দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম, প্রত্যাশা ও স্বপ্নের মধ্য দিয়ে দেশে একটি নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সূচনা হয়েছে। জনগণের প্রত্যাশা—নতুন সরকার শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি ক্ষেত্রে বৈষম্যহীনতা, ন্যায়বিচার, জবাবদিহি ও সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে। সেই প্রত্যাশার জায়গা থেকেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের গত ছয় মাসের শিক্ষা খাতের বিভিন্ন উদ্যোগকে আমরা সাধুবাদ, শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাই।
বিশেষ করে শিক্ষাকে কর্মমুখী, প্রযুক্তিনির্ভর ও শিল্প-সংযুক্ত করার উদ্যোগ, বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপ ও শিক্ষানবিশ কর্মসূচি, এআই, সাইবার নিরাপত্তা, প্রোগ্রামিং, যোগাযোগ দক্ষতা ও আর্থিক স্বাক্ষরতার ওপর গুরুত্বারোপ নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী। শিক্ষাখাতে বরাদ্দ ৫৬ দশমিক ৬ শতাংশ বাড়িয়ে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা করা এবং শিক্ষায় বরাদ্দ জিডিপির ২ শতাংশে উন্নীত করার উদ্যোগও প্রশংসার দাবি রাখে। একই সঙ্গে ডিজিটাল শিক্ষা, বিদ্যালয়ে ইন্টারনেট, ফ্রি ওয়াই-ফাই, শিক্ষকদের ট্যাব, ডিজিটাল ক্লাসরুম, বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস ও ব্যাগ, উপবৃত্তি, নতুন পাঠ্যবই, বিদেশি ভাষা শিক্ষা, বিদ্যালয়ে বৃক্ষরোপণ এবং খেলাধুলাকে বাধ্যতামূলক করার প্রস্তুতি এসব উদ্যোগ শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকায়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৬৫ হাজার ৫৬৯টি প্রতিষ্ঠানে ইন্টারনেট সুবিধা নিশ্চিত করার উদ্যোগের জন্যও সরকারকে ধন্যবাদ জানাই। কিন্তু এখানেই একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে দেশের বিপুলসংখ্যক বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বিশেষ করে কিন্ডারগার্টেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা কি নতুন বাংলাদেশের শিক্ষা-ভাবনায় সমানভাবে অন্তর্ভুক্ত হবে?
দেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশাপাশি প্রায় ৪২ হাজার বেসরকারি প্রাথমিক ও কিন্ডারগার্টেন প্রতিষ্ঠান রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট মহলে যে তথ্য প্রচলিত, সেসব প্রতিষ্ঠানে লাখ লাখ শিশু পড়াশোনা করছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারের বিকল্প নয়; বরং প্রাথমিক শিক্ষার বিশাল জনগোষ্ঠীর শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রকে দীর্ঘদিন ধরে সহযোগিতা করে আসছে। হাজার হাজার শিক্ষা উদ্যোক্তা নিজেদের স্বার্থের জন্য নয়, বরং স্থানীয় পর্যায়ে শিশুদের শিক্ষা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যেই এসব প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন।
একটি বিষয় খুব সহজভাবে ভাবা দরকার। যদি দেশের বেসরকারি কিন্ডারগার্টেন ও অন্যান্য বেসরকারি প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না থাকত, তাহলে এসব শিশুকে পড়ানোর জন্য রাষ্ট্রকে আরও কতগুলো বিদ্যালয় নির্মাণ করতে হতো, কত হাজার শিক্ষক নিয়োগ দিতে হতো এবং তার জন্য কত বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হতো? এই প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের অর্থ ও অবকাঠামো বিনিয়োগ করে রাষ্ট্রের প্রাথমিক শিক্ষার দায়িত্বকে বাস্তবে সহায়তা করছে। তাই তাদেরকে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, শিক্ষাব্যবস্থার অংশীদার হিসেবে দেখা প্রয়োজন।
