বাংলাদেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে Sales Executive এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মক্ষেত্র। ব্যক্তিগত ঋণ, ক্রেডিট কার্ড, আমানত, হিসাব খোলা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়িক ঋণসহ বিভিন্ন ব্যাংকিং পণ্য ও সেবা গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে Sales Team এর ভূমিকা অনেক গুরুত্বপূর্ণ।
প্রায় ১৫ বছর ধরে ব্যাংকিংয়ে কাজ করতে গিয়ে এবং দীর্ঘ সময় Sales Executive নিয়োগ, Sales Team পরিচালনা ও মাঠপর্যায়ের কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে প্রার্থীদের ইন্টারভিউতে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকে মনে হয়েছে, একজন Sales Executive নিয়োগের সময় শুধু তার শিক্ষাগত যোগ্যতা বা সুন্দর করে কথা বলার ক্ষমতা দেখলেই হয় না। বরং তার মানসিকতা, কাজের প্রতি আগ্রহ এবং চাকরিটির প্রকৃতি সম্পর্কে তার ধারণাটাও খুব গুরুত্বপূর্ণ।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, একজন প্রার্থী Sales কে সত্যিই ক্যারিয়ার হিসেবে নিতে চান কি না।
কারণ Sales এর কাজের ধরন না বুঝে কেউ যোগ দিলে কিছুদিন পর কাজের প্রতি অনীহা তৈরি হওয়া খুব অস্বাভাবিক নয়। অন্যদিকে যে প্রার্থী মাঠে কাজ করতে আগ্রহী, মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পছন্দ করে, নির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে কাজ করতে প্রস্তুত এবং চাপের মধ্যে নিজেকে সামলে নিতে পারে, তার সফল হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি।
একজন ইন্টারভিউয়ার কী দেখতে চান:
একজন Sales Executive এর মধ্যে আমরা প্রথমেই একটি ইতিবাচক মানসিকতা খুঁজে দেখি। তার মধ্যে মাঠ পর্যায়ে কাজ করার আগ্রহ আছে কি না, গ্রাহকের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে কি না, নির্দিষ্ট লক্ষ্য পূরণের জন্য কাজ করতে প্রস্তুত কি না এবং প্রয়োজন হলে অন্য জায়গায় গিয়ে কাজ করার মানসিকতা আছে কি না, এগুলো খুব স্বাভাবিকভাবেই আমাদের বিবেচনায় আসে।
একজন প্রার্থী যদি বলেন, “আমি মাঠ পর্যায়ে কাজ করতে আগ্রহী”, “লক্ষ্যভিত্তিক কাজ করতে আমার আপত্তি নেই”, “প্রয়োজনে অন্য এলাকায় গিয়ে কাজ করতে আমি প্রস্তুত”, তাহলে তার মধ্যে কাজটি বোঝার একটি মানসিকতা আমরা দেখতে পাই।
অন্যদিকে শুধু ইন্টারভিউতে প্রশ্ন করা হলে “জি, পারব”, “চেষ্টা করব”, “দেখা যাবে” বলা যথেষ্ট নয়। কারণ Sales এর বাস্তবতা হলো, প্রতিদিন নতুন গ্রাহক খুঁজতে হবে, অনেক গ্রাহক না বলে দেবেন, অনেক সম্ভাব্য ব্যবসা শেষ পর্যন্ত হবে না। তারপরও পরের দিন আবার নতুন করে শুরু করতে হবে।
কাজেই Sales এর জন্য শুধু কথা বলার দক্ষতা নয়, ধৈর্য এবং ধারাবাহিকভাবে চেষ্টা করার মানসিকতাও দরকার।
Sales কি ক্যারিয়ার, নাকি শুধু অভিজ্ঞতা নেওয়ার জায়গা:
ইন্টারভিউতে আমরা প্রায়ই জিজ্ঞেস করি, “আপনি কেন Sales দিয়ে আপনার ক্যারিয়ার শুরু করতে চান?”
