শনিবার, আগস্ট ৮, ২০২৬

একজন সাধারণ ব্যাংকারের চার বছরের আত্মজয়ের গল্প!

হাঁটা থেকে ম্যারাথন ফিনিশ লাইনের চেয়ে পথচলাই বড়

চেরাগি নিউজ ডেস্ক

“আমি কোনো চিকিৎসক নই, ফিটনেস প্রশিক্ষকও নই। আমি একজন সাধারণ চাকরিজীবী। এই লেখায় চিকিৎসাবিষয়ক কোনো পরামর্শ নেই। আছে শুধু একজন সাধারণ মানুষের চার বছরের কিছু অভিজ্ঞতা, যা হয়তো আরেকজন মানুষকে নিজের জন্য একটু সময় বের করতে অনুপ্রাণিত করবে।”
কোভিড-১৯ আমাদের জীবনের অনেক কিছু বদলে দিয়েছিল। দীর্ঘদিন ঘরবন্দি থাকা, কাজের ধরন পাল্টে যাওয়া, অনিশ্চয়তা আর মানসিক চাপ—সব মিলিয়ে জীবন যেন এক অদৃশ্য বৃত্তের মধ্যে আটকে গিয়েছিল। আমাদের অনেকের মতো আমিও দিনের বড় একটি সময় ঘরের ভেতর কাটিয়েছি। কাজ ছিল, দায়িত্ব ছিল, কিন্তু শরীরের স্বাভাবিক চলাফেরা প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করলে আমি নিজেকে একটি সহজ প্রশ্ন করেছিলাম—নিজের জন্য আমি প্রতিদিন অন্তত আধা ঘণ্টা সময় দিতে পারি না?
সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই শুরু হয়েছিল হাঁটা।
শুরুতে কোনো লক্ষ্য ছিল না। ওজন কমানো, ম্যারাথনে অংশ নেওয়া কিংবা মেডেল জেতা—এসব কিছুই তখন আমার মাথায় ছিল না। শুধু চেয়েছিলাম, দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে আবার একটু সচল হতে।
প্রথম দিকে প্রতিদিন ২০ থেকে ৩০ মিনিট হাঁটতাম। পরে সময় আর দূরত্ব—দুটোই ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। এখনো চেষ্টা করি সপ্তাহে অন্তত চার থেকে পাঁচ দিন হাঁটতে। কোনো দিন খুব ভোরে, আবার কোনো দিন অফিস শেষে সন্ধ্যায়। ব্যস্ততা থাকে, কাজের চাপও থাকে; তবু দিনের একটি ছোট্ট সময় নিজের জন্য রেখে দেওয়ার চেষ্টা করি।
আমার কাছে হাঁটার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো—এটি খুব সহজ। এর জন্য আলাদা কোনো সদস্যপদ লাগে না, দামি যন্ত্রপাতি লাগে না, বিশেষ প্রশিক্ষণেরও প্রয়োজন হয় না। একটি আরামদায়ক জুতা, কিছুটা ইচ্ছাশক্তি আর নিয়মিত থাকার মানসিকতা—এতেই শুরু করা যায়।
অনেকে হাঁটার সময় গান শোনেন, ফোনে কথা বলেন বা কানে হেডফোন লাগিয়ে রাখেন। এটি একান্তই ব্যক্তিগত পছন্দ। তবে আমি সাধারণত হাঁটার সময় মোবাইল ফোন বা হেডফোন ব্যবহার করি না। এই সময়টুকু আমি চারপাশের পৃথিবীকে অনুভব করতে চাই।
রাস্তার ব্যস্ততা, রিকশার ঘণ্টা, মানুষের চলাফেরা, ফুটপাতের ছোট্ট চায়ের দোকান, অফিসগামী মানুষের তাড়াহুড়ো, স্কুলপড়ুয়া শিশুদের হাসি—সব মিলিয়ে প্রতিটি সকাল কিংবা সন্ধ্যারই আলাদা একটি গল্প থাকে। একই পথে প্রতিদিন হাঁটলেও প্রতিদিনই যেন নতুন কিছু চোখে পড়ে।

সুযোগ পেলেই রমনা পার্কে হাঁটতে যেতাম। সবুজে ঘেরা সেই পরিবেশে হাঁটলে মনটা অদ্ভুতভাবে হালকা হয়ে যায়। বিশেষ করে বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষদের নিয়মিত ব্যায়াম, হাঁটাহাঁটি আর প্রাণবন্ত আড্ডা আমাকে বারবার অনুপ্রাণিত করেছে। তখন মনে হয়েছে, সুস্থ থাকার ইচ্ছার কোনো নির্দিষ্ট বয়স নেই।

