শনিবার, এপ্রিল ১৮, ২০২৬

নির্বাচনের মুখে ওয়াসার নিয়োগ তৎপরতা

চট্টগ্রাম ওয়াসায় নিয়োগ ঘিরে নতুন বিতর্ক

বিশেষ প্রতিনিধি

তিনবছর আগে চট্টগ্রাম ওয়াসার নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নিয়ে উত্তীর্ণ হয় ৩৭ জন। সেই একই পদে আবারও নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে ওয়াসা। পূর্বের নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রার্থীদের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত না নিয়ে আগামী শনিবার আবার একই পদের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত করতে যাচ্ছে সংস্থাটি। তবে সেখানে পূর্বের প্রার্থীদের পরীক্ষায় দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে বিস্তর অভিযোগ উঠেছে। বিশাল অঙ্কের আর্থিক লেনদেন থেকে শুরু করে প্রক্রিয়া অনুসরণ না করা, আইন অমান্য করার মতো গুরুতর অভিযোগও রয়েছে সংস্থাটির বিরুদ্ধে।

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের মাত্র দুই সপ্তাহ বাকি। প্রশাসন যখন নির্বাচনী প্রস্তুতিতে ব্যস্ত, ঠিক তখনই চট্টগ্রাম ওয়াসা বিপুল সংখ্যক জনবল নিয়োগে দৌড়ঝাপ শুরু করায় প্রশ্ন উঠেছে সংস্থাটির ভূমিকা ও উদ্দেশ্য নিয়ে। গত ডিসেম্বর মাসে প্রকাশিত দুটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে মোট ৩২৯টি পদে জনবল নিয়োগের ঘোষণা দেয় ওয়াসা। অভিযোগ রয়েছে, এই নিয়োগ প্রক্রিয়া তড়িঘড়ি সম্পন্ন করে নির্বাচনের আগেই একটি গোষ্ঠী নিজেদের সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করছে। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, তিন বছর আগে অনুষ্ঠিত নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রার্থীদের ভবিষ্যৎ ঝুলে রেখেই নতুন করে একই পদে পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে। তাছাড়া রাজস্ব খাতে ওয়াসায় নিয়োজিত প্রকৌশলীদের এ প্রক্রিয়া থেকে দূরে রাখা হয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, চট্টগ্রাম ওয়াসার রাজস্ব খাতে ২৪টি ক্যাটাগরিতে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয় ১০ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে। স্মারক নম্বর ৪৬.০৬.০০০০.১০৩.১০৪.৭৬৯.১৬ (পার্ট-১১)-১৪৯৬ ও ১৪৯৭ অনুযায়ী এই বিজ্ঞপ্তিতে সহকারী প্রকৌশলী (৯ জন), উপ-সহকারী প্রকৌশলী (১৪ জন) ছাড়াও গবেষণা কর্মকর্তা, রাজস্ব কর্মকর্তা, কম্পিউটার অপারেটর, অফিস সহকারী-কাম-কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক, জুনিয়র হিসাব সহকারী, মিটার পরিদর্শক, অপারেটর ও নিরাপত্তা প্রহরীসহ বিভিন্ন পদ অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আবেদন গ্রহণ চলে ১২ ডিসেম্বর থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত। বয়সসীমা নির্ধারণ করা হয় ১৮ থেকে ৩২ বছর।

মন্ত্রণালয়ের ছাড়পত্র অনুযায়ী সাংগঠনিক কাঠামো ২০১৬ অনুসরণ করে এই নিয়োগ প্রক্রিয়া চালানো হচ্ছে বলে জানানো হলেও বাস্তবে রয়েছে ভিন্ন চিত্র। সহকারী প্রকৌশলী ও উপ-সহকারী প্রকৌশলী পদের বিপরীতে হাইকোর্টে রিট মামলা বিচারাধীন থাকা সত্ত্বেও ওয়াসা সেই বিষয়টি উপেক্ষা করেই নিয়োগ পরীক্ষার সিদ্ধান্ত নেয়।
২০২২ সালের ২৬ এপ্রিল একই দুই পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে ওয়াসা। সে সময় শূন্য পদের সংখ্যা উল্লেখ করা হয়নি। ২০২৩ সালের ১২ মে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সহকারী প্রকৌশলী পদে ৩৭ জন প্রার্থী উত্তীর্ণ হন। ২৯ নভেম্বর ফল প্রকাশের পর ১৮ ডিসেম্বর মৌখিক পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা করা হয়।
কিন্তু হঠাৎ করেই সেই প্রক্রিয়া থেমে যায়। মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হয়নি, কোনো ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়নি। উপ-সহকারী প্রকৌশলী পদের পরীক্ষার ফলাফলও আজ পর্যন্ত প্রকাশ পায়নি। অভিযোগ রয়েছে, লিখিত পরীক্ষায় কর্তৃপক্ষের পছন্দের প্রার্থীরা উত্তীর্ণ না হওয়ায় ইচ্ছাকৃতভাবে পুরো প্রক্রিয়া স্থগিত রাখা হয়। অথচ এই পরীক্ষার আয়োজনেই ওয়াসার ব্যয় হয়েছিল প্রায় ২২ লাখ টাকা।
পুরোনো নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ না করেই গত ডিসেম্বর মাসে আবারও একই পদে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। পুনরায় পরীক্ষা আয়োজনের দায়িত্ব দেওয়া হয় চুয়েটকে। এবার পরীক্ষার খরচ বেড়ে দাঁড়ায় ৬৫ লাখ ৮৫ হাজার ৬০০ টাকা।যা আগের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি।
২১ জানুয়ারি চুয়েটের অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. শেখ মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির স্বাক্ষরিত চিঠিতে ওয়াসার উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক শারমিন আলমকে জানানো হয়, ৯ হাজার ৪০৮ জন প্রার্থীর পরীক্ষা আয়োজনের জন্য এই অর্থের ৮০ শতাংশ অগ্রিম এবং বাকি ২০ শতাংশ ফল হস্তান্তরের সাত দিনের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে।