অনেক প্রার্থী বলেন, “আমি কিছু অভিজ্ঞতা নিতে চাই।”
এটি খারাপ উত্তর নয়। কিন্তু একজন ইন্টারভিউয়ার হিসেবে তখন স্বাভাবিকভাবেই মনে হয়, অভিজ্ঞতা নেওয়ার পর তিনি কী করবেন? Sales কি তার দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ারের অংশ, নাকি অন্য কোনো চাকরিতে যাওয়ার আগে কিছুদিনের জন্য এই চাকরিটি করতে চান?
একজন প্রার্থী যদি বলেন, “আমি মানুষের সঙ্গে কাজ করতে পছন্দ করি, লক্ষ্যভিত্তিক পরিবেশে কাজ করতে আগ্রহী এবং Sales এর মাধ্যমে Banking Business সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা নিয়ে এই ক্ষেত্রেই ক্যারিয়ার গড়তে চাই”, তাহলে তার মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি আগ্রহের বিষয়টি অনেক বেশি পরিষ্কার হয়।
আমার কাছে একজন Sales Executive এর জন্য এটিই গুরুত্বপূর্ণ। সে Sales কে একটি চাকরি হিসেবে দেখছে, নাকি পেশা হিসেবে নিতে চাইছে।
নিজের এলাকার বাইরে কাজ করার মানসিকতাও গুরুত্বপূর্ণ:
দীর্ঘদিন Sales Executive নিয়োগ করতে গিয়ে একটি বিষয় বেশ কয়েকবার লক্ষ্য করেছি। কিছু প্রার্থী নিজেদের পরিচিত এলাকা, পরিবার ও সামাজিক পরিবেশের বাইরে গিয়ে কাজ করতে খুব বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না।
কিছু অঞ্চলের তরুণ-তরুণীদের মধ্যে নিজের এলাকার প্রতি টান এবং পরিচিত পরিবেশে থাকার আগ্রহ তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। আবার অনেক এলাকার প্রার্থীকে দেশের বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে কাজ করার বিষয়ে বেশ নমনীয় পাওয়া যায়।
এটি কোনো নির্দিষ্ট জেলা বা অঞ্চলের মানুষের বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ব্যক্তিগত ও পারিবারিক পরিস্থিতি এখানে বড় বিষয়। তবে Sales এর চাকরিতে পেশাগতভাবে চলাফেরা করার মানসিকতা থাকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
CV তে যদি লিখেন “Anywhere in Bangladesh”, কিন্তু ইন্টারভিউতে বলেন, “আমাকে আমার নিজের এলাকায় পোস্টিং দিলে ভালো করতে পারব”, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই একটি প্রশ্ন তৈরি হয়।
Sales একটি চ্যালেঞ্জিং পেশা। আজ এক এলাকায় কাজ করতে হতে পারে, ভবিষ্যতে অন্য এলাকায় কাজের প্রয়োজন হতে পারে। তাই একজন তরুণ Sales professional-এর মধ্যে কিছুটা খোলা মন এবং নতুন পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার মানসিকতা থাকা প্রয়োজন।
যোগাযোগের ভাষা ও পেশাদারিত্বের অংশ:
বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চলের নিজস্ব ভাষা, উচ্চারণ ও কথ্যরীতি রয়েছে। এটি আমাদের সংস্কৃতির অংশ এবং কোনো আঞ্চলিক ভাষাকে ছোট করে দেখার প্রশ্নই আসে না।
তবে ইন্টারভিউ বা পেশাগত পরিবেশে, বিশেষ করে Sales এর মতো গ্রাহকসামনে কাজ করতে হয় এমন পদে, প্রমিত ও সহজবোধ্য বাংলায় অথবা প্রয়োজন অনুযায়ী ইংরেজিতে কথা বলার অভ্যাস থাকা ভালো।
