সোমবার, সেপ্টেম্বর ১৪, ২০২৬

Power of Thank You

মো: কামরুল ইসলাম

নিজস্ব প্রতিবেদক

গত দুই সপ্তাহ ধরে ভাবছিলাম, কী নিয়ে লেখা যায়।
অনেক বিষয় মাথায় এসেছে। কিছু লিখতে শুরু করেছি, আবার মনে হয়েছে, না, এটা নিয়ে অন্যদিন লিখব। শেষ পর্যন্ত খুব সাধারণ একটি শব্দের কাছে এসে থামলাম Thank You।

দুটি ছোট্ট শব্দ।

খুব সাধারণ।

প্রতিদিন আমরা কতবার শুনি, কতবার ব্যবহার করি। অথচ একটু ভেবে দেখলে মনে হয়, এই ছোট্ট শব্দটির মধ্যে একটা অদ্ভুত শক্তি আছে।

প্রায় ১৫ বছরের ব্যাংকিং ক্যারিয়ারে বিভিন্ন লিডার, পিয়ার, জুনিয়র, ক্রস-ফাংশনাল টিম এবং সাপোর্ট টিমের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ হয়েছে। এই সময়ে অনেক ধরনের মানুষ, অনেক ধরনের পরিস্থিতি এবং অনেক ধরনের কাজের সম্পর্ক খুব কাছ থেকে দেখেছি।

কাজ করতে গিয়ে একটা বিষয় বারবার অনুভব করেছি।
সব সমস্যার সমাধান শুধু policy, process, authority, hierarchy বা formal communication দিয়ে হয় না।
অনেক সময় একটা হাসিমুখ, সুন্দরভাবে বলা কয়েকটি কথা এবং আন্তরিকভাবে বলা একটি “Thank You” এমন কিছু সহজ করে দেয়, যেটা হয়তো শুধু অফিসিয়াল নির্দেশনা দিয়ে করা সম্ভব হতো না।
সকালে অফিসে ঢোকার সময় আমাদের নিরাপত্তাকর্মী প্রতিদিন সালাম দেন। আমরা হয়তো স্বাভাবিকভাবেই সালামের জবাব দিয়ে ভেতরে চলে যাই।
কিন্তু কখনো একটু থেমে “কেমন আছেন?” জিজ্ঞেস করলে দেখেছি, মানুষের মুখের অভিব্যক্তিটাই যেন বদলে যায়।
চা বা কফি এনে দেওয়া সাপোর্ট স্টাফকে “Thank You” বলার মধ্যেও একই বিষয় আছে।

তার কাজের অংশ হিসেবেই হয়তো সে চা নিয়ে এসেছে। কিন্তু কাজের অংশ হওয়া আর কাজটির জন্য একজন মানুষকে স্বীকৃতি দেওয়া দুটো বিষয় আমার কাছে এক নয়।
পাশের ডেস্কের সহকর্মী হয়তো সারাদিন কোনো রিপোর্ট, তথ্য বা কাজে সহযোগিতা করছেন। নিজের টিমের একজন জুনিয়র কোনো কাজ সুন্দরভাবে শেষ করেছেন। অন্য কোনো বিভাগের সহকর্মী একটি কঠিন সময়ে সহযোগিতা করেছেন।
এসবকিছুকে আমরা খুব সহজেই “এটা তো তার কাজ” বলে পাশ কাটিয়ে যেতে পারি।
কিন্তু একটি “Thank You” সেই কাজটির প্রতি আমাদের acknowledgement হয়ে থাকতে পারে।

বিশেষ করে cross-functional কাজের ক্ষেত্রে বিষয়টা আরও বেশি অনুভব করেছি।
একটি বিষয়ে মতের অমিল হতে পারে। যুক্তি, পাল্টা যুক্তি, আলোচনা কিংবা কখনো কঠিন কথাও হতে পারে। কিন্তু দিনের শেষে “Thank You for your cooperation” বলার জায়গাটা থেকে যায়।
কারণ Thank You মানে সবসময় একমত হওয়া নয়।
কখনো কখনো এর অর্থ শুধু এটুকুই
“আপনার সহযোগিতাটাকে আমি দেখেছি এবং মূল্য দিচ্ছি।”
এখানেই আমার কাছে Thank You এর আরেকটি সুন্দর দিক আছে।