‘সবার আগে বাংলাদেশ’ এই দর্শনের বাস্তব প্রতিফলন তখনই ঘটবে, যখন শিশুর পরিচয় হবে শুধু ‘শিক্ষার্থী’; সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী হিসেবে তার অধিকার ভিন্ন হবে না।
প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। ‘প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা নীতিমালা ২০২৬’-এ সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য ৮০:২০ অনুপাতে বৃত্তির কোটা নির্ধারণের বিষয়টি ইতোমধ্যে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য ৮০ শতাংশ এবং বেসরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য ২০ শতাংশ বৃত্তি নির্ধারণের ব্যবস্থা মেধাভিত্তিক প্রতিযোগিতার ধারণার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ—এ প্রশ্নের উত্তর সরকারকেই দিতে হবে।
এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার মোহাম্মদ হুমায়ন কবির (পল্লব) ও ব্যারিস্টার মোহাম্মদ কাওছার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আইনি নোটিশ পাঠিয়েছেন বলে জানা গেছে। নোটিশে সরকারি-বেসরকারি শিক্ষার্থীদের জন্য পৃথক কোটা ও পৃথক প্রতিযোগিতার বিধানকে বৈষম্যমূলক হিসেবে উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট ধারাগুলো পুনর্বিবেচনা এবং সব শিক্ষার্থীর জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে।
এখানে সরকারের প্রতি আমাদের বিনীত আহ্বান বিষয়টিকে কেবল সরকারি বনাম বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিতর্ক হিসেবে না দেখে শিশুর মেধা, অধিকার ও ভবিষ্যৎ হিসেবে বিবেচনা করা হোক। বৃত্তি যদি মেধার স্বীকৃতি হয়, তাহলে প্রতিযোগিতার মূল ভিত্তি হওয়া উচিত মেধা, দক্ষতা ও ফলাফল। প্রতিষ্ঠানের মালিকানা বা ধরন যেন কোনো শিশুর সম্ভাবনার পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়।
আমরা বিশ্বাস করি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী চাইলে এ বিষয়ে একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। সরকারি ও বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি, বৃত্তি পরীক্ষায় বৈষম্যমূলক কোটা পুনর্বিবেচনা এবং মেধাভিত্তিক অভিন্ন প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা নতুন বাংলাদেশের শিক্ষা ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বেসরকারি প্রাথমিক ও কিন্ডারগার্টেন প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন প্রক্রিয়া। নিবন্ধন সহজ, স্বচ্ছ ও বাস্তবসম্মত হলে প্রতিষ্ঠানগুলো আরও বেশি শৃঙ্খলার মধ্যে আসবে। সরকারও জানতে পারবে দেশে কতগুলো প্রতিষ্ঠান প্রাথমিক শিক্ষায় অবদান রাখছে, কত শিক্ষার্থী সেখানে পড়ছে এবং এসব প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত চাহিদা কী।
দুঃখজনকভাবে, কখনো কখনো প্রশাসনিক জটিলতা, অতিরিক্ত কাগজপত্র কিংবা বিভিন্ন ব্যাখ্যার কারণে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো কাঙ্ক্ষিত সেবা ও সহযোগিতা থেকে দূরে থাকে। সরকার যদি নিবন্ধন প্রক্রিয়াকে সহজ করে, নিয়মিত তদারকি ও মাননিয়ন্ত্রণের আওতায় নিয়ে আসে এবং প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও সুযোগ-সুবিধার সঙ্গে যুক্ত করে, তাহলে এর সুফল পাবে সরকার, প্রতিষ্ঠান এবং সর্বোপরি শিক্ষার্থীরা।
বেসরকারি শিক্ষা উদ্যোক্তাদের দাবিও খুব সাধারণ। তারা সরকারি বেতন-ভাতা চান না; বরং তাদের প্রধান প্রত্যাশা- তাদের প্রতিষ্ঠানে পড়া শিশুরা যেন রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা থেকে অযৌক্তিকভাবে বঞ্চিত না হয়। সরকারি বইয়ের পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী ডিজিটাল শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, বৃত্তি, ক্রীড়া, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম ও অন্যান্য শিক্ষাসেবায় তাদের শিক্ষার্থীদের সমান সুযোগ নিশ্চিত করা হোক।