চট্টগ্রাম, সিলেট, নোয়াখালী, বরিশাল, ময়মনসিংহ, জামালপুর কিংবা পুরান ঢাকার প্রার্থীদের কথাবার্তায় আঞ্চলিকতার প্রভাব থাকতেই পারে। এটি স্বাভাবিক। কিন্তু একজন ব্যাংকারকে ভবিষ্যতে দেশের বিভিন্ন এলাকার মানুষের সঙ্গে, বিভিন্ন পেশার মানুষের সঙ্গে এবং বিভিন্ন ধরনের গ্রাহকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে।
তাই ইন্টারভিউয়ের সময় আঞ্চলিক শব্দ বা অতিরিক্ত আঞ্চলিক টান কিছুটা কমিয়ে পরিষ্কার ও সাধারণভাবে বোঝা যায় এমন ভাষায় কথা বলার চেষ্টা করা উচিত।
এটি নিজের আঞ্চলিক পরিচয় বাদ দেওয়ার বিষয় নয়। বরং পেশাগত প্রয়োজনে নিজের যোগাযোগের ধরনকে পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা।
পোশাক ও গেটআপ নিয়েও প্রস্তুতি থাকা দরকার:
একজন প্রার্থী ইন্টারভিউ বোর্ডের সামনে বসার আগেই তার সম্পর্কে কিছু ধারণা তৈরি হয়ে যায়। পোশাক, পরিচ্ছন্নতা, চুল, দাড়ি, জুতা, বসার ধরন এবং সামগ্রিক গেটআপ থেকে অনেক সময় বোঝা যায় তিনি কতটা গুরুত্ব ও প্রস্তুতি নিয়ে এসেছেন।
ভালো পোশাক মানে দামি পোশাক নয়। পরিষ্কার, ইস্ত্রি করা এবং ব্যক্তিত্বের সঙ্গে মানানসই পোশাকই যথেষ্ট।
বিশেষ করে পুরুষ প্রার্থীদের ক্ষেত্রে ফরমাল গেটআপে আসাই ভালো। জিন্স, অতিরিক্ত ক্যাজুয়াল জুতা, খুব উজ্জ্বল রঙের শার্ট, অগোছালো চুল বা দাড়ি, হাতা ভাঁজ করে রাখা কিংবা অতিরিক্ত অলংকার ইন্টারভিউয়ের জন্য উপযুক্ত নয়।
টাই পরলে সেটি সঠিকভাবে পরা, শার্ট-প্যান্ট ও জুতার মধ্যে সামঞ্জস্য রাখা এবং পুরো গেটআপটি পরিপাটি রাখা উচিত।
নারী প্রার্থীদের ক্ষেত্রেও পোশাক পরিষ্কার, মার্জিত ও পেশাদার হওয়া উচিত।
বাংলায় একটি কথা আছে, “আগে দর্শনধারী, পরে গুণবিচারী।” Sales এর মানুষ হিসেবে প্রতিনিয়ত গ্রাহকের সামনে যেতে হবে। তাই ব্যক্তিগত উপস্থাপন ও স্মার্টনেসও এই কাজের একটি অংশ।
CV হচ্ছে আপনার প্রথম পরিচয়:
একজন প্রার্থীর CV দেখে অনেক সময় তার প্রস্তুতি সম্পর্কে প্রথম ধারণা পাওয়া যায়। অথচ অনেক CV তে খুব সাধারণ কিছু ভুল থাকে।
বিশেষ করে অন্যের CV কপি করে বা কম্পিউটারের দোকান থেকে তৈরি করা CV তে কখনো অন্য প্রার্থীর নাম, মোবাইল নম্বর, প্রতিষ্ঠানের নাম কিংবা ভুল তথ্য থেকে যায়। কোথাও বানান ভুল, কোথাও অসম্পূর্ণ তথ্য, কোথাও আবার আগের চাকরির সময়কাল পরিষ্কার নয়।
CV জমা দেওয়ার আগে নিজে পুরো CV পড়া উচিত। নাম, মোবাইল নম্বর, ই-মেইল, শিক্ষাগত যোগ্যতা, CGPA, পাসের বছর, চাকরির অভিজ্ঞতা সবকিছু মূল কাগজপত্রের সঙ্গে মিলিয়ে নিন।
CV তে সাম্প্রতিক ছবি ব্যবহার করুন। অনেক সময় দেখা যায়, কয়েক বছর আগের ক্লিন শেভ, টাই ও স্যুট পরা ছবি CV তে দেওয়া আছে, কিন্তু ইন্টারভিউতে এসে প্রার্থীর বর্তমান চেহারা সম্পূর্ণ ভিন্ন। নারী প্রার্থীদের ক্ষেত্রেও একই বিষয় দেখা যায়।
