শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২৬

পূর্ণ হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ শিশু একাডেমির পথ চলার পঞ্চাশ বছর

আফিপা আফরোজ

চেরাগি নিউজ ডেস্ক

বাংলাদেশ শিশু একাডেমী:

“শিশু একাডেমী” – শব্দটা শুনলেই বুকের ভেতরটা কেমন করে ওঠে। মনে হয়, শব্দটা উচ্চারণ করার সাথে সাথেই একটা পুরনো ড্রয়ার খুলে গেল, যেখানে গত ছয় বছরের সব হাসি-কান্না, রঙ-তুলি, কবিতা আর মঞ্চের আলো জমা আছে।

কেউ কেউ স্কুলকে দ্বিতীয় বাড়ি বলে। আমার কাছে শিশু একাডেমী ছিল আমার রঙিন বাড়িটা। যেখানে পড়াশোনার কোনো চাপ ছিল না, শুধু ছিল শেখার আনন্দ। যেখানে সবাই বন্ধু। স্যার-ম্যাডামরা শুধু শিক্ষক নন, পরিবারের বড় মানুষ।

বাংলাদেশ শিশু একাডেমী ১৯৭৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল শিশুদের সাংস্কৃতিক উন্নয়ন, প্রচার ও পৃষ্ঠপোষকতার জন্য। ৫০ বছর ধরে এই প্রতিষ্ঠান লক্ষ লক্ষ শিশুর স্বপ্নকে রঙ দিয়েছে। আমি গর্বিত, আমি তাদেরই একজন।

প্রায় সাড়ে ছয় বছর ধরে আমি এই একাডেমীতে প্রশিক্ষণ নিয়েছি। ছুটির দিন মানেই ছিল একাডেমীর দিন। সপ্তাহে ৫ দিন স্কুল, আর ২ দিন নিজের জন্য। শুক্রবার ও শনিবার সকালে যখন সবাই ঘুমিয়ে থাকত, আমি ব্যাগ গুছিয়ে নিতাম – রঙ পেন্সিল, আর্ট খাতা, আবৃত্তির বই। মা বলত, “আজও যাবি?” আমি হাসতাম। না গিয়ে পারতামই না। কারণ ওখানে গেলে আমার মন ভালো হয়ে যেত।

শিশু একাডেমী আমাকে শুধু ছবি আঁকা, আবৃত্তি বা অন্যান্য সৃজনশীল কাজকর্ম শেখায়নি, মানুষ চিনতে শিখিয়েছে। এখানে আমি দেখেছি নানা শ্রেণী-পেশার মানুষ। ডাক্তারের মেয়ে, রিকশাচালকের ছেলে, ইংলিশ মিডিয়ামের বন্ধু আর মাদ্রাসার ছাত্র – সবাই এক বেঞ্চে বসে রঙ করছি। বয়সেরও কোনো বাধা নেই। আমার সাথে ক্লাস করত আমার চেয়ে ছোট পিচ্চি আবার আমার চেয়ে বড় আপুরাও। এখানে এসেই বুঝেছি, শিল্পের কোনো ভেদাভেদ নেই।

আবার একাডেমীর বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আমি এমন সব মানুষের সামনে দাঁড়ানোর সুযোগ পেয়েছি যাদের আগে শুধু টিভিতে দেখতাম। গুণী শিল্পী, কবি, আবৃত্তিকারদের পাশে দাঁড়িয়ে কথা বলা, তাদের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া – এগুলো আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া।

*চিত্রাংকন দিয়ে শুরু – আমার প্রথম ভালোবাসা*

ছোটবেলা থেকেই আমার হাতে সবসময় রঙ পেন্সিল থাকত। দেয়ালে, খাতার শেষ পাতায়, এমনকি বাবার অফিসের কাগজেও আমি আঁকিবুকি করতাম। সেই আগ্রহ থেকেই ২০১৮ সালে বাবা- মা আমাকে ভর্তি করিয়ে দিলেন বাংলাদেশ শিশু একাডেমীতে। বিষয় – ‘চিত্রাংকন ও সৃজন’।