Thank You শুধু কৃতজ্ঞতা প্রকাশের শব্দ নয়। এটি একটি সুন্দর মানসিক অভ্যাস এবং সৌজন্যবোধেরও বহিঃপ্রকাশ।
কেউ আমার জন্য কিছু করেছেন, আমি সেটা লক্ষ্য করছি, স্বীকার করছি এবং সম্মানের সঙ্গে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছি।
এই ছোট্ট অভ্যাসের মধ্যেই হয়তো একটা ইতিবাচক মনোভাব কাজ করে।
আমরা প্রতিদিনের জীবনে খুব সহজেই সমস্যা, বিরক্তি, অসন্তুষ্টি বা না-পাওয়ার বিষয়গুলো বেশি দেখি। তার মাঝেও অন্যের ছোট্ট সহযোগিতাটুকু লক্ষ্য করা এবং তার জন্য Thank You বলা হয়তো আমাদের চিন্তার দিকটাকেও একটু ইতিবাচক রাখতে সাহায্য করে।
আর এই বিষয়টা শুধু corporate life এর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
আমাদের প্রতিদিনের জীবন আসলে অসংখ্য মানুষের ছোট ছোট সেবা ও সহযোগিতার সঙ্গে জড়িয়ে আছে।

একটা রেস্টুরেন্টে খেতে গেলে ওয়েটার খাবার সার্ভ করেন, পানি দেন, টেবিল পরিষ্কার করেন, বিল এনে দেন।
তার কাজের অংশ হিসেবেই তিনি এসব করছেন।
কিন্তু খাবার ভালো লাগলে বা সার্ভিস ভালো হলে একটি হাসিমুখে “Thank You” বলাএই ছোট্ট স্বীকৃতিটুকু তার মুখে যে স্বাভাবিক আনন্দ তৈরি করে, সেটাও খুব সহজে চোখে পড়ে।
অফিসের পাশে ছোট্ট টং দোকানে বসে বন্ধু বা সহকর্মীদের সঙ্গে চা খাওয়ার সময়ও এমন অনেক ছোট মুহূর্ত তৈরি হয়।
চা এনে দেওয়া মানুষটিকে একটা “Thank You” বা “চা ভালো হয়েছে” বলার পরের মুহূর্তের হাসিটা হয়তো খুব ছোট বিষয়।
কিন্তু মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক তো অনেক সময় এই ছোট বিষয়গুলোর মধ্যেই তৈরি হয়।
রিকশা বা সিএনজি চালক আমাদের গন্তব্যে পৌঁছে দেন।
বাস বা ট্রেনের যাত্রায় বিভিন্ন মানুষ কোনো না কোনোভাবে আমাদের যাত্রাটা সহজ করেন।
শপিং করতে গিয়ে কেউ পণ্য খুঁজে দেন, কেউ বিল করেন, কেউ প্যাকেট গুছিয়ে দেন।
পাড়ার দোকান থেকে সবজি, মাছ বা প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে গিয়ে একই মানুষটির সঙ্গে হয়তো প্রতিদিন দেখা হচ্ছে।
ফার্মেসিতে গিয়ে ওষুধ নিচ্ছি।
কেউ আমাদের প্রয়োজনীয় জিনিসটি খুঁজে দিচ্ছেন।
কেউ কোনো তথ্য দিচ্ছেন।
একটু Thank You বলার জায়গা সেখানেও আছে।

