বুধবার, সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২৬

সবার আগে বাংলাদেশ—শিক্ষায় সরকারি-বেসরকারি বৈষম্য দূর করাই হোক নতুন বাংলাদেশের অঙ্গীকার

কাজী সরোয়ার খান মনজু

চেরাগি নিউজ ডেস্ক

আমি বাংলাদেশের শিশু। আমার স্বপ্ন দেখার অধিকার সমান, আমার মেধার মূল্যও সমান।
এটাই হোক ‘সবার আগে বাংলাদেশ’-এর শিক্ষাক্ষেত্রের অঙ্গীকার।
দেশের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সুযোগের বৈষম্য নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে চলতি বছরের প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় কিন্ডারগার্টেনসহ বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কয়েক লাখ শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ অনিশ্চিত হয়ে পড়ার বিষয়টি গভীরভাবে ভাবার দাবি রাখে।

প্রাথমিক শিক্ষা একটি শিশুর জীবনের ভিত্তি। এই পর্যায়ে একজন শিক্ষার্থীর বিদ্যালয় সরকারি না বেসরকারি—তা তার মেধা, স্বপ্ন কিংবা সম্ভাবনার মাপকাঠি হতে পারে না। অথচ বিদ্যালয়ের নিবন্ধনসংক্রান্ত প্রশাসনিক জটিলতার কারণে যদি কোনো শিক্ষার্থী বৃত্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়, তাহলে বিষয়টি নিছক একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর প্রভাব পড়ে একটি শিশুর ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার ওপর।
সম্প্রতি প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের (ডিপিই) জারিকৃত এক নির্দেশনাকে কেন্দ্র করে এ উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। নির্দেশনায় বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠদানের অনুমতি, নিবন্ধন ও নিবন্ধন নবায়নসংক্রান্ত পেন্ডিং আবেদন নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তির কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা নীতিমালার সংশ্লিষ্ট শর্ত অনুযায়ী বিদ্যালয়ের পাঠদানের অনুমতি বা নিবন্ধন থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ে নিবন্ধন না থাকলে বৃত্তি পরীক্ষার ডেসক্রিপটিভ রোল (ডিআর) জমা না নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
এখানেই মূল প্রশ্ন—একটি বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক নিবন্ধন প্রক্রিয়ার দায় কেন একজন শিক্ষার্থীর মেধা যাচাইয়ের সুযোগকে প্রভাবিত করবে?
একটি বিদ্যালয়ের নিবন্ধন নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিষ্ঠানকে নিয়ম-শৃঙ্খলা, অবকাঠামো, শিক্ষার মান ও প্রশাসনিক কাঠামোর আওতায় আনতে নিবন্ধন প্রয়োজন। কিন্তু নিবন্ধন একটি প্রাতিষ্ঠানিক বিষয়; অন্যদিকে বৃত্তি পরীক্ষা শিক্ষার্থীর মেধা, পরিশ্রম ও যোগ্যতা যাচাইয়ের বিষয়। দুটি বিষয়কে একসূত্রে বেঁধে দিলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে শিক্ষার্থীর।
বাস্তবতা হলো, একটি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন সম্পন্ন করার জন্য উপজেলা থেকে জেলা ও বিভাগীয় পর্যায় পর্যন্ত বিভিন্ন প্রশাসনিক ধাপ অতিক্রম করতে হয়। জমির কাগজপত্র, অবকাঠামো, পরিদর্শন, প্রয়োজনীয় নথিপত্র যাচাইসহ নানা প্রক্রিয়া রয়েছে। এর সঙ্গে যদি সফটওয়্যার জটিলতা, সার্ভার সমস্যা কিংবা জনবলসংকট যুক্ত হয়, তাহলে নির্ধারিত স্বল্প সময়ে সব প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন সম্পন্ন করা অনেক ক্ষেত্রেই কঠিন হয়ে পড়ে।
ফলে কোনো প্রতিষ্ঠানের আবেদন প্রশাসনিক কারণে পেন্ডিং থাকলে তার দায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের হতে পারে; কিন্তু সেই কারণে ওই প্রতিষ্ঠানের পঞ্চম শ্রেণির একজন শিক্ষার্থী কেন বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ হারাবে এ প্রশ্নের যৌক্তিক উত্তর প্রয়োজন।
শিক্ষার্থীর পরিচয় আগে, বিদ্যালয়ের পরিচয় পরে:
আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি শিশুর প্রথম পরিচয় সে বাংলাদেশের নাগরিক ও শিক্ষার্থী। সে সরকারি বিদ্যালয়ে পড়ে, নাকি কিন্ডারগার্টেনে পড়ে এটি তার পরিবারের পছন্দ, প্রয়োজন ও বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কিত। বিদ্যালয়ের ধরন তার মেধা বা রাষ্ট্রীয় সুযোগ পাওয়ার অধিকার নির্ধারণ করতে পারে না।
বাংলাদেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক বেসরকারি প্রাথমিক ও কিন্ডারগার্টেন প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে প্রাথমিক শিক্ষার চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। এসব প্রতিষ্ঠানে লাখ লাখ শিশু পড়াশোনা করছে। শিক্ষা উদ্যোক্তারা নিজেদের অর্থে অবকাঠামো তৈরি করে, শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে এবং নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও শিশুদের শিক্ষার সুযোগ করে দিচ্ছেন।
এই বাস্তবতায় বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং প্রাথমিক শিক্ষার বৃহৎ জনগোষ্ঠীর শিক্ষা নিশ্চিত করতে তারা রাষ্ট্রের শিক্ষা-সহযোগী।
একটু ভেবে দেখলেই বিষয়টি স্পষ্ট হয় দেশের সব বেসরকারি প্রাথমিক ও কিন্ডারগার্টেন প্রতিষ্ঠান যদি না থাকত, তাহলে তাদের শিক্ষার্থীদের জন্য রাষ্ট্রকে অতিরিক্ত কত বিদ্যালয় নির্মাণ করতে হতো, কত শিক্ষক নিয়োগ দিতে হতো এবং কত বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হতো? সুতরাং এসব প্রতিষ্ঠানকে নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও স্বীকৃতির আওতায় আনাও রাষ্ট্রের দায়িত্বের অংশ।
বৃত্তি হোক মেধার, প্রতিষ্ঠানের নয়:
প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা শিক্ষার্থীদের মেধা ও পরিশ্রমের স্বীকৃতি দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন। সেখানে একজন শিক্ষার্থী সরকারি না বেসরকারি বিদ্যালয়ে পড়ে তার চেয়ে তার মেধা ও ফলাফলই প্রধান বিবেচ্য হওয়া উচিত।
প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা নীতিমালায় সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য ৮০:২০ অনুপাতে বৃত্তির কোটা নির্ধারণের বিষয়টিও ইতোমধ্যে আলোচনা ও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সরকারি বিদ্যালয়ের জন্য ৮০ শতাংশ এবং বেসরকারি বিদ্যালয়ের জন্য ২০ শতাংশ বৃত্তির ব্যবস্থা মেধাভিত্তিক প্রতিযোগিতার ধারণার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ—এটি নীতিনির্ধারকদের গভীরভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আইনি উদ্যোগের কথাও জানা গেছে। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার মোহাম্মদ হুমায়ন কবির (পল্লব) ও ব্যারিস্টার মোহাম্মদ কাওছার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আইনি নোটিশ পাঠিয়েছেন বলে জানা গেছে। সেখানে সরকারি-বেসরকারি শিক্ষার্থীদের জন্য পৃথক কোটা ও প্রতিযোগিতার বিধান পুনর্বিবেচনা করে সমান সুযোগ নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে।
এখানে বিষয়টি সরকারি বনাম বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই। বিষয়টি একজন শিশুর অধিকার ও ভবিষ্যতের প্রশ্ন হিসেবে দেখা জরুরি।
নিবন্ধন হোক সহজ, স্বচ্ছ ও বাস্তবসম্মত:
বেসরকারি প্রাথমিক ও কিন্ডারগার্টেন প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন প্রক্রিয়া অবশ্যই নিয়মের মধ্যে থাকতে হবে। তবে সেই নিয়ম হতে হবে বাস্তবসম্মত, স্বচ্ছ, সহজবোধ্য ও সময়োপযোগী।
নিবন্ধন প্রক্রিয়া সহজ ও কার্যকর হলে সরকারও জানতে পারবে দেশে প্রকৃতপক্ষে কতগুলো প্রতিষ্ঠান রয়েছে, কত শিক্ষার্থী সেখানে পড়াশোনা করছে এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর মান ও প্রয়োজনীয়তা কী। একই সঙ্গে নিয়মিত তদারকি, মাননিয়ন্ত্রণ, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় শিক্ষাসেবার আওতায় এসব প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে আসা সম্ভব হবে।
কিন্তু কোনো প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে বিলম্ব হলে তার শাস্তি যেন শিক্ষার্থীকে বহন করতে না হয়। একটি প্রতিষ্ঠানের কাগজপত্রের জটিলতা আর একটি শিশুর মেধা যাচাইয়ের সুযোগ দুটিকে পৃথকভাবে বিবেচনা করাই অধিক যুক্তিসংগত।