রমনা পার্কের একটি সকাল। এখানেই অনেক অভিজ্ঞ রানারের কাছ থেকে শিখেছি -ধারাবাহিকতাই সবচেয়ে বড় শক্তি।

রমনা পার্কে কয়েকদিন অনুশীলন করার সময়ই পরিচয় হয় কিছু দারুণ মানুষের সঙ্গে। তাঁদের মধ্যে ছিলেন আমার বন্ধু, ব্যাংক কর্মকর্তা মো. আলাউদ্দিন। তাঁকে আমি আমার ম্যারাথন যাত্রার অন্যতম অনুপ্রেরণা মনে করি। তিনি নিয়মিত বিভিন্ন দৌড়ের ইভেন্টে অংশ নিতেন এবং তাঁর রানিং গ্রুপের সঙ্গে অনুশীলন করতেন। তাঁর কাছ থেকেই প্রথম বুঝতে পারি, ম্যারাথন মানে শুধু দ্রুত দৌড়ানো নয়; এটি ধৈর্য, শৃঙ্খলা এবং ধারাবাহিকতার একটি দীর্ঘ যাত্রা।
পরে ব্যাংক কর্মকর্তা হাসিব সহ আরও কয়েকজন রানিংপ্রেমী ব্যাংকার ও পেশাজীবীর সঙ্গে পরিচয় হয়। তাঁদের সঙ্গে কথা বলে বুঝলাম, এই কমিউনিটিতে কেউ কাউকে প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করেন না। বরং সবাই নতুনদের উৎসাহ দেন, অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেন এবং একে অপরকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেন।
অনেকেই বলেন, “হাঁটার সঙ্গী নেই, তাই শুরু করতে পারছি না।” আমার অভিজ্ঞতা একটু ভিন্ন। সঙ্গী থাকলে অবশ্যই ভালো। গল্প করতে করতে সময়ও দ্রুত কেটে যায়। কিন্তু কেউ না থাকলেও শুরু করা উচিত। কারণ প্রথম পদক্ষেপটি আপনাকেই নিতে হবে। পরে হয়তো পথেই নতুন সঙ্গী পাওয়া যাবে। আর যদি কেউ না-ও আসে, তবুও থেমে থাকার কোনো কারণ নেই।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই বিখ্যাত পঙক্তিটি এখানে বারবার মনে পড়ে –
“যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে, তবে একলা চলো রে।”
হাঁটার ক্ষেত্রেও এই কথাটি সমান সত্য।
তখনো আমি জানতাম না, প্রতিদিনের এই সাধারণ হাঁটাই একদিন আমাকে ম্যারাথনের স্টার্ট লাইনে দাঁড় করিয়ে দেবে। একটি ছোট অভ্যাস যে এত বড় একটি যাত্রার শুরু হতে পারে, সেটি তখন কল্পনাও করিনি।

প্রথম ফিনিশ লাইন, প্রথম মেডেল এবং নতুন আত্মবিশ্বাস:

প্রতিদিনের নিয়মিত হাঁটা একসময় আমার ভেতরে নতুন একটি আত্মবিশ্বাস তৈরি করে। তখন আর শুধু হাঁটতে ভালো লাগত না, মাঝেমধ্যে অল্প অল্প করে দৌড়াতেও শুরু করেছিলাম। কিন্তু তখনও নিজেকে একজন রানার হিসেবে ভাবিনি। মনে হতো, ম্যারাথন হয়তো খুব অভিজ্ঞ আর পেশাদার মানুষদের জন্য।
কিন্তু একদিন বন্ধু মো. আলাউদ্দিন বললেন, “একবার অংশ নিয়ে দেখুন। জেতার জন্য নয়, শেষ করার জন্য।” কথাটি খুব সাধারণ ছিল। কিন্তু আমার কাছে সেটিই ছিল সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা।
অবশেষে নিবন্ধন করলাম আমার প্রথম রানিং ইভেন্টে।

তারিখ- ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪। আয়োজক – আল্ট্রা ক্যাম্প রানার্স (ইউসিআর)। দূরত্ব – ৭.৫ কিলোমিটার।

