বুধবার, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২৬

গণতন্ত্রের সৌন্দর্য ধরে রাখতে ফ্যাসিবাদ, সন্ত্রাস ও নৈরাজ্য ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিহত করতে হবে: শামীম

নির্বাচনের আগে স্লোগান ছিল ‘সবার আগে বাংলাদেশ’, এখন হোক ‘সবার জন্য বাংলাদেশ’: পানিসম্পদ মন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক

দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের পর দেশে যে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, সেখানে প্রতিহিংসার পরিবর্তে দায়িত্বশীলতা, সংঘাতের পরিবর্তে শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জনগণের কল্যাণকে প্রাধান্য দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানি। তিনি বলেছেন, নির্বাচনের আগে স্লোগান ছিল ‘সবার আগে বাংলাদেশ’, এখন হোক ‘সবার জন্য বাংলাদেশ’। জনগণের অধিকার, মর্যাদা ও ন্যায্য সুযোগ নিশ্চিত করাই নতুন বাংলাদেশের রাজনীতির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।

বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) বিকেল ৩টায় চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির নসিমন ভবন কার্যালয় প্রাঙ্গণে চট্টগ্রাম মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলা বিএনপি এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সভায় সভাপতিত্ব করেন চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক এরশাদ উল্লাহ এমপি। সঞ্চালনা করেন মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব নাজিমুর রহমান।

কেন্দ্রীয় পরামর্শ ও নির্দেশনার আলোকে চট্টগ্রাম মহানগর, উত্তর জেলা ও দক্ষিণ জেলা বিএনপির সমন্বয়ে আয়োজিত এ সভায় দলের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, গণতান্ত্রিক পরিবেশ, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সাংগঠনিক কার্যক্রম নিয়ে বক্তব্য দেন।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানি বলেন, দীর্ঘ ১৭ বছরের রাজনৈতিক সংগ্রাম ছিল অত্যন্ত কঠিন ও প্রতিকূল। জুলুম-নির্যাতন, মামলা-হামলা, গুম ও হত্যার মতো নানা পরিস্থিতির মধ্যেও বিএনপির নেতাকর্মীরা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন থেকে সরে যাননি।

তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় পরামর্শ অনুযায়ী মহানগর, উত্তর জেলা ও দক্ষিণ জেলার সমন্বয়ের মাধ্যমে আজকের এই সভা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আমাদের ১৭ বছরের রাজনৈতিক জীবন মোটেও সহজ ছিল না। ফ্যাসিবাদী জুলুম-নির্যাতনের মধ্য দিয়েও আমরা রাজনীতি করে গেছি, লড়াই করেছি। আমাদের অনেক নেতাকর্মী গুম, খুন ও হত্যার শিকার হয়েছেন। মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে আমরা সবসময় একটি স্বাভাবিক জীবন এবং গণতন্ত্র ফিরে পাওয়ার জন্য প্রার্থনা করেছি। আজ আমরা সেই গণতন্ত্র ফিরে পেয়েছি।

এ্যানি বলেন, দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের পর দেশে যে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরে এসেছে, তা ধরে রাখতে হলে প্রতিহিংসা, সংঘাত ও উসকানির রাজনীতি পরিহার করে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে এগিয়ে যেতে হবে।

তিনি বলেন, দীর্ঘ ১৭ বছরে ফ্যাসিস্টরা আমাদের সঙ্গে যেভাবে মোকাবিলা করেছে, আমরা তাদের সঙ্গে সেভাবে মোকাবিলা করতে চাই না। আমাদের রাজনীতি প্রতিহিংসার রাজনীতি নয়। আমরা রাজনৈতিকভাবেই সব ধরনের ষড়যন্ত্র ও অপচেষ্টার মোকাবিলা করতে চাই।

দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির বিভিন্ন অপচেষ্টার অভিযোগ তুলে এ্যানি বলেন, সেই স্বৈরাচার এখন বড় বড় স্লোগান দিচ্ছে। গোপনে দেশে সন্ত্রাস কায়েমের চেষ্টা করছে, অরাজকতা সৃষ্টি করছে এবং দেশে একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির পাঁয়তারা করছে। আমরা তাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার। তাদের নতুন কোনো পরিকল্পনা সফল হতে দেওয়া হবে না।

তিনি বলেন, ১২ তারিখের নির্বাচন জনগণের দেওয়া ম্যান্ডেটেরই প্রতিফলন। জনগণের এই ম্যান্ডেটের ভিত্তিতে আজ আমরা দেশের গণতন্ত্র রক্ষা এবং দেশের মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছি।

দীর্ঘদিন নির্বাসিত থাকার পর ১৭ ফেব্রুয়ারি শপথ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে কাজ করে যাচ্ছেন উল্লেখ করে এ্যানি বলেন, জনগণের প্রত্যাশা পূরণ এবং দেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশ সুসংহত করতে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ৭১-এর পরাজিত শক্তিও দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে। যেখানে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে সরকারের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে দেশের মানুষের জন্য কাজ করার প্রয়োজন, সেখানে তারা আজ নানা ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে।

এর পরিপ্রেক্ষিতে এ্যানি বলেন, আমাদের দুটি অপশক্তিকে একসঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে। তবে সেই মোকাবিলা হতে হবে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক কায়দায়। কোনো ধরনের উসকানি, সংঘাত বা উত্তেজনার পথে নয় রাজনৈতিক কর্মসূচি, জনসম্পৃক্ততা এবং আদর্শিক অবস্থানের মধ্য দিয়েই তাদের মোকাবিলা করতে হবে।

