বুধবার, আগস্ট ১৯, ২০২৬

মেধা যেখানে নির্বাসিত, চাটুকারিতাই সেখানে ক্ষমতার প্রধান সিঁড়ি

আবদুল্লাহ মজুমদার

চেরাগি নিউজ ডেস্ক

কোনো এক সকালে অফিসের দরজা খুলে দেখা গেল—বছরের পর বছর নিষ্ঠা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা নিয়ে কাজ করা মানুষটি আগের জায়গাতেই বসে আছেন। অথচ প্রশংসা, তোষামোদ আর ক্ষমতাকেন্দ্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরিতে পারদর্শী একজন উঠে গেছেন গুরুত্বপূর্ণ চেয়ারে। দৃশ্যটি কাল্পনিক হলেও প্রশ্নটি বাস্তব—যোগ্যতা কি সত্যিই পদোন্নতি, পদায়ন ও দায়িত্ব বণ্টনের প্রধান মাপকাঠি, নাকি ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও চাটুকারিতাও সেখানে নীরব ভূমিকা রাখছে?

একটি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব বণ্টনের ভিত্তি হওয়া উচিত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, সততা, দক্ষতা ও দায়িত্ববোধ। কারণ রাষ্ট্রীয় পদ কোনো ব্যক্তিগত অনুগ্রহের বিষয় নয়; এটি জনগণের আমানত। সেখানে যোগ্যতার চেয়ে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, তদবির, আনুগত্য কিংবা স্বার্থের হিসাব বড় হয়ে উঠলে ক্ষতিটা শুধু একজন বঞ্চিত ব্যক্তির হয় না—দুর্বল হয়ে পড়ে প্রতিষ্ঠান, ক্ষতিগ্রস্ত হয় প্রশাসনিক দক্ষতা এবং শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর।

প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্টের পরিচালক ড. মুহাম্মদ সাইফুর রহমান চৌধুরী মনে করেন, জনসাধারণের সঙ্গে যোগাযোগে দক্ষ, মেধাবী, দায়িত্বশীল ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষই শেষ পর্যন্ত যোগ্যতম অবস্থানে পৌঁছাতে পারেন—কতিপয় ব্যতিক্রম ছাড়া। তাঁর মতে, চাটুকারিতা কিংবা ব্যক্তিগত সম্পর্কের মাধ্যমে কেউ সাময়িক সুবিধা পেতে পারেন; কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকা ও সফলতার জন্য যোগ্যতা, কর্মদক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতার কোনো বিকল্প নেই।
তিনি আরও বলেন, বেসরকারি চাকরিতে কর্মদক্ষতা ও সন্তোষজনক কর্মরেকর্ড পদোন্নতির প্রধান বিবেচ্য হলেও অনেক ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সুসম্পর্ক পদোন্নতি, পদায়ন, ইনক্রিমেন্ট ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার পথ সহজ করে। কোনো কোনো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা চাটুকারিতা পছন্দ করলে কেউ কেউ সুনজরে থাকার জন্য সেই পথও বেছে নেন এবং সাময়িক সুবিধা পান। তবে চাটুকারিতা কখনোই কর্মদক্ষতা, পদোন্নতি বা পদায়নের একমাত্র মানদণ্ড হতে পারে না। শেষ পর্যন্ত যোগ্যতা ও কর্মদক্ষতাই হওয়া উচিত একজন মানুষের প্রকৃত মূল্যায়নের ভিত্তি।

সাইকোলজিস্ট ও সাংবাদিক আ ন ম তাজওয়ার আলমের বক্তব্যও বিষয়টির গভীরে আলো ফেলেছে। তাঁর মতে, যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার পরিবর্তে যখন তোষামোদ, ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব বণ্টনের মাপকাঠি হয়ে দাঁড়ায়, তখন যোগ্যরা পিছিয়ে পড়েন এবং চাটুকার ও অনভিজ্ঞরা গুরুত্বপূর্ণ পদে যাওয়ার সুযোগ পান। এর ফলে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গনে বহুমুখী সংকট তৈরি হতে পারে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, অযোগ্যতার কারণে সেই সংকট সমাধানের পথও ক্রমেই কঠিন হয়ে ওঠে। রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যক্তিস্বার্থ নয়, যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও সততাই হওয়া উচিত প্রধান বিবেচনা।

দুটি বক্তব্যের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিন্নতা রয়েছে—চাটুকারিতা সাময়িক সুবিধা দিতে পারে, কিন্তু যোগ্যতার বিকল্প হতে পারে না। এখানেই সমস্যাটির মূল জায়গা।

