর্ণ।
শহুরে জীবনে মেলা: পরিবারের জন্য একটু আনন্দ:
ঢাকার মতো ব্যস্ত শহরে পরিবারের সবাইকে নিয়ে কোথাও যাওয়ার সুযোগ সব সময় হয় না। কাজ, পড়াশোনা, যানজট আর দৈনন্দিন ব্যস্ততার মধ্যে অবসর খুঁজে পাওয়াও কঠিন। তার ওপর শিশুদের খেলার মাঠ ও খোলা জায়গার অভাব তো রয়েছেই।
এই বাস্তবতায় কাছাকাছি কোনো মেলা অনেক পরিবারের জন্য সহজে সময় কাটানোর সুযোগ তৈরি করে। শিশুদের নিয়ে মেলায় গেলে তারা শুধু খেলনা দেখে না; নানা ধরনের পণ্য, খাবার, বই, হস্তশিল্প ও মানুষের কাজকর্মের সঙ্গেও পরিচিত হয়।
আমিও সন্তানদের নিয়ে নিয়মিত একুশে বইমেলায় যাই। কখনো পিঠা উৎসবে, কখনো অন্য কোনো মেলায় যাওয়ার অভিজ্ঞতাও হয়েছে। হজ ও ওমরাহ মেলায় যাওয়ার অভিজ্ঞতাও আছে। এসব আয়োজনের উদ্দেশ্য এক নয়, কিন্তু প্রতিটিই মানুষকে কোনো না কোনোভাবে নতুন কিছু জানার বা দেখার সুযোগ দেয়।
তবে পরিবারের আনন্দের সঙ্গে খরচের বিষয়টিও জড়িত। মেলায় গিয়ে শিশুরা খেলনা চাইবে, কিছু খেতে চাইবে – এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সীমিত আয়ের পরিবারের জন্য বারবার এ ধরনের খরচ সামলানো সহজ নয়। তাই মেলা এমন হওয়া দরকার, যেখানে কম খরচেও পরিবার নিয়ে যাওয়া যায় এবং শিশুদের আনন্দের সুযোগ তৈরি হয়।
ছবি: মেলায় সাজানো খেলনার দোকান
মেলার প্রতি বাঙালির টান:
আমাদের জীবনে মেলা কোনো একটি সময়ের ঘটনা নয়। বছরের বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন উপলক্ষে আমরা মেলায় যাই। কোথাও বই, কোথাও খাবার, কোথাও ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক উৎসব, আবার কোথাও ব্যবসা ও পণ্যের প্রদর্শনী।
একুশে বইমেলা আমাদের ভাষা ও বইয়ের প্রতি ভালোবাসার সঙ্গে যুক্ত। বৈশাখী মেলা নতুন বছরের আনন্দ নিয়ে আসে। বসন্ত মেলা, পিঠা উৎসব, আমের মেলা কিংবা ঈদকে ঘিরে বিভিন্ন আয়োজন মানুষের কেনাকাটা ও মিলনকে একসঙ্গে নিয়ে আসে। ইফতার মেলা এবং হজ ও ওমরাহ মেলায় থাকে নিজস্ব প্রয়োজন ও অভিজ্ঞতার ভিন্নতা।
আবার কুষ্টিয়ার লালন মেলা, রথ মেলা, চট্টগ্রামের জব্বারের বলীখেলা ঘিরে মেলা কিংবা বিজয় মেলা – এসবের সঙ্গে জড়িয়ে আছে নিজ নিজ এলাকার ঐতিহ্য ও মানুষের আবেগ। জাতীয় বৃক্ষমেলাও মানুষকে গাছ লাগানো ও পরিবেশ সম্পর্কে আগ্রহী করে তোলার সুযোগ দেয়।
এ ছাড়া ঢাকা ও চট্টগ্রামের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা, রিহ্যাব ফেয়ার, অটোমোবাইল শো, আসবাবপত্র, ইলেকট্রনিকস, বস্ত্র ও তাঁতপণ্যের মেলা – এসবের মূল লক্ষ্য অনেকটাই ব্যবসা ও পণ্যের পরিচিতি বাড়ানো।
অর্থাৎ, সব মেলার উদ্দেশ্য এক নয়। কোনো মেলা ঐতিহ্য ধরে রাখে, কোনোটি মানুষের বিনোদনের সুযোগ তৈরি করে, আবার কোনোটি ব্যবসার প্রসার ঘটায়। কিন্তু সব ক্ষেত্রেই মানুষের আগ্রহ, অংশগ্রহণ এবং একসঙ্গে সময় কাটানোর বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
মেলার অর্থনীতি: আনন্দের পাশাপাশি জীবিকা:
