বুধবার, আগস্ট ১৯, ২০২৬

চট্টগ্রামের শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড যেন মৃত্যুকূপ

৯ বছরে শিপইয়ার্ডে ১৩৭ শ্রমিকের মৃত্যু

নিজস্ব প্রতিবেদক

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড যেন মৃত্যুকূপে পরিণত হয়েছে।
অর্ধশতাধিক শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে শ্রমিকের নিরাপত্তা, পরিবেশ অধিদফতর ও কলকারখানাসহ নানা বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে চলছে জাহাজ ব্রেকিং শিল্প প্রতিষ্ঠান। এতে প্রতি বছরই ৮-১০ জনের মৃত্যু হয়। বেশিরভাগ মৃত্যুর কারণ হিসেবে সেফটি রুলস উপেক্ষাকে দায়ী করা হচ্ছে। শুক্রবার ভোরে শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে বিষাক্ত গ্যাসের বিষক্রিয়ায় অন্তত ৯ জনের মৃত্যু হয়।

বেসরকারি সংস্থা লেবার রিসোর্স সাপোর্ট সেন্টারের
একটি জরিপের তথ্য মতে,
গত ৯ বছরে শিপইয়ার্ডে কাজ করা এমন ১৩৭ শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। তাঁদের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে ১৬ জন, ২০১৬ সালে ১৮ জন, ২০১৭ সালে ১৯ জন, ২০১৮ সালে ১৩ জন, ২০১৯ সালে ২৩ জন, ২০২০ সালে ১০ জন, ২০২১ সালে ৯ জন, ২০২২ সালে ৭ জন, ২০২৩ সালে ৭ জন। এ মৃত্যু সংখ্যা টা বছর ২০২৪ সালে দুর্ঘটনায় একজন নিহত, আবার বেড়েছে ২০২৫ সালে নিহত হয়েছেন ৪ জন। ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত নিহত হয়েছেন ৩ জন। সবশেষ গত শুক্রবার ভাটিয়ারি ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং শিপইয়ার্ডে জাহাজ কাটার সময় গ্যাসের বিষক্রিয়ায় ৯ শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।

শ্রমিক সংগঠনগুলো দাবি শ্রম আদালত অবহেলা জনিত কারণে মৃত্যু মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ সংহতি ফেডারেশন চট্টগ্রাম জেলার সভাপতি রুপন চৌধুরী বলেন, শ্রম আইন লঙ্ঘন করে, শ্রমিক নিয়োগ,নিরাপত্তা বিহীন শ্রমে সংযুক্ত করে। ফলে প্রতি বছর কোন না কোন দুর্ঘটনা ঘটে।

বিশেষ করে জাহাজ ভাঙ্গা শিল্প শ্রম আইন লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটে বেশি। দুর্ঘটনা ঘটলে বেশিরভাগ সময় তা গোপন করার চেষ্টা করা হয়। এমনকি লাশ গুম বা সাগরে ভাসিয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। ক্ষতিপূরণ থেকে বাঁচতে এবং আইনি জটিলতা থেকে রেহাই পেতে ইয়ার্ড মালিকরা এমন নির্দয় কাজটি করে থাকেন।

এছাড়া শ্রম সংশ্লিষ্ঠদের অভিমত দুর্ঘটনায় আহত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ ও আহতদের সংখ্যাও কম নয়। তবে এই সংখ্যা সুনির্দিষ্ট তথ্যও নেই। পঙ্গুত্ব বরণ সংসার চলাতে হিমশিম খাচ্ছে অনেক শ্রমিক।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গ্রিন এবং সাধারণ ইয়ার্ডগুলোতে সরাসরি শ্রমিক নিয়োগ না দিয়ে জাহাজ কাটার জন্য ঠিকাদার নিয়োগ করেন মালিকরা। ওই ঠিকাদার আবার সাব-ঠিকাদার নিয়োগ দেয়। ঠিকাদাররা তাড়াতাড়ি কাজ শেষ করার জন্য অনেক সময় নিয়মের তোয়াক্কা করেন না। সেফটি-সিকিউরিটি নিশ্চিত না করেই জাহাজ কাটার কাজে নামানো হয় শ্রমিকদের।

এছাড়া শ্রম আইন লঙ্ঘন করে দুর্ঘটনা রোধে রাত ৮টার পর জাহাজ না কাটার নির্দেশনা থাকলেও সেই নির্দেশ মানেন না অনেক ইয়ার্ড মালিকরা।