‘সবার আগে বাংলাদেশ’—শিশুর ক্ষেত্রেই হোক এর বাস্তব প্রয়োগ:
দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম ও প্রত্যাশার মধ্য দিয়ে দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় পরিবর্তন এসেছে। নতুন বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশা—রাষ্ট্রের প্রতিটি ক্ষেত্রে বৈষম্যহীনতা, ন্যায়বিচার, জবাবদিহি ও সমঅধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে।
শিক্ষা খাতে আধুনিকায়ন, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, ডিজিটাল সুবিধা সম্প্রসারণ, শিক্ষার্থীদের সহায়তা, শিক্ষকদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি, ক্রীড়া ও অন্যান্য সহশিক্ষা কার্যক্রমকে গুরুত্ব দেওয়ার মতো উদ্যোগগুলো নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই অগ্রযাত্রা তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন এর সুফল সরকারি-বেসরকারি নির্বিশেষে প্রতিটি শিশুর কাছে সমানভাবে পৌঁছাবে।
‘সবার আগে বাংলাদেশ’ যদি রাষ্ট্রীয় দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার হয়, তাহলে তার সবচেয়ে মানবিক প্রয়োগ হতে পারে শিশুদের ক্ষেত্রে।
একজন শিশুর বাবা-মা তাকে সরকারি বিদ্যালয়ে পড়াবেন, নাকি কিন্ডারগার্টেনে এটি পরিবারের সিদ্ধান্ত। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের কারণে শিশুটির নাগরিক অধিকার, মেধার মূল্যায়ন কিংবা রাষ্ট্রীয় সুযোগ পাওয়ার ক্ষেত্রে বৈষম্য তৈরি হওয়া উচিত নয়।
এখন প্রয়োজন একটি মানবিক সিদ্ধান্ত:
বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টেন অ্যাসোসিয়েশন দীর্ঘদিন ধরে বেসরকারি প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে কাজ করে আসছে। সংগঠনের মহাসচিব মো. মিজানুর রহমান সরকারও দীর্ঘদিন ধরে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে বেসরকারি প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা ও অবদানের বিষয়টি তুলে ধরছেন। চট্টগ্রাম অঞ্চলেও সংগঠনের সভাপতি হিসেবে আমরা শিশুদের অধিকার এবং শিক্ষায় বৈষম্য দূর করার বিষয়টি তুলে ধরার চেষ্টা করছি।
আমাদের বক্তব্য অত্যন্ত স্পষ্ট—বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে প্রতিপক্ষ নয়, রাষ্ট্রের শিক্ষা-সহযোগী হিসেবে বিবেচনা করা হোক।
চলতি বছরের বৃত্তি পরীক্ষায় কোনো শিক্ষার্থী যেন কেবল বিদ্যালয়ের নিবন্ধনসংক্রান্ত প্রশাসনিক জটিলতার কারণে অংশগ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হয়—এ বিষয়ে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন। প্রয়োজনে নিবন্ধনের সময়সীমা বাড়ানো, পেন্ডিং আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তি করা এবং বিশেষ ব্যবস্থায় যোগ্য শিক্ষার্থীদের ডিআর জমা দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।
একই সঙ্গে সরকারি-বেসরকারি শিক্ষার্থীদের বৃত্তির সুযোগ ও প্রতিযোগিতার কাঠামোও নতুন করে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। মেধার মূল্যায়নে বিদ্যালয়ের মালিকানা যেন কোনো শিশুর সম্ভাবনার পথে বাধা না হয়।
আমরা এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা চাই, যেখানে সরকারি বিদ্যালয়ের শিশু এবং কিন্ডারগার্টেনের শিশু একই স্বপ্ন দেখবে, সমান সুযোগ পাবে এবং মেধার ভিত্তিতে নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণের সুযোগ পাবে।
কারণ— “আমি বাংলাদেশের শিশু। আমার স্বপ্ন দেখার অধিকার সমান, আমার মেধার মূল্যও সমান।”
নতুন বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় এ বিশ্বাসই হোক আমাদের পথচলার মূলমন্ত্র।
সবার আগে বাংলাদেশ—আর বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ আমাদের শিশুরা। তাদের মেধা, স্বপ্ন ও ভবিষ্যতের ক্ষেত্রে কোনো বৈষম্য নয়; চাই সমান সুযোগ, সমান মর্যাদা ও ন্যায়সংগত প্রতিযোগিতা।

লেখক: কাজী সরোয়ার খান মনজু
সভাপতি, বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টেন এসোসিয়েশন, চট্টগ্রাম অঞ্চল।

- Advertisement -spot_img
  • সর্বশেষ
  • পঠিত