মেলার একটি বড় দিক হলো এর অর্থনৈতিক ভূমিকা। একটি মেলায় শুধু স্টল বসানো বিক্রেতারাই আয় করেন না। পণ্য তৈরি, পরিবহন, দোকান সাজানো, খাবার তৈরি, নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা এবং অন্যান্য সেবার সঙ্গে যুক্ত অনেক মানুষের কাজের সুযোগ তৈরি হয়।
বইমেলা প্রকাশক ও লেখকদের জন্য বই পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ তৈরি করে। বাণিজ্য মেলা ব্যবসায়ীদের পণ্য পরিচিত করা, নতুন ক্রেতা খুঁজে পাওয়া এবং ব্যবসায়িক যোগাযোগ গড়ে তোলার ক্ষেত্র হতে পারে। একইভাবে আবাসন, গাড়ি, আসবাবপত্র বা ইলেকট্রনিকসের মেলায় ক্রেতারা বিভিন্ন পণ্য ও সেবা সম্পর্কে এক জায়গায় ধারণা পান।
তবে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার – বিক্রি বেশি হলেই ব্যবসায় লাভ বেশি হবে, এমন নয়। মেলায় অংশ নেওয়ার খরচ, স্টলের ভাড়া, পণ্য পরিবহন, কর্মীদের খরচ, থাকা-খাওয়া এবং অবিক্রীত পণ্যের হিসাব বাদ দিয়েই প্রকৃত লাভ বুঝতে হয়।
একজন বিক্রেতা অনেক পণ্য বিক্রি করেও প্রত্যাশিত লাভ নাও পেতে পারেন। আবার কোনো ব্যবসায়ী মেলায় সরাসরি খুব বেশি বিক্রি না করলেও নতুন ক্রেতা বা ভবিষ্যতের ব্যবসায়িক যোগাযোগ পেতে পারেন। তাই মেলার সাফল্য শুধু মোট বিক্রি দিয়ে বিচার করলে পুরো চিত্রটি বোঝা যায় না।
ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও কুটিরশিল্প: মেলা কি সত্যিই সহায়ক?
মেলার অন্যতম সৌন্দর্য হলো, এখানে ছোট উদ্যোক্তারাও নিজেদের পণ্য মানুষের সামনে তুলে ধরার সুযোগ পান। বিশেষ করে কাঠ, বাঁশ-বেত, মাটি, তাঁত কিংবা হাতে তৈরি বিভিন্ন পণ্যের কারিগরদের জন্য মেলা হতে পারে ক্রেতার কাছে পৌঁছানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
কিন্তু সুযোগটি সবার জন্য সমান কি না, সেটিও ভাবার বিষয়। স্টলের ভাড়া বেশি হলে বা অংশগ্রহণের খরচ সামলানো কঠিন হলে অনেক ছোট উদ্যোক্তা মেলায় আসতেই পারেন না। অন্যদিকে বড় প্রতিষ্ঠানগুলো তুলনামূলক বেশি জায়গা ও প্রচারের সুযোগ পেতে পারে।
ফলে মেলায় ছোট কারিগরদের উপস্থিতি থাকলেও তাঁদের ব্যবসা কতটা লাভবান হচ্ছে, তা আলাদাভাবে দেখা দরকার। তাঁদের জন্য সাশ্রয়ী স্টল, সহজ অংশগ্রহণের ব্যবস্থা এবং পণ্যের যথাযথ পরিচিতির সুযোগ থাকলে মেলা আরও কার্যকর হতে পারে।
আমার মনে হয়, মেলার আয়োজন এমন হওয়া উচিত, যেখানে বড় ব্যবসার পাশাপাশি ছোট উদ্যোক্তারাও নিজেদের জায়গা খুঁজে পাবেন। কারণ মেলার বৈচিত্র্য অনেকটাই তৈরি হয় এই ছোট ছোট দোকান ও নিজস্ব হাতে তৈরি পণ্য থেকে।
ছবি: মেলায় বিক্রির জন্য সাজানো খাবার
একজন ব্যাংকারের চোখে মেলা:
ব্যাংকিং পেশায় কাজ করার কারণে যেকোনো ব্যবসায়িক আয়োজনের দিকে তাকালে লেনদেন, খরচ, আয় এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনার বিষয়গুলোও চোখে পড়ে।