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড জাহাজ ভাঙ্গা শিল্পের কারাখানাগুলো নিয়মিত তদারকি ও কঠোর নজরদারির অভাবকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। স্ক্র্যাপ জাহাজ কাটার আগে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ও বিষাক্ত গ্যাস নিষ্কাশন নিশ্চিত না করার ফলে এসব প্রাণহানি ঘটছে বলে মনে করেন অনেকই।

ভাটিয়ারীর ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজে শ্রমিকদের নিরাপত্তাব্যবস্থায় সরকারি পরিদর্শন সংস্থা শ্রমিকদের নিরাপত্তা বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন না করা, ঝুঁকি মূল্যায়নের প্রতিবেদন না দেওয়া, নির্ধারিত সময়ের বেশি কাজ করিয়েও ওভারটাইমের টাকা না দেওয়াসহ বিভিন্ন অনিয়ম ধরা পড়ে ছয় মাস আগে। এ ব্যাপারে দুর্ঘটনায় পরে ভাটিয়ারি ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং শিপইয়ার্ড পরিদর্শন গিয়ে চট্টগ্রাম কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপমহাপরিদর্শক মাহবুবুল হাসান বলেছিলেন, ভাটিয়ারি ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং শিপইয়ার্ড এর নিরাপত্তা ত্রুটি থাকায় গত ১৫ জুলাই মামলা করেছিল।

শ্রম আদালত এর সূত্রে জানা যায়, ভাটিয়ারি ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং শিপইয়ার্ড এর নিরাপত্তা ত্রুটি থাকা ব্যাপারে কোন
মামলার রেকর্ড পাওয়া যায়নি প্রতিষ্ঠানটি বিরুদ্ধে। সূত্রটি বলছে শ্রম আইন, শ্রমে অধিকার মামলাগুলো দ্রুত সম্পন্ন করে শ্রম আদালত।

জানা গেছে, বর্তমানে সীতাকুণ্ড সমুদ্র উপকূলে ৩৫টির মতো শিপইয়ার্ড সচল রয়েছে। সেগুলোর মধ্যে গ্রিন শিপইয়ার্ড আছে মাত্র চারটি। আরও ৫-৬টি শিপইয়ার্ড গ্রিন শিপইয়ার্ডের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছে। এক সময় এই উপকূলে ১৫০টির বেশি শিপইয়ার্ড ছিল। বিদেশি পুরোনো জাহাজ কিনে তা ইয়ার্ডগুলোতে কেটে রড তৈরির কারখানায় বিক্রি করা হয়। নানা সংকটের কারণে ১২০টির মতো শিপইয়ার্ড ইয়ার্ড বন্ধ হয়ে গেছে।

ঘটনার পর গত শুক্রবার অর্থমন্ত্রী বলেন,
সরকার জাহাজ ভাঙা শিল্পে ‘গ্রিন ইয়ার্ড’ বা পরিবেশবান্ধব মানদণ্ড মেনে চলার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছে এবং এ বিষয়ে পরিদর্শন কার্যক্রমও চালানো হচ্ছে।হংকং কনভেনশনের নির্দিষ্ট মানদণ্ড পূরণের পরই ‘গ্রিন ইয়ার্ড’ সনদ দেওয়া হয়। তবে কোনো নিয়ম মানার ক্ষেত্রে ঘাটতি বা অবহেলা ছিল কি না, তা কর্তৃপক্ষ তদন্ত করে দেখবে।”

শিপ ব্লেকিং ইয়ার্ড শ্রমিক কর্মচারী ফেডারেশন এর সাধরাণ সম্পাদক শহিদুল্লাহ বলেন,ফেরদৌস স্টিল রিসাইক্লিং শিপইয়ার্ডে দুর্ঘটনায় ৯ শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনা উদ্বেগের। গ্রিন শিপইয়ার্ড হিসেবে পরিচিতি শিপইয়ার্ডেও যদি নিয়ম-কানুন না মেনে জাহাজ কাটা হয় তাহলে সাধারণ আর গ্রিন শিপইয়ার্ডের মধ্যে পার্থক্য কী থাকল।
মৃত্যু শ্রমিকদের দায় কে নেবে?

তিনি আরও বলেন, শিপইয়ার্ডে মৃত্যুর প্রতিটি ঘটনার জন্য দায়ীদের চিহ্নিত করে বিচার নিশ্চিত করতে হবে। না হয় এমন দুর্ঘটনা ঘটতেই থাকবে। আর জীবিকার তাগিদে শ্রম বেচতে আসা মানুষগুলো শ্রম দিয়ে
অনিরাপদ মৃত্যু কখনো কাম্য হতে পারে না।

- Advertisement -spot_img
  • সর্বশেষ
  • পঠিত