নেতাকর্মীদের দায়িত্বশীল থাকার আহ্বান জানিয়ে এ্যানি বলেন, কেউ যেন কোনো ধরনের উসকানিতে পা না দেন। আমাদের ধৈর্য, শৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞা বজায় রাখতে হবে। যারা দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে চায়, জনগণকে সঙ্গে নিয়ে রাজনৈতিকভাবেই তাদের মোকাবিলা করতে হবে।

তিনি বলেন, আমরা পরীক্ষিত জিয়ার সৈনিক। দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আমরা শিখেছি কীভাবে প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হয়। তাই আমাদের ধৈর্য ও রাজনৈতিক শৃঙ্খলা বজায় রেখে এগিয়ে যেতে হবে।

নেতাকর্মীদের নিয়মিত সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে এ্যানি বলেন, “আমরা এভাবেই নিয়মিত সভা করে যাব। রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখব। মানুষের কাছে যাব, তাদের কথা শুনব এবং তাদের পাশে দাঁড়াব। আমাদের রাজনীতি হতে হবে মানুষের কল্যাণের রাজনীতি।

দলের অসহায় ও নির্যাতনের শিকার নেতাকর্মীদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আমাদের দলে অনেক অসহায় ও নির্যাতনের শিকার মানুষ রয়েছেন। তাদের অনেকেই আর্থিক সংকটের কারণে চিকিৎসা পর্যন্ত করাতে পারছেন না। আমাদের তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে। যারা দীর্ঘদিন দলের জন্য ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তাদের দুঃসময়ে পাশে দাঁড়ানো আমাদের রাজনৈতিক ও মানবিক দায়িত্ব।

এ্যানি বলেন, নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের লক্ষ্য হবে এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে মানুষ তার অধিকার, মর্যাদা ও ন্যায্য সুযোগ নিয়ে বসবাস করতে পারে। রাজনীতির মূল লক্ষ্য হতে হবে জনগণের কল্যাণ এবং দেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া।

সভায় প্রধান বক্তার বক্তব্যে রাখেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাহাবুবের রহমান শামীম। তিনি বলেন, নির্বাচনের পর দেশের রাজনীতিতে একটি নতুন প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে। এই নতুন বাস্তবতায় গণতন্ত্রের সৌন্দর্য ও রাজনৈতিক পরিবেশ বজায় রাখতে হলে যেকোনো ধরনের সন্ত্রাস, সহিংসতা ও গণতন্ত্রবিরোধী অপতৎপরতার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে অবস্থান নিতে হবে।

শামীম বলেন, অতীতের অপকর্মের পুনরাবৃত্তি যাতে কোনোভাবেই না ঘটে, সে বিষয়ে জনগণ ও রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের সচেতন ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা এবং শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি আরও বলেন, দেশের প্রতিটি ওয়ার্ড ও থানায় নিয়মিত সভা, সমাবেশ ও গণসংযোগের মাধ্যমে জনগণের কাছে গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বার্তা পৌঁছে দিতে হবে। একই সঙ্গে যেসব অপকর্ম বা উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড দেশের স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে পারে, সেগুলোর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও আইনসম্মতভাবে জনমত গড়ে তুলতে হবে।

নেতাকর্মীদের রাজপথে দায়িত্বশীল ও শৃঙ্খলাবদ্ধ ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়ে শামীম বলেন, কোনো মহল যেন রাজনৈতিক পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে জনমনে আতঙ্ক বা বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে না পারে, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।

সভাপতির বক্তব্যে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক এরশাদ উল্লাহ এমপি বলেন, দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির যেকোনো প্রচেষ্টা রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে হবে।

তিনি বলেন, ফ্যাসিস্ট নিষিদ্ধ ঘোষিত দল ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠী বিভিন্ন ধরনের অপকর্ম করছে। বোমাবাজিসহ নানা কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তারা দেশে এবং দেশের বাইরেও অরাজকতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে।

এরশাদ উল্লাহ বলেন, মনে রাখবেন, স্বৈরাচার কখনো বাংলাদেশে ফিরতে পারবে না। বাংলাদেশের মানুষই তাকে ফিরতে দেবে না।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের উদ্দেশে তিনি বলেন, অনেকের বিরুদ্ধে এখনো দোসরদের হয়ে কাজ করার অভিযোগ রয়েছে। আমি তাদের আহ্বান জানাচ্ছি, তারা যেন সরকারি পোশাকের মর্যাদা রক্ষা করেন এবং রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেন।

তিনি আরও বলেন, আমি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অনুরোধ করব, প্রচলিত আইন ও অধ্যাদেশ অনুযায়ী নিষিদ্ধ সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করুন।

সভায় বক্তারা দেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশ, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জনগণের অধিকার রক্ষায় নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ, শান্তিপূর্ণ ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান।

সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন
চট্টগ্রাম-১৩ আসনের সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজাম, কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও চট্টগ্রাম-৭ আসনের সংসদ সদস্য হুমাম কাদের চৌধুরী, চট্টগ্রাম-৯ আসনের সংসদ সদস্য আবু সুফিয়ান, চট্টগ্রাম-১২ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ এনামুল হক (এনাম), চট্টগ্রাম-১ (মিরসরাই) আসনের সংসদ সদস্য নুরুল আমিন, চট্টগ্রাম-১০ আসনের সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান, চট্টগ্রাম-১৪ আসনের সংসদ সদস্য জসিম উদ্দিন আহমেদ, হাটহাজারীর সংরক্ষিত নারী আসন-৫-এর সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার সাকিলা ফারজানা, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন এবং দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্যসচিব লায়ন হেলাল।

এ ছাড়া চট্টগ্রাম মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলা বিএনপি এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা সভায় উপস্থিত ছিলেন।

- Advertisement -spot_img
  • সর্বশেষ
  • পঠিত