তাই CV তে বর্তমান চেহারার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সাম্প্রতিক ছবি ব্যবহার করাই ভালো।
Permanent Address এর ক্ষেত্রেও যত্নবান হওয়া দরকার। শুধু “মিরপুর, ঢাকা” লিখলে সেটি পূর্ণাঙ্গ স্থায়ী ঠিকানা নয়। প্রয়োজন অনুযায়ী বাড়ি বা হোল্ডিং নম্বর, রোড বা গ্রামের নাম, পোস্ট অফিস, থানা বা উপজেলা এবং জেলা উল্লেখ করা উচিত।
পূর্ববর্তী চাকরির প্রতিষ্ঠানের নাম, পদবী, সময়কাল এবং দায়িত্ব পরিষ্কারভাবে লিখুন। শিক্ষাগত যোগ্যতার CGPA ও অন্যান্য তথ্য যাচাই করে লিখুন।
Extra-curricular activities থাকলে সেগুলোও উল্লেখ করা যেতে পারে। খেলাধুলা, বিতর্ক, স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ, নেতৃত্ব বা সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের মতো বিষয় একজন প্রার্থীর ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে।
Computer literacy এর ক্ষেত্রেও যা সত্যিই পারেন, সেটিই লিখুন। বর্তমান সময়ে Word, Excel, PowerPoint, ই-মেইল ও অনলাইন ব্যবস্থায় কাজ করার দক্ষতা বেশি প্রাসঙ্গিক। বহু পুরোনো Windows এর নাম দিয়ে কম্পিউটার দক্ষতা দেখানোর প্রয়োজন নেই।
প্রস্তুতি ছাড়া ইন্টারভিউতে আসবেন না:
যে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ইন্টারভিউ দিতে যাচ্ছেন, সেই প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে অন্তত কিছুটা পড়াশোনা করে আসুন।
প্রতিষ্ঠানটি কী ধরনের ব্যবসা করে, প্রধান পণ্য কী, কোন ধরনের গ্রাহকের সঙ্গে কাজ করে, Sales এর ক্ষেত্রে তাদের কী ধরনের পণ্য থাকতে পারে, এসব সম্পর্কে মৌলিক ধারণা থাকা উচিত।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকা এবং ব্যাংকিং খাতের সাম্প্রতিক কিছু বিষয় সম্পর্কেও ধারণা রাখা ভালো।
সব পণ্য মুখস্থ করার প্রয়োজন নেই। কিন্তু যে প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতে চান, সেটি সম্পর্কে কিছুই না জেনে ইন্টারভিউতে আসা আপনার প্রস্তুতির ঘাটতি প্রকাশ করে।
একইভাবে নিজের পড়াশোনার বিষয় সম্পর্কেও প্রস্তুত থাকুন। অর্থনীতি, হিসাববিজ্ঞান, ব্যবস্থাপনা, মার্কেটিং বা যে বিষয়েই পড়াশোনা করেন না কেন, সেই বিষয়ের মৌলিক কিছু প্রশ্নের উত্তর দিতে পারা উচিত।
ইন্টারভিউতে সাম্প্রতিক ঘটনা, শখ এবং ব্যক্তিগত কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন হতে পারে। CV তে যে শখ বা কার্যক্রম লিখেছেন, সে বিষয়ে স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারা উচিত।
কেউ যদি প্রশ্ন করে, “আপনার শখ কী?” আর উত্তর দেন, “আমার শখ ব্যাংকার হওয়া”, তাহলে বোঝা যায় প্রশ্নটি হয়তো ঠিকভাবে বুঝতে পারেননি।
ইন্টারভিউতে শুধু উত্তর জানা নয়, প্রশ্নটি কী জানতে চাইছে সেটি বোঝাও একটি গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা।
সংক্ষিপ্ত ও নির্দিষ্ট উত্তর দিন:
ইন্টারভিউতে একটি সাধারণ প্রশ্ন হতে পারে, “আপনার বাবার পেশা কী?”
