শনিবার, আগস্ট ১৫, ২০২৬

জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি: গণতন্ত্রের মা বেগম খালেদা জিয়া—যাঁর ঠিকানা ছিল বাংলাদেশ

কাজী সরোয়ার খান মনজু

চেরাগি নিউজ ডেস্ক

১৫ আগস্ট ২০২৬, শনিবার ‘গণতন্ত্রের মা’ সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার ৮২তম জন্মদিন। এ উপলক্ষে আজ ঢাকাসহ দেশব্যাপী দলীয় কার্যালয় অথবা মসজিদে মিলাদ ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে। জন্মদিনের এই দিনে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করছি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেত্রী, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন ও তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়াকে। তাঁর আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়া একটি অনন্য নাম। তিনি শুধু বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন ও তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নন; তিনি বাংলাদেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনের এক অবিচল, আপসহীন ও সাহসী নেতৃত্বের প্রতীক। জন্মদিনের এই দিনে তাঁর বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন, গণতন্ত্রের জন্য দীর্ঘ সংগ্রাম এবং দেশের মানুষের প্রতি তাঁর অঙ্গীকার গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি এবং তাঁর আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি।
বেগম খালেদা জিয়া ১৯৪৬ সালের ১৫ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ইস্কান্দার মজুমদার এবং মাতা তৈয়বা মজুমদার। তাঁর পৈতৃক নিবাস ফেনী জেলার ফুলগাজী উপজেলায়। দিনাজপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও সুরেন্দ্রনাথ কলেজে তিনি অধ্যয়ন করেন। ১৯৬০ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়।