ম্যারাথনের দিন খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠেছিলাম। চারদিকে তখনও পুরোপুরি সকাল হয়নি। নির্ধারিত স্থানে পৌঁছে দেখলাম – বিভিন্ন বয়সের অসংখ্য মানুষ। কেউ অনেক অভিজ্ঞ, কেউ প্রথমবারের মতো অংশ নিতে এসেছে। সবার মুখে এক ধরনের উচ্ছ্বাস, আবার নীরব প্রস্তুতিও।
সেদিন আমার মনে কোনো প্রতিযোগিতার ভাবনা ছিল না। লক্ষ্য ছিল মাত্র একটাই – ফিনিশ লাইন পর্যন্ত পৌঁছানো।
দৌড় শুরু হওয়ার পর প্রথম কয়েক কিলোমিটার বেশ স্বাভাবিকই মনে হচ্ছিল। এরপর ধীরে ধীরে ক্লান্তি অনুভব করতে শুরু করি। তখন বুঝতে পারলাম, ম্যারাথন শুধু শরীরের শক্তির পরীক্ষা নয়; এটি মানসিক দৃঢ়তারও পরীক্ষা।
নিজেকে একটাই কথা বলছিলাম – “থেমো না। ধীরে হলেও সামনে এগিয়ে যাও।”
অবশেষে সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত এল। ফিনিশ লাইন অতিক্রম করলাম। অফিসিয়াল সময় ছিল ৫৯ মিনিট ৪২.৫ সেকেন্ড, পরিয়ে দেওয়া হলো আমার জীবনের প্রথম ফিনিশার মেডেল।
সেই মুহূর্তের অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। কারণ এটি শুধু ৭.৫ কিলোমিটার শেষ করার আনন্দ ছিল না। এটি ছিল নিজের অলসতা, দ্বিধা আর “আমি পারব তো?” – এই প্রশ্নটিকে হারিয়ে দেওয়ার আনন্দ।

৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪। প্রথম অফিসিয়াল রানিং ইভেন্ট, ৭.৫ কিলোমিটার। অফিসিয়াল সময়: ৫৯ মিনিট ৪২.৫ সেকেন্ড।

আজও অনেকেই জিজ্ঞেস করেন, “এতগুলো মেডেলের মধ্যে কোনটি সবচেয়ে প্রিয়?” আমার উত্তর সব সময় একই “প্রথমটি”। কারণ প্রথম পদক্ষেপ, প্রথম সাহস আর প্রথম সাফল্যের অনুভূতির কোনো বিকল্প হয় না।
এরপর ধীরে ধীরে আরও কয়েকটি রানিং ইভেন্টে অংশ নিই। ৭.৫ কিলোমিটার থেকে ১০ কিলোমিটার, তারপর ১৫ কিলোমিটার। প্রতিটি নতুন দূরত্বের আগে নিজেকে প্রস্তুত করেছি। কখনোই তাড়াহুড়ো করিনি। কারণ শরীরকে সময় দেওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
অনেকেই মনে করেন, রানিং ইভেন্টে অংশ নিতে হলে পুরো পথ দৌড়ে শেষ করতে হবে। বাস্তবে বিষয়টি এমন নয়। প্রয়োজনে কিছুটা হাঁটা যায়, বিশ্রাম নেওয়া যায়, পানি পান করা যায়। শরীর যদি সংকেত দেয়, সেটিকে গুরুত্ব দিতে হবে। নিজের সীমাবদ্ধতাকে সম্মান করাও একজন দায়িত্বশীল অংশগ্রহণকারীর পরিচয়।
আমি কখনো সময় নিয়ে খুব বেশি ভাবিনি। আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল একটি বিষয় – ফিনিশ করা। কারণ ম্যারাথনে আমি অন্য কারও সঙ্গে প্রতিযোগিতা করি না। আমি প্রতিযোগিতা করি গতকালের নিজের সঙ্গে।
এই যাত্রায় আরও একটি বিষয় শিখেছি, নিয়মিত অনুশীলনের কোনো বিকল্প নেই। একটি ইভেন্টে শুধু নিবন্ধন করলেই হয় না। নিয়মিত হাঁটা, ধীরে ধীরে দৌড়ের অভ্যাস, পর্যাপ্ত ঘুম, সুষম খাবার, পর্যাপ্ত পানি পান এবং বিশ্রাম, সবকিছুই গুরুত্বপূর্ণ।
ম্যারাথনে অংশ নেওয়ার আগে আরামদায়ক জুতা ব্যবহার করা, শরীর প্রস্তুত করার জন্য কিছুক্ষণ হালকা ব্যায়াম করা এবং দৌড় শেষে শরীরকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম দেওয়াও জরুরি। এগুলো ছোট বিষয় মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদে বড় পার্থক্য তৈরি করে।