মেলায় প্রতিদিন অসংখ্য ছোট-বড় লেনদেন হয়। কেউ নগদ টাকা নেন, কেউ কার্ডে বা মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে মূল্য পরিশোধ করেন। ডিজিটাল লেনদেনের সুযোগ বাড়লে বিক্রেতাদের জন্য হিসাব রাখা সহজ হতে পারে এবং ক্রেতারাও সুবিধা পান।
তবে শুধু ডিজিটাল লেনদেন চালু করলেই সব সমস্যার সমাধান হবে না। বিক্রেতাদের ব্যবহার সহজ হতে হবে, খরচ যুক্তিসংগত হতে হবে এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা থাকতে হবে। বিশেষ করে ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য সহজ ও সাশ্রয়ী ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ।
মেলার মতো অস্থায়ী ব্যবসায়িক পরিবেশেও আর্থিক সেবার ব্যবহার বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। এর মাধ্যমে ছোট উদ্যোক্তারা আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে আরও পরিচিত হতে পারেন। তবে এর জন্য উদ্যোগ, সচেতনতা এবং বাস্তবসম্মত ব্যবস্থাপনা দরকার।
ভালো মেলার জন্য প্রয়োজন সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা:
মেলা মানুষের আনন্দের জায়গা। কিন্তু সেই আনন্দ যেন আশপাশের মানুষের জন্য অযথা ভোগান্তির কারণ না হয়, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।
রাস্তা বা গলির পাশে মেলা বসলে পথচারী ও যানবাহনের চলাচলে সমস্যা হতে পারে। খাবারের মান, পরিচ্ছন্নতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, অগ্নিনিরাপত্তা এবং মানুষের নিরাপদ চলাচলের বিষয়গুলোও গুরুত্ব পাওয়া দরকার।
মেলার আয়োজকদের উচিত স্থান নির্বাচন ও স্টল সাজানোর সময় আশপাশের মানুষের দৈনন্দিন চলাচলের কথা বিবেচনা করা। একই সঙ্গে শিশু, বয়স্ক মানুষ এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা যেন সহজে মেলায় যেতে পারেন, সে ব্যবস্থাও থাকা দরকার।
ভালো ব্যবস্থাপনা থাকলে মেলা শুধু বিক্রেতা বা দর্শনার্থীদের জন্য নয়, আশপাশের এলাকার মানুষের জন্যও গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠতে পারে।
পূজামণ্ডপের পাশের মেলা: উৎসবের বাইরেও মানুষের মিলন:
সেদিনের মেলায় একটি বিষয় ভালো লেগেছিল। বিভিন্ন ধর্মের মানুষকে তাঁদের সন্তানদের নিয়ে দোকান ঘুরতে, পণ্য দেখতে এবং কেনাকাটা করতে দেখেছি। কেউ হয়তো পূজার আয়োজন দেখতে এসেছেন, কেউ পরিবারের সঙ্গে একটু সময় কাটাতে, আবার কেউ এসেছেন প্রয়োজনীয় কিছু কিনতে।
একই জায়গায় মানুষের এই স্বাভাবিক উপস্থিতি আমাদের সামাজিক জীবনের একটি সুন্দর দিক তুলে ধরে। উৎসবের নিজস্ব ধর্মীয় পরিচয় থাকলেও তার আশপাশে তৈরি হওয়া সামাজিক পরিবেশে মানুষ একে অন্যের সঙ্গে মেশেন, কেনাকাটা করেন এবং আনন্দ ভাগ করে নেন।
বাংলাদেশের বহু এলাকার জীবন এভাবেই নানা সংস্কৃতি ও সামাজিক সম্পর্কের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলে। পারস্পরিক সম্মান বজায় রেখে একসঙ্গে থাকা এবং একে অন্যের উৎসব ও আনন্দকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করার মধ্যেই সমাজের সৌন্দর্য।
আমরা কোন মেলা চাই?