আমরা কল সেন্টারে ফোন করে সেবা নিচ্ছি।
কখনো সাধারণ কোনো তথ্যের জন্য ফোন করছি। কখনো কোনো অভিযোগ বা সমস্যার সমাধানের জন্য। কখনো কোনো জরুরি সেবার প্রয়োজন হচ্ছে।
ওপাশে থাকা মানুষটি হয়তো সারাদিন অসংখ্য মানুষের ফোন রিসিভ করছেন।
তারপরও আমাদের সমস্যাটা শুনছেন, তথ্য দিচ্ছেন, সমাধানের চেষ্টা করছেন।
কথা শেষে একটি “Thank You for your support” হয়তো খুব ছোট একটা বিষয়।
কিন্তু এটুকু সৌজন্যও communication এর tone টাকে বদলে দিতে পারে।
আর কিছু কিছু পরিস্থিতিতে আমরা নিজেরাই বুঝতে পারি, অন্যের সেবা আমাদের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
হাসপাতালের emergency তে গেলে আমরা বুঝি, প্রয়োজনের সময়ে একটি সেবা কতটা মূল্যবান হতে পারে।
বাড়িতে হঠাৎ পানি পড়ছে, electrical problem হয়েছে, কোনো appliance নষ্ট হয়েছে, plumbing এর সমস্যা হয়েছেতখন একজন electrician, plumber বা technician এর প্রয়োজনীয়তা আমরা খুব ভালোভাবে অনুভব করি।
কেউ এসে রাতের বেলায় সমস্যাটা ঠিক করে দিয়ে গেলেন।
কেউ installation করে দিলেন।
কেউ repair করে দিলেন।
কেউ কোনো household service এর জরুরি সমস্যার সমাধান করে দিয়ে গেলেন।
সেই মুহূর্তে হয়তো আমরা খুব ব্যস্ত, চিন্তিত বা বিরক্ত থাকি।
তারপরও কাজটা হয়ে গেলে একটি আন্তরিক “Thank You” বলার জায়গা থাকে।
আমাদের দৈনন্দিন জীবনে এরকম উদাহরণ আসলে অসংখ্য।
জুতো নষ্ট হলে মেরামত করতে দিই।
ব্যাগের চেইন নষ্ট হলে ঠিক করাই।
ঘড়ি, মোবাইল, কম্পিউটার বা কোনো household equipment-এর সমস্যা হলে repair service নিই।
কাপড় alteration করাই।
কেউ বাসায় এসে কোনো জিনিস install করে দিয়ে যান।
কেউ delivery দিয়ে যান।
কেউ maintenance করেন।
কেউ আমাদের ছোট্ট একটা inconvenience দূর করে দিয়ে যান।
আমরা হয়তো এসব কাজকে খুব স্বাভাবিকভাবেই নিই।
কিন্তু একটু খেয়াল করলে দেখা যায়, আমাদের প্রতিদিনের জীবনকে সহজ রাখতে চারপাশে কত পেশার মানুষ নীরবে কাজ করে যাচ্ছেন।

কেউ আমাদের সেবা দিচ্ছেন।
কখনো আমরা তাদের সেবা নিচ্ছি।
কখনো আবার আমরাও অন্য কারও জন্য কোনো সেবা দিচ্ছি।
এই পারস্পরিক নির্ভরতার মধ্যেই তো আমাদের সামাজিক জীবনটা এগিয়ে চলছে।
আর সেখানেই একটি ছোট্ট Thank You এর জায়গা তৈরি হয়।
লিফটের দরজা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আমাকে দেখে একজন পরিচিত বা অপরিচিত মানুষ দরজাটা একটু আটকে দিলেন।
একটা হাসি।

একটা Thank You।
ব্যাপারটা সেখানেই শেষ।
কিন্তু মুহূর্তটা সুন্দর হয়ে গেল।
আমার মনে হয়, Thank You এর সবচেয়ে সুন্দর দিকগুলোর একটি হলোএটা সম্পর্কের hierarchy দেখে না।
এটা শুধু সিনিয়রদের জন্য নয়।
শুধু বসের জন্য নয়।
শুধু গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের জন্য নয়।
একজন জুনিয়র সহকর্মী, একজন সাপোর্ট স্টাফ, একজন নিরাপত্তাকর্মী, একজন ওয়েটার, একজন দোকানদার, একজন রিকশাচালক, একজন technician যে কেউ হতে পারেন।
একজন মানুষ হিসেবে অন্য একজন মানুষের ছোট্ট সহযোগিতাকে স্বীকার করাই এখানে মূল বিষয়।
এই অভ্যাসটা আমাদের সন্তানদের মধ্যেও খুব স্বাভাবিকভাবে চলে আসতে পারে।
শুধু বাবা-মা বা শিক্ষককে Thank You নয়।
ভাই-বোনকে Thank You বলা যায়।
বন্ধুকে বলা যায়।
স্কুলের সাপোর্ট স্টাফকে বলা যায়।
কেউ ছোট্ট কোনো সহযোগিতা করলেও বলা যায়।
শিশুরা আমাদের কাছ থেকে অনেক কিছুই শেখে। তারা যদি দেখে, তাদের বাবা-মা একজন নিরাপত্তাকর্মী, একজন দোকানদার, একজন ওয়েটার কিংবা একজন সাপোর্ট স্টাফের প্রতিও একই স্বাভাবিক সম্মান দেখাচ্ছেন, সেটাও হয়তো তাদের বড় হওয়ার একটি ছোট শিক্ষা হয়ে থাকে।
আমাদের communication এর ক্ষেত্রেও বিষয়টা বেশ interesting।
একটি ফোন কলের শেষে শুধু “আচ্ছা, রাখি” না বলে “Thank You, ভালো থাকবেন” বলা যায়।
একটি formal email যতই কঠিন হোক, মতের পার্থক্য যতই থাকুক, যুক্তি বা পাল্টা যুক্তি যতই থাকুক, পেশাদারভাবে বক্তব্য শেষ করার পর একটি “Thank You” থেকে যেতে পারে।