এখানে “আমার বাবা সরকারি চাকরি করেন” বলার চেয়ে যদি সত্য হয়, “আমার বাবা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক” বলা অনেক বেশি পরিষ্কার।
“আমার বাবা ব্যবসা করেন” না বলে কী ধরনের ব্যবসা করেন, সেটি এক বাক্যে বলা যায়।
আবার বাবা যদি মারা গিয়ে থাকেন, তাহলে সরাসরি ও স্বাভাবিকভাবে বলা যায়, “আমার বাবা মারা গেছেন; বর্তমানে আমার মা আমাদের পরিবারের দেখাশোনা করেন।”
অর্থাৎ প্রশ্ন অনুযায়ী উত্তর দিন। অপ্রয়োজনীয় গল্প করবেন না, আবার একেবারে অস্পষ্ট উত্তরও দেবেন না।
একজন Sales Executive এর জন্য এই দক্ষতা খুব গুরুত্বপূর্ণ, কারণ গ্রাহকের সঙ্গেও পরিষ্কার ও নির্দিষ্টভাবে কথা বলতে হয়।
পড়াশোনার গ্যাপ বা দীর্ঘ সময়ের বেকারত্ব থাকলে:
অনেক প্রার্থীর শিক্ষাজীবনে দুই-তিন বছর বা তারও বেশি সময়ের গ্যাপ থাকে। গ্যাপ থাকাটা নিজে কোনো সমস্যা নয়। কিন্তু সেই সময় কী করেছেন, কেন করেছেন, সেটির একটি পরিষ্কার ও সত্য উত্তর থাকা দরকার।
একইভাবে গ্র্যাজুয়েশন বা পোস্টগ্র্যাজুয়েশন শেষ করার পর পাঁচ-ছয় বছর চাকরির অভিজ্ঞতা না থাকলে প্রশ্ন আসতেই পারে, এই সময়ে কী করেছেন।
অনেকে বলেন, “সরকারি চাকরির জন্য চেষ্টা করেছি।” তখন স্বাভাবিকভাবেই জানতে চাওয়া হতে পারে, কোন ধরনের পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন, কতবার লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন, কোথাও সাক্ষাৎকার দিয়েছেন কি না।
তাই দীর্ঘ সময়ের গ্যাপ থাকলে বিষয়টি এড়িয়ে না গিয়ে বাস্তব ও সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা প্রস্তুত রাখুন।
আগের চাকরি কেন পরিবর্তন করতে চান:
যারা আগে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান বা অন্য কোনো খাতে কাজ করেছেন, তাদের ক্ষেত্রে আমরা প্রায়ই জানতে চাই, “আপনি আপনার বর্তমান বা আগের চাকরিটি কেন পরিবর্তন করতে চান?”