মেলার পরিবর্তন থামিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়, আর তা প্রয়োজনও নেই। সময়ের সঙ্গে নতুন পণ্য আসবে, নতুন ধরনের আয়োজন হবে, ব্যবসার সুযোগ বাড়বে। কিন্তু এই পরিবর্তনের মধ্যে মেলার পুরোনো আকর্ষণটুকু ধরে রাখার চেষ্টা থাকা দরকার।
আমরা এমন মেলা চাই, যেখানে শিশুদের আনন্দের পাশাপাশি নতুন কিছু শেখার সুযোগ থাকবে। যেখানে স্থানীয় কারিগর ও ছোট উদ্যোক্তারা জায়গা পাবেন। যেখানে মানুষ সাশ্রয়ী খরচে পরিবার নিয়ে যেতে পারবেন। আর যেখানে ব্যবসার পাশাপাশি নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা ও মানুষের স্বাচ্ছন্দ্যও গুরুত্ব পাবে।
মেলার সাফল্য শুধু কত মানুষ এলেন বা কত টাকার পণ্য বিক্রি হলো, তা দিয়ে বিচার করা ঠিক হবে না। মেলা শেষ হওয়ার পর মানুষ কী নিয়ে ফিরলেন – একটু আনন্দ, নতুন কোনো অভিজ্ঞতা, পছন্দের কোনো পণ্য, নাকি একটি ভালো স্মৃতি – সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
শেষ কথা:
মেলা আমাদের জীবনের এমন একটি অংশ, যার সঙ্গে শৈশবের স্মৃতি, পারিবারিক আনন্দ, লোকজ ঐতিহ্য এবং মানুষের জীবিকা জড়িয়ে আছে। সময় বদলেছে, মেলার ধরনও বদলেছে। কোথাও ঐতিহ্য প্রধান, কোথাও বাণিজ্য, আবার কোথাও দুটিই পাশাপাশি চলছে।
বাণিজ্যিক আয়োজন বাড়লেই মেলার সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যায়, এমন নয়। বরং ব্যবসার সুযোগ তৈরি হওয়ার পাশাপাশি যদি সংস্কৃতি, ছোট উদ্যোক্তা এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের সুযোগও বাড়ে, তাহলে মেলা আরও অর্থবহ হতে পারে।
সেদিনের মেলা থেকে ফিরে আমার মনে হয়েছে, মেলার আসল মূল্য শুধু দোকানে সাজানো পণ্যে নয়। এর মধ্যে আছে মানুষের ব্যস্ত জীবনে একটু আনন্দ খুঁজে নেওয়া, সন্তানদের নতুন কিছু দেখানো, ছোট ব্যবসায়ীর জীবিকার চেষ্টা এবং ভিন্ন ভিন্ন মানুষের একই জায়গায় মিলিত হওয়া।
মেলা বদলাক, আধুনিক হোক – কিন্তু বাণিজ্যের বিস্তারে যেন মেলার আত্মাটুকু হারিয়ে না যায়।
লেখক: মো: কামরুল ইসলাম
ব্যাংকার ও কলামিস্ট