স্বামী শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর বেগম খালেদা জিয়া সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে যুক্ত হন। ১৯৮২ সালের ২ জানুয়ারি বিএনপিতে সাধারণ সদস্য হিসেবে যোগদানের পর ধীরে ধীরে দলের নেতৃত্বে উঠে আসেন এবং ১৯৮৪ সালের আগস্টে বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। এরপর তাঁর নেতৃত্বে শুরু হয় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের এক দীর্ঘ ও কঠিন সংগ্রাম।
স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তাঁর দৃঢ় অবস্থানের কারণে তিনি ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৮৩ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত তাঁকে সাতবার আটক করা হয়। তাঁর নেতৃত্বে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলও শক্তিশালী সংগঠনে পরিণত হয় এবং এরশাদবিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অবাধ ও সুষ্ঠু সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ের মধ্য দিয়ে বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর প্রধানমন্ত্রীত্বের সময় বাংলাদেশ সংসদীয় গণতন্ত্রে ফিরে আসে। অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, নারীর ক্ষমতায়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর সরকারের নানা উদ্যোগ দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে ভূমিকা রাখে।
মেয়েদের জন্য বিনামূল্যে শিক্ষা ও উপবৃত্তি, প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা, শিক্ষা কার্যক্রমে খাদ্য কর্মসূচি এবং শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ তাঁর সরকারের উল্লেখযোগ্য উদ্যোগগুলোর মধ্যে ছিল। তৈরি পোশাকশিল্পেও এ সময়ে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পায় এবং বিপুলসংখ্যক নারী এই খাতে যুক্ত হন।
বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল জাতীয় স্বার্থে তাঁর দৃঢ় অবস্থান। জাতিসংঘে গঙ্গার পানি-বণ্টনের বিষয়টি উত্থাপন এবং হোয়াইট হাউসে রোহিঙ্গা মুসলিম শরণার্থীদের সমস্যা তুলে ধরার মধ্য দিয়ে তিনি বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যুগুলো আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উপস্থাপন করেন।
১৯৯৬ ও ২০০১ সালেও তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০১ সালের নির্বাচনে দুর্নীতি ও সন্ত্রাস নির্মূলের অঙ্গীকার নিয়ে বিএনপির নেতৃত্বে চারদলীয় জোট বিজয় লাভ করে। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের আরেকটি অনন্য দিক হলো—তিনি কোনো সংসদীয় আসনে নির্বাচনে পরাজিত হননি। ১৯৯১ থেকে ২০০১ সালের সাধারণ নির্বাচনগুলোতে তিনি পাঁচটি পৃথক সংসদীয় আসন থেকে নির্বাচিত হন এবং ২০০৮ সালে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা তিনটি আসনেই জয়লাভ করেন।
পরবর্তী সময়ে তাঁর জীবনে নেমে আসে নানা রাজনৈতিক প্রতিকূলতা, কারাবাস ও দীর্ঘ আইনি লড়াই। ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বরে স্বৈরাচারী সরকার তাঁকে গ্রেপ্তার করে। ২০১৮ সালে দুর্নীতি মামলায় তিনি কারাদণ্ডিত হন। জীবনের শেষ বছরগুলোতে দীর্ঘ শারীরিক অসুস্থতা ও আইনি লড়াইয়ের মধ্যেও তিনি গণতন্ত্রের জন্য তাঁর সংগ্রাম অব্যাহত রাখেন।
২০০৯ সাল থেকে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার বাংলাদেশকে একটি কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রে পরিণত করে—এমন অভিযোগের প্রেক্ষাপটে বেগম খালেদা জিয়া আবারও গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলনে সক্রিয় হন। তাঁকে জোরপূর্বক তাঁর বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয় এবং গণতন্ত্রের আন্দোলনের কারণে দুইবার গৃহবন্দী করা হয়। দেশ থেকে বিদেশে চলে যাওয়ার জন্য বহুবার চাপ ও চেষ্টা করা হলেও তিনি বলেছেন—‘আমার ঠিকানা বাংলাদেশ।’
রাজনৈতিক প্রতিকূলতা, প্রিয়জন হারানোর বেদনা, পরিবারের সদস্যদের ওপর নির্যাতন এবং দীর্ঘ অসুস্থতা—কোনো কিছুই তাঁকে দেশের মাটি ও মানুষের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত দেশের জন্য তাঁর লড়াই অব্যাহত ছিল।
গণতন্ত্রের প্রতি তাঁর ভূমিকার স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১১ সালে নিউ জার্সির স্টেট সিনেট তাঁকে ‘গণতন্ত্রের জন্য যোদ্ধা’ উপাধিতে সম্মানিত করে। নারী শিক্ষা ও নারীর ক্ষমতায়নে তাঁর ভূমিকার জন্য ২০০৫ সালে ফোর্বস ম্যাগাজিন বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর নারীদের তালিকায় তাঁকে ২৯তম স্থানে স্থান দেয়।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া দীর্ঘ অসুস্থতার পর ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর ইন্তেকাল করেন। তাঁর মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক গভীর শূন্যতার সৃষ্টি করেছে। তাঁর জানাজার নামাজে মানুষের যে অভূতপূর্ব সমাগম হয়েছিল, তা তাঁর প্রতি সাধারণ মানুষের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ।
বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন গণতন্ত্রের মা, আপসহীন দেশনেত্রী। তাঁর রাজনৈতিক জীবন ছিল সংগ্রাম, ত্যাগ, সাহস ও দেশপ্রেমের এক দীর্ঘ অধ্যায়। তিনি ক্ষমতার জন্য নয়, গণতন্ত্র ও দেশের মানুষের অধিকারের জন্য লড়াই করেছেন—এমন বিশ্বাস তাঁর অনুসারী ও সমর্থকদের হৃদয়ে গভীরভাবে প্রোথিত।
আজ তাঁর জন্মদিনে তাই কোনো রাজনৈতিক বিভাজন নয়, বরং শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করতে চাই বাংলাদেশের এই প্রভাবশালী নারী নেত্রীকে। মহান আল্লাহ তাঁর জীবনের সব ভুলত্রুটি ক্ষমা করুন, তাঁর কবরকে নূরে ভরে দিন এবং তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন।
গণতন্ত্রের মা, আপসহীন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জন্মদিনে জানাই গভীর শ্রদ্ধা। তাঁর আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি।
বেগম খালেদা জিয়া—একটি নাম, একটি সংগ্রাম, একটি গণতান্ত্রিক ইতিহাস।

লেখক : যুগ্ম আহবায়ক, ৯০দশক ছাত্রদল রাউজান উপজেলা ও সাবেক দপ্তর সম্পাদক জাসাস চট্টগ্রাম উত্তর জেলা।

- Advertisement -spot_img
  • সর্বশেষ
  • পঠিত