এখানে অনেক প্রার্থী আগের প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে প্রচুর নেতিবাচক কথা বলেন। প্রতিষ্ঠান ভালো ছিল না, বেশি কাজ করাত, রাত পর্যন্ত অফিস করতে হতো, ছুটি পাওয়া যেত না, ম্যানেজার ভালো ছিলেন না, অনেক দূরে পোস্টিং দিয়েছিল ইত্যাদি।
বাস্তবে এসব কারণ সত্যি হতে পারে। কিন্তু ইন্টারভিউতে একজন প্রার্থীর কাছ থেকে আমরা সাধারণত পেশাদার উত্তর আশা করি।
যেমন বলা যায়, “আমি আমার আগের প্রতিষ্ঠানে ভালো কিছু শিখেছি। তবে দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংকিং খাতে ক্যারিয়ার গড়ার আগ্রহ থেকে পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”
অথবা, “বর্তমান চাকরিতে আমি ভালো অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি। এখন আমি ব্যাংকিং Sales ও Customer Relationship এর ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার গড়তে চাই।”
সত্য গোপন করার প্রয়োজন নেই। তবে অভিযোগের তালিকা দেওয়ারও প্রয়োজন নেই। উত্তরটি সংক্ষিপ্ত, সত্য এবং ভবিষ্যতমুখী হওয়াই ভালো।
বেশি বেতন ছেড়ে ব্যাংকিংয়ে আসছেন, একটু ভেবে দেখুন:
কখনো এমন প্রার্থীও পাওয়া যায়, যিনি অন্য প্রতিষ্ঠানে ৪০ বা ৫০ হাজার টাকা বা তার বেশি বেতনে কাজ করছেন এবং কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা রয়েছে। কিন্তু শুধু ব্যাংকে চাকরি করার আগ্রহ থেকে তিনি সেই চাকরি ছেড়ে ৩০ বা ৩৫ হাজার টাকার Sales বা Trainee position এ যোগ দিতে চান।
Career change অবশ্যই করা যায়। তবে সিদ্ধান্তটি ভালোভাবে বুঝে নেওয়া দরকার।
শুধু ব্যাংকের চাকরি মানেই বেশি নিরাপদ, আরামদায়ক বা ভবিষ্যৎ নিশ্চিত, এমন ধারণা ঠিক নয়। ব্যাংকের Sales job ও অনেক চ্যালেঞ্জিং। এখানে লক্ষ্য থাকে, মাঠে কাজ থাকে, গ্রাহক ব্যবস্থাপনা থাকে, চাপ থাকে এবং কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে নিয়মিত মূল্যায়ন হয়।
বাংলাদেশে অনেক প্রতিষ্ঠান আছে যারা ভালো কর্মপরিবেশ, ভালো বেতন এবং দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ারের সুযোগ দেয়। তাই শুধু প্রতিষ্ঠানের নাম বা খাত পরিবর্তনের আকর্ষণে নিজের বর্তমান অবস্থান ছেড়ে দেওয়া ঠিক নয়।
বিশেষ করে পাঁচ-ছয় বছরের অভিজ্ঞতা এবং ভালো বেতনের চাকরি ছেড়ে নতুন খাতে এলে নিজের সিদ্ধান্তের দায়ও বেশি।
নিজেকে আগে প্রশ্ন করুন, আমি কি সত্যিই ব্যাংকিংয়ে ক্যারিয়ার করতে চাই? আমি কি কম বেতনে নতুন করে শুরু করতে প্রস্তুত? আমি কি Sales এর লক্ষ্য ও চাপ নিতে পারব? আমি কি নতুন পরিবেশ ও কাজের ধরন শিখতে প্রস্তুত?
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, আমি কি শুধু ব্যাংকে চাকরি করতে চাই, নাকি ব্যাংকিংয়ে ক্যারিয়ার করতে চাই?
দুটি বিষয় এক নয়।
অতিরিক্ত যোগ্যতার প্রার্থীদের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ:
কখনো এমন প্রার্থীও ইন্টারভিউতে আসেন, যার শিক্ষাগত যোগ্যতা বা অভিজ্ঞতা পদের প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি।
তখন একজন ইন্টারভিউয়ার স্বাভাবিকভাবেই জানতে চান, তিনি সত্যিই কি এই কাজটি করতে আগ্রহী, নাকি আপাতত একটি চাকরি নেওয়ার জন্য আবেদন করেছেন।
এ ধরনের প্রার্থী হলে কেন এই পদে আবেদন করেছেন এবং কীভাবে এখান থেকে দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার গড়তে চান, সেটি পরিষ্কারভাবে বোঝানো উচিত।
নারী প্রার্থীদের ক্ষেত্রেও চাকরির প্রকৃতি বোঝা জরুরি:
নারী প্রার্থীদের ক্ষেত্রেও মূল বিবেচনা হওয়া উচিত যোগ্যতা, দক্ষতা, আচরণ এবং কাজের উপযুক্ততা।
তবে Sales position এর ক্ষেত্রে প্রার্থী চাকরিটির বাস্তব দায়িত্ব বুঝে আবেদন করেছেন কি না, সেটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রয়োজন অনুযায়ী গ্রাহকের কাছে যেতে হতে পারে, মাঠ পর্যায়ে কাজ করতে হতে পারে, বিভিন্ন এলাকায় যাতায়াত করতে হতে পারে এবং নির্দিষ্ট ব্যবসায়িক লক্ষ্য অর্জনের দায়িত্ব থাকতে পারে।
এখানে প্রশ্নটি হওয়া উচিত নয়, একজন নারী এই কাজ করতে পারবেন কি না। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত, প্রার্থী কি চাকরিটির বাস্তব দায়িত্ব বুঝেছেন এবং সেই দায়িত্ব পালনে নিজেকে প্রস্তুত মনে করছেন?