প্রথম দিনের কথা আজও স্পষ্ট মনে আছে। বিশাল একটা রুম, দেয়ালে সিনিয়রদের আঁকা ছবি টানানো। স্যার এসে বললেন, “আজ আমরা মেঘ আঁকব।” আমি মেঘ আঁকতে গিয়ে পুরো খাতা নীল করে ফেললাম। সবাই হেসেছিল, আমিও। সেই হাসি-আনন্দেই শেষ হয়ে গেল প্রথম বর্ষ। তখনো বুঝিনি, এই আঁকার খাতাটাই একদিন আমার সবচেয়ে প্রিয় ডায়েরি হয়ে যাবে।

তারপর এলো ২০২৯। কোভিড-১৯। পৃথিবী থেমে গেল। স্কুল বন্ধ, একাডেমীও বন্ধ। আমার রঙ তুলি সব ড্রয়ারের কোণে পড়ে রইল। আমি জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকতাম। ফেসবুকে দেখতাম, শিশু একাডেমীর অন্য শাখাগুলো অনলাইনে ক্লাস করছে। আমার খুব হিংসে হতো, খুব মন খারাপ হতো। মনে হতো, আমার রঙিন বাড়িটার দরজা কেউ বন্ধ করে দিয়েছে।

অবশেষে যখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলো, একদিন ফোনে মেসেজ এলো – “আগামী শুক্রবার থেকে ক্লাস শুরু।” বলে বোঝানো যাবে না, সেই রাতের আনন্দ । আমি তড়িঘড়ি করে ড্রয়ার থেকে সেই ধুলো পড়া আর্ট খাতা, রঙের বাক্স, পেন্সিল বের করছিলাম। মনে হচ্ছিল যেন ঈদের আগের রাত। আমার একদিনও ক্লাস মিস দিতে মন চাইত না। ঝড়-বৃষ্টির দিনেও মা’র হাত ধরে ছাতা মাথায় দিয়ে আমি একাডেমীতে গেছি। রিকশা পাওয়া যাচ্ছে না, রাস্তায় জল জমে আছে – তবুও যেতে হবে। কারণ ওখানে আমার বন্ধুরা অপেক্ষা করছে, আমার ক্যানভাস অপেক্ষা করছে। এমন হাজারো স্মৃতি, যা বলে শেষ করা যাবে না।

*আবৃত্তি ও উপস্থাপনা – আমার দ্বিতীয় শখ*

চিত্রাংকন কোর্স শেষ করার পর মনে হলো, আমার ভেতরে আরেকটা আমিও কথা বলতে চায়। ছোটবেলায় টিভিতে যখন কোনো মেয়েকে সুন্দর করে কবিতা আবৃত্তি করতে দেখতাম, মঞ্চে উপস্থাপনা করতে দেখতাম, তখন বুকের ভেতর প্রশ্ন জাগত – ওরা এত সুন্দর করে কীভাবে কথা বলে? ওদের গলায় এত জাদু কীভাবে আসে? আমিও কি পারব?

সেই ইচ্ছে থেকেই ভর্তি হলাম ‘আবৃত্তি ও উপস্থাপনা শৈলী’ বিভাগে।

এখানে এসে আমি নতুন করে নিজেকে আবিষ্কার করলাম। স্যার শেখালেন কীভাবে শ্বাস নিতে হয়, কীভাবে একটি শব্দকে ভালোবাসতে হয়। প্রথম প্রথম লজ্জা লাগত। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই লজ্জা কেটে গেল।

আমার সবচেয়ে ভালো লাগে রিহার্সালের সময়গুলো। একটা অনুষ্ঠানের জন্য আমরা সপ্তাহের পর সপ্তাহ রিহার্সাল করি। প্রথমে কেউ কাউকে চিনি না। তারপর একসাথে ভুল করি, একসাথে হাসি, একসাথে স্যারের বকা খাই। টিফিন ভাগ করে খাই। দেখতে দেখতে আমরা একটা পরিবার হয়ে যাই।