সম্পর্ক থাকুক, কিন্তু যোগ্যতার বিকল্প নয়: ব্যক্তিগত সম্পর্ক কর্মজীবনের স্বাভাবিক বাস্তবতা। একজন বিশ্বস্ত ও পরিচিত ব্যক্তি যোগ্য হলে তাঁকে দায়িত্ব দেওয়া অন্যায় নয়। সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন বেশি যোগ্য ও অভিজ্ঞ কাউকে পাশ কাটিয়ে শুধু ঘনিষ্ঠতা, আনুগত্য বা ব্যক্তিগত যোগাযোগের কারণে অপেক্ষাকৃত কম যোগ্য কাউকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়।

এমন সংস্কৃতি ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠানের ভেতরে একটি বিপজ্জনক বার্তা ছড়িয়ে দেয়—যোগ্যতার চেয়ে পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ, কর্মদক্ষতার চেয়ে সম্পর্ক মূল্যবান।
তখন মেধাবীরা শুধু একটি পদ হারান না; তাঁরা হারান ব্যবস্থার ওপর আস্থা। আর সুবিধাবাদীরা বুঝে যান, দক্ষতার পাশাপাশি ক্ষমতাবান ব্যক্তির সুনজর অর্জন করাও ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ কৌশল।

তোষামোদ যখন পেশাগত সংস্কৃতিকে গ্রাস করে: চাটুকারিতা ক্ষমতার চারপাশে তৈরি হওয়া এক ধরনের সুবিধাবাদী সংস্কৃতি। যে ব্যক্তি ঊর্ধ্বতনের ভুল ধরিয়ে দেওয়ার বদলে সব সিদ্ধান্তের প্রশংসা করেন, তিনি হয়তো সাময়িকভাবে প্রিয় হয়ে উঠতে পারেন। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এর ক্ষতি ভয়াবহ।

কারণ একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বা কর্মীর কাজ শুধু ‘হ্যাঁ’ বলা নয়; প্রয়োজন হলে ‘না’ বলাও। ভুল সিদ্ধান্তের ঝুঁকি তুলে ধরা, বিকল্প প্রস্তাব দেওয়া এবং বাস্তব পরিস্থিতির কথা জানানোও তাঁর দায়িত্ব।
কিন্তু যদি ‘হ্যাঁ স্যার’ সংস্কৃতি পেশাগত দক্ষতার চেয়ে বেশি মূল্য পায়, তাহলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গা থেকে বাস্তবতা ধীরে ধীরে সরে যেতে পারে। ক্ষমতাবান ব্যক্তি তখন সমস্যার প্রকৃত চিত্রের বদলে শুনতে পারেন তাঁর পছন্দের কথাই।

সিনিয়রকে টপকে যাওয়ার প্রশ্ন: সরকারি প্রশাসন, রাজনৈতিক পরিমণ্ডল কিংবা পুলিশ ক্যাডার—রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটি কাঠামোতেই মেধা, অভিজ্ঞতা ও পেশাদারিত্বের যথাযথ মূল্যায়ন জরুরি। তবে বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ ও সমালোচনা রয়েছে, কোথাও কোথাও ব্যক্তিগত যোগাযোগ, তোষামোদ ও ক্ষমতাকেন্দ্রের ঘনিষ্ঠতা পেশাগত যোগ্যতার চেয়ে বেশি কার্যকর হয়ে উঠছে।

এটি কোনো কর্মকর্তা, রাজনৈতিক সহকারী বা পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ নয়; বরং একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রবণতা নিয়ে প্রশ্ন। প্রশ্নটি হলো—কোথাও কি এমন পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে, যেখানে দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার পাশাপাশি ক্ষমতাবানদের কতটা সন্তুষ্ট রাখা যায়, সেটিও উত্থানের অনানুষ্ঠানিক মাপকাঠি হয়ে উঠছে?

যদি কোনো কর্মকর্তা পেশাগত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার স্বাভাবিক ধারা অতিক্রম করে ব্যক্তিগত আনুগত্য বা তোষামোদের মাধ্যমে দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে পৌঁছানোর সুযোগ পান, তাহলে ক্ষতিটা বহুমাত্রিক। এতে বঞ্চিত হন যোগ্য সহকর্মীরা, দুর্বল হয় প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা এবং প্রশ্নের মুখে পড়ে পদায়ন ও পদোন্নতির ন্যায্যতা।

অবশ্যই সব কর্মকর্তা বা সব প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এমন প্রবণতা রয়েছে—এমন সাধারণীকরণও গ্রহণযোগ্য নয়। বরং যেখানে এমন অভিযোগ বা আশঙ্কা রয়েছে, সেখানে স্বচ্ছ মূল্যায়ন ও জবাবদিহির মাধ্যমে সত্যতা যাচাই করাই জরুরি।

যোগ্যতার জায়গায় আনুগত্য?
রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য আর কোনো ব্যক্তির প্রতি অন্ধ আনুগত্য এক বিষয় নয়। একজন কর্মকর্তা তাঁর ঊর্ধ্বতনকে সম্মান করবেন, কিন্তু তাঁর প্রধান দায়িত্ব আইন, প্রতিষ্ঠান ও জনগণের প্রতি।

