আজ ৫ অক্টোবর, বিশ্ব শিক্ষক দিবস। শিক্ষা যদি জাতির মেরুদণ্ড হয়, তবে সেই মেরুদণ্ডকে দৃঢ়, সুদৃঢ় ও কার্যকর করে গড়ে তোলার প্রধান কারিগর শিক্ষক। তাই বিশ্বজুড়ে শিক্ষকদের অবদান, ত্যাগ, নিষ্ঠা ও পেশাগত মর্যাদার স্বীকৃতি হিসেবে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। বিশ্বের শতাধিক দেশে আজকের দিনটি শিক্ষক সমাজের প্রতি শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা ও সম্মান জানানোর বিশেষ দিন।
১৯৯৪ সালে ইউনেস্কো ৫ অক্টোবরকে বিশ্ব শিক্ষক দিবস হিসেবে ঘোষণা করে এবং ১৯৯৫ সাল থেকে দিবসটি আনুষ্ঠানিকভাবে পালিত হয়ে আসছে। এর মূল লক্ষ্য শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নে শিক্ষকদের অসামান্য অবদানের যথাযথ স্বীকৃতি এবং তাঁদের পেশাগত অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করা।
শিক্ষককে সম্মান জানানোর এই সংস্কৃতির ঐতিহাসিক প্রেরণার অন্যতম উদাহরণ ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি ও প্রখ্যাত দার্শনিক-শিক্ষাবিদ ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ। ১৯৬২ সালে তাঁর জন্মদিন পালনের উদ্যোগ নেওয়া হলে তিনি নিজের জন্মদিন উদযাপনের পরিবর্তে দিনটি দেশের শিক্ষকদের সম্মানে উৎসর্গ করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তাঁর সেই মহান ভাবনা আজও শিক্ষক সমাজের মর্যাদার প্রতীক হয়ে আছে।
বাংলাদেশেও শিক্ষক দিবস ঘিরে রয়েছে একটি স্বতন্ত্র প্রেক্ষাপট। ২০০৩ সালের ১৯ জানুয়ারি তৎকালীন বিএনপি সরকার শিক্ষক সমাজকে যথাযথ মর্যাদা দেওয়ার অঙ্গীকারের অংশ হিসেবে জাতীয় শিক্ষক দিবসের সূচনা করে। পরবর্তী সময়ে বিশ্ব শিক্ষক দিবসও দেশে গুরুত্বের সঙ্গে পালিত হয়ে আসছে।
শ্রদ্ধার বিপরীতে বাস্তবতার কঠিন চিত্র
শিক্ষক দিবসের আদর্শিক আবহ যতটা গৌরবের, বাংলাদেশের শিক্ষক সমাজের বাস্তবতা অনেক ক্ষেত্রেই ততটাই বেদনাদায়ক। যে শিক্ষক শিক্ষার্থীর হাতে জ্ঞানের আলো তুলে দেন, নৈতিকতা ও মানবিকতার শিক্ষা দেন, জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণে নিজেকে নিয়োজিত রাখেন সেই শিক্ষকই অনেক সময় সমাজে অবহেলা, অপমান ও অনিশ্চয়তার শিকার হন।
বিগত সময়ে শিক্ষক লাঞ্ছনা ও অপদস্থ হওয়ার বিভিন্ন ঘটনা শিক্ষক সমাজের মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। শুধু সামাজিক মর্যাদার প্রশ্ন নয়, দীর্ঘদিনের আর্থিক অনিশ্চয়তা, সীমিত সুযোগ-সুবিধা, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং পেশাগত নিরাপত্তাহীনতাও শিক্ষকদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলেছে।
প্রশ্ন হচ্ছে যে রাষ্ট্র শিক্ষাকে উন্নয়নের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করে, সেই রাষ্ট্রে শিক্ষকের জীবন কেন অনিশ্চয়তায় থাকবে? যে শিক্ষক ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আত্মমর্যাদা ও দায়িত্ববোধের শিক্ষা দেবেন, তিনি নিজেই যদি মর্যাদা ও নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, তাহলে জাতির কাঙ্ক্ষিত মানবিক ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ কীভাবে গড়ে উঠবে?