আগামী ৩১ জানুয়ারি শনিবার চুয়েট ক্যাম্পাসে এই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। সকাল ১০টা থেকে ১১টা পর্যন্ত উপ-সহকারী প্রকৌশলী এবং দুপুর ২টা থেকে ৩টা পর্যন্ত সহকারী প্রকৌশলী পদের পরীক্ষা নেওয়া হবে। যদিও পুরোনো ৩৭ জন উত্তীর্ণ প্রার্থীকে নতুন করে আবেদন করতে হয়নি।তবু তাদের বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।
নির্বাচনের ঠিক আগে পরীক্ষার আয়োজন নিয়েও রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। ২৬ জানুয়ারি অফিস সময় শেষ হওয়ার পর টেলিটকের মাধ্যমে পরীক্ষার্থীদের এসএমএস পাঠানো হয়। মাত্র পাঁচ দিনের নোটিশে পরীক্ষা নেওয়াকে অস্বাভাবিক বলছেন অনেকে। দুটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি থাকলেও শুধু প্রকৌশলী পদে নির্বাচন-পূর্ব সময়ে পরীক্ষা নেওয়ায় সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়েছে।
চট্টগ্রাম ওয়াসার একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, নির্বাচনের আগে এত বড় নিয়োগের প্রয়োজনীয়তা কী? এতে প্রতিষ্ঠানের ব্যয় বাড়বে, কিন্তু সেবার মান বাড়ার কোনো নিশ্চয়তা নেই। বরং কিছু লোকের পকেট ভারী হওয়ার আশঙ্কাই বেশি।
আরেক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, ২০২৫ সালের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে সাংগঠনিক কাঠামো ২০১৬ অনুসরণ করা হলেও ২০২২ সালে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে ২০২০ সালের কাঠামো অনুযায়ী। এতে স্পষ্ট হয়, প্রয়োজনে নিয়ম বদলে প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে। উচ্চ আদালতের রায় পেয়েও অনেক কর্মকর্তা নিয়োগ ও পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

সূত্রগুলো দাবি করেছে, ওয়াসায় নিয়োগ ও পদোন্নতিতে রাজনৈতিক প্রভাব ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ নতুন নয়। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের নামেও অতীতে বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। এবারের প্রক্রিয়াতেও সেই শঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। উপরন্তু নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট কর্মবিবরণী বা দায়িত্ব বণ্টনের নির্দেশনা না থাকায় ভবিষ্যতে সেবাব্যবস্থায় আরও অচলাবস্থা তৈরির আশঙ্কা রয়েছে।
চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মনোয়ারা বেগম বলেন, আগে পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের এবার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। আগের বিজ্ঞপ্তিতে মন্ত্রণালয়ের ছাড়পত্র ও শূন্য পদের স্পষ্ট উল্লেখ ছিল না। তাই সেই প্রক্রিয়া সঠিকভাবে সম্পন্ন হয়নি। এখন বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শূন্য পদের বিপরীতে সঠিক নিয়মে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, কোনো স্থগিতাদেশ নেই। টাকা-পয়সার লেনদেনের অভিযোগও ভিত্তিহীন। পরীক্ষা ওয়াসা নয়, চুয়েট নিচ্ছে। কারো কাছে প্রমাণ থাকলে সেটা দেখাতে হবে।
রাজস্ব খাতে প্রকৌশলী নিয়োগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী শূন্য পদের বিপরীতেই নিয়োগ দেওয়া হবে এবং পুরো প্রক্রিয়া স্বচ্ছ থাকবে।

- Advertisement -spot_img
  • সর্বশেষ
  • পঠিত