এতে বক্তব্যের দৃঢ়তা কমে না।
বরং communication এর মধ্যে একটা মানবিক জায়গা তৈরি হয়।
আর একটা বিষয় আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
Thank You যেন শুধু মুখের শব্দ না হয়।
এটা অন্তর থেকে আসা দরকার।
কারণ শুধু শব্দ হিসেবে Thank You বলা আর সত্যিকারের appreciation থেকে Thank You বলাদুটোর অনুভূতি এক নয়।
আমার কাছে Thank You-এর সঙ্গে positive mindset এরও একটা সম্পর্ক আছে।
কারণ আমরা চাইলে প্রতিদিনের জীবনে শুধু সমস্যাগুলো দেখতে পারি।
আবার চাইলে সমস্যার মাঝেও কারও সহযোগিতাটুকু দেখতে পারি।
কেউ আমার জন্য সময় দিয়েছেন।
কেউ আমার কাজটা সহজ করেছেন।
কেউ আমার সমস্যার সমাধান করেছেন।
কেউ হয়তো মাত্র কয়েক সেকেন্ডের জন্য লিফটের দরজা ধরে রেখেছেন।
কেউ হয়তো এক কাপ চা এনে দিয়েছেন।
এই ছোট ছোট ভালো বিষয়গুলো লক্ষ্য করার অভ্যাসটাও হয়তো আমাদের মনকে একটু ইতিবাচক রাখে।
আমার ১৫ বছরের কর্মজীবনের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, আমরা অনেক সময় বড় বড় বিষয় নিয়ে কাজ করিtarget, deadline, process, policy, performance, compliance, business, customer এবং আরও অনেক কিছু।
কিন্তু এর মাঝেও আমাদের প্রতিদিনের কাজকে সহজ করে দেওয়া মানুষগুলোর অবদান খুব সহজেই চোখের আড়ালে চলে যায়।
হয়তো সেই জায়গাতেই একটি ছোট্ট Thank You এর প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি।
আমি মনে করি না, একটি Thank You সব সমস্যার সমাধান করে দিতে পারে।
কিন্তু এটি অনেক ছোট সমস্যাকে বড় হতে না দিতে পারে।
একজন মানুষের মন ভালো করে দিতে পারে।
একটি সম্পর্ককে একটু উষ্ণ করতে পারে।
কাজের পরিবেশকে একটু সহজ করতে পারে।

কখনো কোনো কঠিন conversation এর শেষে tension একটু কমিয়ে দিতে পারে।
আর কখনো কখনো একটি আন্তরিক Thank You হয়তো কাউকে তার কাজটা আরও ভালোভাবে করার অনুপ্রেরণাও দিতে পারে।
গত কয়েকদিন ধরে বিষয়টা নিয়ে ভাবতে গিয়ে আমার নিজের কাছেও মনে হয়েছে
আমরা প্রতিদিন কত মানুষের কাছ থেকে কত কিছু নিই।
সময় নিই।
সেবা নিই।
সহযোগিতা নিই।
তথ্য নিই।
কাজে সাহায্য নিই।
কিন্তু তার বিনিময়ে আমরা কতবার থেমে বলি
Thank You।
হয়তো এই ছোট্ট শব্দটাকে আমাদের জীবনে আরেকটু জায়গা দেওয়া যায়।
কোনো নিয়ম হিসেবে নয়।
কোনো লাভ পাওয়ার কৌশল হিসেবেও নয়।
শুধু একজন মানুষ হিসেবে, আরেকজন মানুষের ছোট্ট অবদানকে স্বীকার করার জন্য।

আমার কাছে এটাই The Power of Thank You।
একটি ছোট্ট শব্দ।
কিন্তু যদি সেটা সত্যিই অন্তর থেকে আসে, তাহলে তার প্রভাব হয়তো শব্দের চেয়েও অনেক বড়।
আর হয়তো একটু বেশি Thank You বলা মানে শুধু বেশি কৃতজ্ঞ হওয়া নয়একটু বেশি সৌজন্যশীল, একটু বেশি ইতিবাচক এবং একটু বেশি মানবিক হয়ে ওঠাও।

 

লেখক : মো: কামরুল ইসলাম,

ব্যাংকার,  কলামিস্ট। 

- Advertisement -spot_img
  • সর্বশেষ
  • পঠিত