ইন্টারভিউ শুধু বোর্ডের সামনে শুরু হয় না:
একজন প্রার্থী মনে করতে পারেন, ইন্টারভিউ শুরু হবে যখন তিনি বোর্ডের সামনে বসবেন। আসলে তার পেশাদারিত্ব আরও আগে থেকেই প্রকাশ পেতে থাকে।
ইন্টারভিউ ভেন্যুতে প্রবেশ করার পর থেকে বের হয়ে যাওয়া পর্যন্ত সময়ানুবর্তিতা, অপেক্ষার সময়ের আচরণ, ফোন ব্যবহারের ধরন, বডি ল্যাঙ্গুয়েজ এবং যারা ইন্টারভিউ সমন্বয় করছেন তাদের সঙ্গে ব্যবহার – সবকিছুই গুরুত্বপূর্ণ।
ইন্টারভিউ কিছুটা দেরিতে শুরু হলে অস্থির বা বিরক্ত না হয়ে ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করাও পেশাদারিত্বের অংশ।
অন্য প্রার্থীদের প্রতিও সৌজন্য বজায় রাখুন। বিশেষ করে ইন্টারভিউ দিয়ে বের হওয়ার পর বারবার অন্যদের কাছে গিয়ে “কী প্রশ্ন করেছে?” জানতে চাওয়া এড়িয়ে চলাই ভালো।
প্রতিষ্ঠানের প্রাঙ্গণে প্রবেশ করা থেকে বের হয়ে যাওয়া পর্যন্ত আপনার আচরণই আপনার পেশাদারিত্বের একটি অংশ।
চাকরির নামে আর্থিক লেনদেন থেকে সতর্ক থাকুন:
বর্তমান সময়ে চাকরিপ্রার্থীদের জন্য একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার। ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের চাকরির জন্য কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা তৃতীয় পক্ষের সঙ্গে চাকরি পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে অর্থ, উপহার বা অন্য কোনো আর্থিক সুবিধা দেওয়ার বিষয়ে সতর্ক থাকুন।
ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান সাধারণত তাদের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি নিজস্ব ওয়েবসাইট, নির্ধারিত চাকরির পোর্টাল বা অনুমোদিত মাধ্যমে প্রকাশ করে। পরে সেই বিজ্ঞপ্তি বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অ্যালামনাই গ্রুপ বা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
কিন্তু কোনো ব্যক্তি যদি বলে, “টাকা দিলে চাকরি নিশ্চিত”, “ম্যানেজ করে দেওয়া যাবে” বা “নির্দিষ্ট অর্থ দিলে নিয়োগ হবে”, তাহলে বিষয়টি থেকে দূরে থাকুন এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক নিয়োগ চ্যানেলের মাধ্যমে তথ্য যাচাই করুন।
চাকরি পাওয়ার জন্য কাউকে টাকা দেওয়ার প্রয়োজন নেই। নিজের যোগ্যতা, সঠিক আবেদন এবং প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত নিয়োগ প্রক্রিয়ার ওপর আস্থা রাখুন।
ইন্টারভিউ শেষে আপনিও প্রশ্ন করতে পারেন:
ইন্টারভিউয়ার যদি বলেন, “আপনার কি আমাদের জন্য কোনো প্রশ্ন আছে?”, তখন একটি প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন করতে পারেন।
যেমন, “এই পদে যোগ দেওয়ার পর প্রথম তিন থেকে ছয় মাসে একজন নতুন Sales Executive এর কাছ থেকে কী ধরনের ফলাফল প্রত্যাশা করা হয়?”