আশার নতুন সূর্যোদয়ঃ তবে এই বাস্তবতার মধ্যেও বিশ্ব শিক্ষক দিবসে শিক্ষক সমাজের সামনে আশার নতুন বার্তা এসেছে। দেশনায়ক তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত নতুন সরকারের পক্ষ থেকে ১০০ জন গুণী ও অবহেলিত শিক্ষককে বিশেষ রাষ্ট্রীয় সম্মাননায় ভূষিত করার সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে একটি তাৎপর্যপূর্ণ উদ্যোগ।
এই সম্মাননা কেবল ১০০ জন শিক্ষকের স্বীকৃতি নয়: বরং এটি সমগ্র শিক্ষক সমাজের প্রতি রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। একজন শিক্ষক তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়টি জাতির সন্তানদের মানুষ করার কাজে ব্যয় করেন। তাঁদের অবদানকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে স্বীকৃতি দেওয়া হলে তা অন্য শিক্ষকদেরও অনুপ্রাণিত করবে এবং শিক্ষকতা পেশার সামাজিক মর্যাদা আরও সুদৃঢ় করবে।
এর পাশাপাশি শিক্ষায় সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দের ঘোষণা এবং শিক্ষাবান্ধব নেতৃত্বের প্রত্যাশা শিক্ষক সমাজের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। কারণ শিক্ষায় বিনিয়োগকে ব্যয় হিসেবে নয়, জাতির ভবিষ্যতের ওপর বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি।
শিক্ষকের মর্যাদা রক্ষায় চাই কার্যকর রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার: বিশ্ব শিক্ষক দিবসে তাই শিক্ষক সমাজের প্রত্যাশাও স্পষ্ট। প্রথমত, শিক্ষকের অসম্মানের বিরুদ্ধে শূন্য সহিষ্ণুতা নীতি কার্যকর করতে হবে। কোনো শিক্ষক যেন সামাজিক, রাজনৈতিক কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক কোনো কারণে লাঞ্ছনা বা অপমানের শিকার না হন রাষ্ট্রকে তা নিশ্চিত করতে হবে।
শিক্ষকের ওপর হামলা বা লাঞ্ছনা শুধু একজন ব্যক্তির ওপর আঘাত নয়; এটি শিক্ষা, জ্ঞান ও জাতির ভবিষ্যতের ওপর আঘাত। তাই শিক্ষক নিগ্রহের ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি শিক্ষকদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
দ্বিতীয়ত, প্রয়োজন শিক্ষকদের আর্থিক মুক্তি ও সামাজিক নিরাপত্তা। শুধু সম্মাননা দিয়ে একজন শিক্ষকের জীবনযাত্রার সংকট দূর করা সম্ভব নয়। শিক্ষকদের জন্য যুগোপযোগী ও সম্মানজনক বেতন কাঠামো, সামাজিক নিরাপত্তা, অবসরকালীন নিশ্চয়তা এবং পেশাগত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে বেসরকারি ও কিন্ডারগার্টেন শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের আর্থিক অনিশ্চয়তার অবসানেও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
ফুল নয়, চাই মর্যাদার নিশ্চয়তাঃ বিশ্ব শিক্ষক দিবস কেবল ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানানোর আনুষ্ঠানিক দিন নয়; এটি রাষ্ট্র ও সমাজকে আত্মজিজ্ঞাসার সুযোগ করে দেয়। আমরা কেমন শিক্ষক চাই, কেমন শিক্ষা চাই এবং কেমন বাংলাদেশ গড়তে চাই— এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে সবার আগে শিক্ষকের মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে।
নিরক্ষরতা, কুসংস্কার, অজ্ঞতা ও অন্ধকার দূর করে জ্ঞানভিত্তিক, মানবিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার প্রধান কারিগর শিক্ষকরা। তাই তাঁদের অবহেলা করে জাতির উন্নয়ন সম্ভব নয়।
আমরা বিশ্বাস করতে চাই, দেশনায়ক তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন বাংলাদেশে শিক্ষক সমাজ তাদের হারানো গৌরব ফিরে পাবে। রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, সামাজিক মর্যাদা, নিরাপত্তা ও আর্থিক স্বচ্ছলতার সমন্বয়ে শিক্ষকতা পেশা আবারও তরুণ প্রজন্মের কাছে একটি মর্যাদাপূর্ণ ও আকর্ষণীয় পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।
কারণ শিক্ষককে মর্যাদা দেওয়া মানে জ্ঞানকে মর্যাদা দেওয়া; শিক্ষককে নিরাপদ রাখা মানে জাতির ভবিষ্যৎকে নিরাপদ রাখা। শিক্ষক বাঁচলে শিক্ষা বাঁচবে, আর শিক্ষা বাঁচলেই সমৃদ্ধ হবে বাংলাদেশ।
লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টেন এসোসিয়েশন, চট্টগ্রাম অঞ্চল।