এই দাবির পক্ষে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছে বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টেন অ্যাসোসিয়েশন (গভঃ রেজিঃ নং-এস-১০২৮/৯৮)। সংগঠনের মহাসচিব জনাব মো. মিজানুর রহমান সরকার দীর্ঘদিন ধরে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে বেসরকারি প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা ও অবদান তুলে ধরে আসছেন। একইভাবে চট্টগ্রাম অঞ্চলেও বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টেন এসোসিয়েশনের পক্ষে সভাপতি হিসেবে আমরা সরকারের কাছে শিশুদের অধিকার ও শিক্ষায় বৈষম্য দূর করার বিষয়টি তুলে ধরার চেষ্টা করছি।
আমাদের বক্তব্য পরিষ্কার—বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিপক্ষ হিসেবে নয়, রাষ্ট্রের শিক্ষা-সহযোগী হিসেবে বিবেচনা করা হোক।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে গত ছয় মাসে শিক্ষা খাতে যে অগ্রাধিকার, বরাদ্দ বৃদ্ধি ও আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তার জন্য সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। একই সঙ্গে অনুরোধ থাকবে—এই অগ্রযাত্রার পরবর্তী ধাপে সরকারি ও বেসরকারি প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের মধ্যকার বৈষম্য দূর করার বিষয়টি বিশেষ অগ্রাধিকার পাক।
একজন শিশুর বাবা-মা তাকে সরকারি বিদ্যালয়ে পড়াবেন, নাকি কিন্ডারগার্টেনে—এটি তার পরিবারের পছন্দ ও বাস্তবতার বিষয়। কিন্তু বিদ্যালয়ের ধরন যেন শিশুটির নাগরিক অধিকার, মেধার মূল্যায়ন ও রাষ্ট্রীয় সুযোগ পাওয়ার ক্ষেত্রে বৈষম্যের কারণ না হয়।
নতুন বাংলাদেশে আমরা এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা চাই, যেখানে সরকারি বিদ্যালয়ের শিশু ও বেসরকারি বিদ্যালয়ের শিশু একই স্বপ্ন দেখবে, একই সুযোগ পাবে এবং মেধার ভিত্তিতে একই প্রতিযোগিতায় অংশ নেবে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বহুল উচ্চারিত ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ দর্শনের সবচেয়ে সুন্দর প্রয়োগ হতে পারে আমাদের কোমলমতি শিশুদের ক্ষেত্রে। প্রাথমিক শিক্ষা যদি জাতির ভিত্তি হয়, তাহলে সেই ভিত্তিতে কোনো বৈষম্য থাকা উচিত নয়।
তাই প্রধানমন্ত্রী ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতি আমাদের প্রত্যাশা—প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষার ৮০:২০ কোটা পুনর্বিবেচনা করে মেধাভিত্তিক অভিন্ন ব্যবস্থা চালু করা, সরকারি-বেসরকারি শিক্ষার্থীদের সুযোগের বৈষম্য দূর করা এবং কিন্ডারগার্টেনসহ বেসরকারি প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন প্রক্রিয়া আরও সহজ, স্বচ্ছ ও জনবান্ধব করা।
সরকারের গত ছয় মাসের অর্জনকে আমরা সাধুবাদ জানাই। এখন সময় এসেছে সেই অর্জনের সঙ্গে ‘বৈষম্যহীন শিক্ষা’কে যুক্ত করার।
কারণ নতুন বাংলাদেশে কোনো শিশুই যেন বলতে না পারে—“আমি বেসরকারি বিদ্যালয়ে পড়ি বলে আমার সুযোগ কম।” বরং প্রতিটি শিশু আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলুক—“আমি বাংলাদেশের শিশু, আমার স্বপ্ন দেখার অধিকার সমান, আমার মেধার মূল্যও সমান।” এটাই হোক ‘সবার আগে বাংলাদেশ’-এর শিক্ষাক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অঙ্গীকার।
লেখক: সভাপতি- বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টেন এসোসিয়েশন চট্টগ্রাম অঞ্চল ও যুগ্ম আহবায়ক- ৯০ দশক ছাত্রদল রাউজান উপজেলা।