আর অনুষ্ঠানের আগের রাতের শেষ রিহার্সেলটা সবচেয়ে স্মৃতিময়। হলরুমটা অর্ধেক অন্ধকার, মঞ্চে একটা হলুদ আলো জ্বলছে। আমরা সবাই ক্লান্ত, কিন্তু চোখে উত্তেজনা। স্যার বারবার বলছেন – “শেষ লাইনটা আরেকটু দরদ দিয়ে।” বাইরে হয়তো বৃষ্টি পড়ছে। মঞ্চের পেছনে দাঁড়িয়ে আমরা ফিসফিস করে কবিতা আওড়াচ্ছি। মনে হয়, পুরো পৃথিবীতে শুধু আমরাই জেগে আছি। সেই মুহূর্তটা আমার কাছে একটা উপন্যাসের পাতার মতো।

*আমার অর্জন, আমার গর্ব*

শিশু একাডেমী আমাকে খালি হাতে ফেরায়নি। সেই ছোটবেলা থেকে স্কুলের সব সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় আমি সবসময় প্রথম হই। যখন স্টেজে আমার নাম ঘোষণা করা হয়, যখন বন্ধুরা হাততালি দেয়, তখন বুকটা ভরে যায়।

আর যখন কেউ জিজ্ঞেস করে, “তুমি এসব কোথায় শিখেছো?” তখন আমি গর্ব করে বলি, “আমি বাংলাদেশ শিশু একাডেমীতে শিখেছি।” এই গর্বের অনুভূতিটা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। মনে হয়, আমি একটা বড় পরিবারের অংশ।

এই একাডেমীর মাধ্যমেই আমি জীবনে প্রথমবার টেলিভিশনে অনুষ্ঠান করার সুযোগ পেয়েছি। একাডেমীতেই অডিশন হয়েছিল। শত শত ছেলেমেয়ের ভেতর থেকে বাছাই। যখন টিভি চ্যানেলের লোগোটা জ্বলে উঠল আর আমার নামটা স্ক্রিনে ভেসে উঠল, সেদিনের চেয়ে গর্ববোধ আর কোনদিন হয়নি আমার!

আমি ছোট থেকেই টুকটাক লেখালেখি করি। ডায়েরির পাতায়, স্কুলের খাতার পেছনে। কিন্তু আমার লেখা যে সত্যি সত্যি ছাপার অক্ষরে বের হতে পারে, সেটা আমি প্রথম বিশ্বাস করেছিলাম শিশু একাডেমীর ম্যাগাজিন হাতে পেয়ে। আমার প্রথম লেখা প্রকাশিত হয়েছিল এই ম্যাগাজিনেই। নিজের নামটা ছাপা দেখে মনে হয়েছিল, আমি বোধহয় সত্যি লেখক হয়ে গেছি। সেই ম্যাগাজিনটা আজও আমি যত্ন করে তুলে রেখেছি।

বর্তমানে আমি ক্লাস সেভেনে পড়ি। সামনের বছর ক্লাস এইট, বৃত্তি পরীক্ষা, জেএসসি পরীক্ষা – পড়াশোনার চাপ বাড়ছে। তাই এই বছর নতুন করে কোনো কোর্সে ভর্তি হতে পারিনি। কিন্তু তার মানে এই নয় যে আমার একাডেমীর সাথে সম্পর্ক শেষ। একাডেমী আমার মনে গেঁথে আছে।

আমি স্বপ্ন দেখি, অনেক দূর যাব। আমি স্বপ্ন দেখি, একদিন বড় মঞ্চে দাঁড়িয়ে আবৃত্তি করব, আমার আঁকা ছবি প্রদর্শনী হবে। আর সেই স্বপ্নের পেছনে সবসময় থাকবে বাংলাদেশ শিশু একাডেমী।

৫০ বছর পূর্তিতে আমার একটাই চাওয়া – এই আলোর বাড়িটা এভাবেই আরও ৫০ বছর, আরও ১০০ বছর ধরে হাজারো শিশুর স্বপ্নকে আগলে রাখুক। আমি ছিলাম, আমি আছি, আমি আজীবন এই একাডেমীর একজন গর্বিত শিক্ষার্থী হয়ে থাকতে চাইব!

এগিয়ে যাক বাংলাদেশ শিশু একাডেমী। এগিয়ে যাক শিশুদের শৈশবের।

লেখক: আফিপা আফরোজ
৭ম শ্রেণি, বিএএফ শাহীন কলেজ ঢাকা।

- Advertisement -spot_img
  • সর্বশেষ
  • পঠিত