অথবা, “নতুন কর্মীদের জন্য কী ধরনের প্রশিক্ষণ ও সহায়তার ব্যবস্থা থাকে?”
এ ধরনের প্রশ্ন প্রমাণ করে যে আপনি শুধু চাকরি পাওয়ার জন্য আসেননি, চাকরিটির দায়িত্ব ও ভবিষ্যৎ নিয়েও চিন্তা করেছেন।
শেষ কথা:
এখানে যে বিষয়গুলো বলা হলো, এগুলো কোনো নির্দিষ্ট ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিয়োগনীতি নয়। প্রতিটি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব নিয়োগনীতি, যোগ্যতার মানদণ্ড, মানবসম্পদ প্রক্রিয়া এবং Sales Team পরিচালনার নিজস্ব পদ্ধতি রয়েছে। প্রতিষ্ঠানভেদে নিয়োগের নিয়ম ও ইন্টারভিউ প্রক্রিয়ায় পার্থক্য থাকতেই পারে।
এখানে বলা বিষয়গুলো মূলত দীর্ঘদিনের কাজের অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া কিছু সাধারণ পর্যবেক্ষণ ও পরামর্শ। যারা ব্যাংকিং Sales, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের Sales অথবা Trainee/Sales Executive হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করতে চান, তাদের জন্য পরামর্শ।
প্রথমে চাকরিটির প্রকৃতি বুঝুন। তারপর প্রস্তুতি নিন। তারপর আবেদন করুন।
নিজের CV ঠিক করুন। সাম্প্রতিক ছবি ব্যবহার করুন। নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা সম্পর্কে পরিষ্কার থাকুন। যে প্রতিষ্ঠানে ইন্টারভিউ দিতে যাচ্ছেন, সেটি সম্পর্কে পড়াশোনা করুন। ব্যাংকিং খাত ও সাম্প্রতিক বিষয় সম্পর্কে ধারণা নিন। নিজের পড়াশোনার বিষয়টি ভালোভাবে জানুন। নিজের শখ ও অতিরিক্ত কার্যক্রম সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা রাখুন।
ইন্টারভিউয়ের দিন সময়মতো পৌঁছান। পরিপাটি পোশাক পরুন। পরিষ্কার ও প্রমিত ভাষায় কথা বলার চেষ্টা করুন। ভদ্র ও ইতিবাচক থাকুন। প্রশ্ন বুঝে সংক্ষিপ্ত ও নির্দিষ্ট উত্তর দিন। কোনো কিছু না জানলে স্বীকার করুন। আগের প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে অপ্রয়োজনীয় নেতিবাচক কথা বলবেন না।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, নিজের কাছে পরিষ্কার রাখুন, আপনি কি শুধু একটি চাকরি খুঁজছেন, নাকি একটি ক্যারিয়ার শুরু করতে যাচ্ছেন।
সামান্য প্রস্তুতিও অনেক সময় একজন প্রার্থীকে অন্য দশজন বা পঞ্চাশজন প্রার্থীর চেয়ে এগিয়ে দিতে পারে।
যারা ব্যাংকিং Sales বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে তাদের ক্যারিয়ার শুরু করতে চান, সকলের জন্য রইল আন্তরিক শুভকামনা।
Sales এ সফল হতে শুধু কথা বলতে জানতে হয় না। মানুষকে বুঝতে হয়, প্রত্যাখ্যানকে গ্রহণ করতে হয়, নতুন জায়গায় মানিয়ে নিতে হয়, প্রতিদিন নতুন করে চেষ্টা করতে হয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, নিজের কাজটাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করতে হয়।
লেখক: মো: কামরুল ইসলাম
ব্যাংকার