যে কর্মকর্তা প্রয়োজনের সময় ঊর্ধ্বতনের ভুল সিদ্ধান্তের ঝুঁকি তুলে ধরেন, তিনি হয়তো সবসময় জনপ্রিয় হন না। কিন্তু একটি কার্যকর রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য এমন পেশাদার মানুষই প্রয়োজন।
কারণ অন্ধ আনুগত্য সিদ্ধান্ত গ্রহণকে নিরাপদ করে না; বরং ভুল সিদ্ধান্তকে আরও দীর্ঘস্থায়ী করতে পারে।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত মেধাবীরা: যোগ্যতার অবমূল্যায়নের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় মেধাবীদের। একজন দক্ষ ও সৎ মানুষ যখন দেখেন, তাঁর বহু বছরের অভিজ্ঞতার চেয়ে কারও ব্যক্তিগত যোগাযোগ বেশি মূল্যবান, তখন হতাশা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।

এই হতাশা একসময় ব্যক্তিকে ছাড়িয়ে প্রতিষ্ঠানে ছড়িয়ে পড়ে। কেউ নিষ্ক্রিয় হয়ে যান, কেউ সুযোগ পেলে অন্যত্র চলে যান, আবার কেউ পরিবেশের সঙ্গে আপস করতে বাধ্য হন। ফলে প্রতিষ্ঠান হারায় তার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ—মেধা, অভিজ্ঞতা ও পেশাদারিত্ব।
এ কারণেই যোগ্যতার ন্যায্য মূল্যায়ন শুধু ব্যক্তিগত অধিকার নয়; এটি প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতারও প্রশ্ন।

চাটুকারিতা কমানোর উপায় কী?
সমস্যার সমাধান শুধু নৈতিকতার বক্তৃতায় হবে না। প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার।

নিয়োগ ও পদোন্নতিতে স্বচ্ছ মানদণ্ড, কর্মদক্ষতার নিরপেক্ষ মূল্যায়ন, অভিজ্ঞতা ও জ্যেষ্ঠতার যথাযথ গুরুত্ব, দায়িত্ব পালনের ফলাফল পর্যালোচনা এবং জবাবদিহির কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে।

একই সঙ্গে নেতৃত্বকেও পরিবর্তন করতে হবে। একজন দক্ষ নেতা নিজের চারপাশে শুধু প্রশংসাকারী মানুষ খুঁজবেন না; বরং এমন মানুষ রাখবেন, যারা প্রয়োজনে তাঁর ভুল ধরিয়ে দিতে পারেন। কারণ প্রশংসা একজন নেতাকে স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু সত্যিকারের সমালোচনাই তাঁকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে।

শেষ কথা: একটি রাষ্ট্রের চেয়ার কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। প্রতিটি পদ জনগণের আস্থার সঙ্গে যুক্ত। সেখানে কে বসবেন, তা শুধু একজন ব্যক্তির ক্যারিয়ার নির্ধারণ করে না; নির্ধারণ করে একটি প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা, একটি সিদ্ধান্তের মান এবং কখনো কখনো লাখো মানুষের জীবনযাত্রার ওপর তার প্রভাব।
তাই চাটুকারিতার সিঁড়ি বেয়ে কেউ ওপরে উঠলে প্রশ্ন শুধু তাঁর সাফল্য নিয়ে নয়—প্রশ্ন হলো, সেই উত্থানের পথে কোন যোগ্য মানুষটিকে আমরা পিছনে ফেলে এলাম?

ব্যক্তিগত সম্পর্ক থাকবে, সৌহার্দ্য থাকবে, পারস্পরিক আস্থাও থাকবে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের দরজায় প্রবেশের চাবি হওয়া উচিত যোগ্যতা ও কর্মদক্ষতা। কারণ চাটুকার হয়তো ক্ষমতাবানকে সন্তুষ্ট করতে পারেন, কিন্তু সবসময় সংকট সামলাতে পারেন না; অনভিজ্ঞ ব্যক্তি হয়তো পদ অলংকৃত করতে পারেন, কিন্তু দায়িত্বের ভার সবসময় বহন করতে পারেন না।

রাষ্ট্রকে এগিয়ে নেয় মেধা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, সততা ও জবাবদিহি। তাই সময়ের দাবি একটাই—সম্পর্ক নয়, যোগ্যতা; তোষামোদ নয়, দক্ষতা; ব্যক্তিস্বার্থ নয়, রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থ—হোক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব বণ্টনের প্রধান মাপকাঠি।

 

লেখক: সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক ও সংগঠক।

- Advertisement -spot_img
  • সর্বশেষ
  • পঠিত