গত চার বছরে আমি ২০টি ছোট ম্যারাথন ও রানিং ইভেন্টে অংশ নিয়েছি। প্রতিটি ইভেন্ট আমাকে নতুন কিছু শিখিয়েছে। কোথাও শিখেছি ধৈর্য, কোথাও শিখেছি গতি নিয়ন্ত্রণ, আবার কোথাও শিখেছি নিজের শরীরের কথা মন দিয়ে শুনতে।
ম্যারাথনে অংশ নেওয়ার সঙ্গে কিছু খরচও থাকে। ইভেন্টভেদে নিবন্ধন ও যাতায়াতসহ খরচ হতে পারে। তবে এর সঙ্গে যে অভিজ্ঞতাগুলো পাওয়া যায়, সেগুলোর মূল্যও কম নয়। অনেক ইভেন্টে টি-শার্ট বা জার্সি, ফিনিশার মেডেল, খাবার, স্পন্সরদের ছোট উপহার এবং ছবি তোলার সুযোগ থাকে। তবে আমার কাছে আসল প্রাপ্তি হলো – একটি সকাল সুস্থতার জন্য ব্যয় করা এবং স্বাস্থ্যসচেতন অনেক মানুষের সঙ্গে দেখা হওয়া।
বিভিন্ন বয়সের মানুষকে একই ট্র্যাকে দেখা যায় – সিনিয়র সিটিজেন, তরুণ-তরুণী, তরুণ দম্পতি, স্কুলপড়ুয়া ছেলে-মেয়ে, পেশাজীবী মানুষ। সাম্প্রতিক ইভেন্টগুলোতে নারী অংশগ্রহণকারীদের উপস্থিতিও চোখে পড়ার মতো। এই বৈচিত্র্য ম্যারাথনকে আমার কাছে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
আজও আমার লক্ষ্য কোনো রেকর্ড গড়া নয়। আমার লক্ষ্য একটাই—সুস্থ থাকা, নিয়মিত থাকা এবং প্রতিটি নতুন ফিনিশ লাইনে পৌঁছে নিজেকে মনে করিয়ে দেওয়া যে, জীবনের বড় পরিবর্তন কখনো একদিনে আসে না। ছোট ছোট নিয়মিত পদক্ষেপই একদিন বড় অর্জনের ভিত্তি তৈরি করে।

ব্যস্ত কর্মজীবনের মাঝেও নিজের জন্য একটু সময়:

আমি ব্যাংকিং পেশায় কাজ করি। প্রতিদিনের কাজের মধ্যে থাকে মিটিং, রিপোর্ট, বিশ্লেষণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ এবং নানা ধরনের চাপ। দিনের একটি বড় অংশ কম্পিউটার বা ল্যাপটপের সামনে বসে কাটে। কর্পোরেট জীবনে এই ধরনের দীর্ঘ সময় বসে থাকা এখন খুবই স্বাভাবিক।
এই বাস্তবতায় আমার কাছে হাঁটা শুধু শরীরচর্চা নয়; এটি নিজের জন্য কিছুটা সময় বের করে নেওয়া। হাঁটার সময় মাথা একটু হালকা হয়, দিনের নানা চিন্তা গুছিয়ে নেওয়ার সুযোগ হয়। কখনো কোনো কাজের নতুন ভাবনা আসে, কখনো শুধু চারপাশের মানুষকে দেখতে দেখতে সময় কেটে যায়।
স্মার্টফোনের স্বাস্থ্য অ্যাপ বা স্মার্ট ঘড়িতে হাঁটার সময়, দূরত্ব বা পদক্ষেপের হিসাব রাখা যায়। এগুলো অনেকের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হতে পারে। আমার কাছে এগুলো মূল লক্ষ্য নয়; নিজের অগ্রগতি দেখার একটি ছোট্ট মানসিক তৃপ্তি। মূল বিষয় হলো নিয়মিত থাকা। প্রতিদিন সম্ভব হলে ভালো; না হলে সপ্তাহে চার-পাঁচ দিনও একটি ভালো শুরু।

সবচেয়ে বড় পুরস্কার মেডেল নয়, একটি অনুপ্রেরণার গল্প:

ম্যারাথনের সঙ্গে পরিচয়ের পর একটি বিষয় খুব কাছ থেকে দেখেছি – এটি শুধু দৌড়ের একটি আয়োজন নয়, এটি মানুষকে মানুষে যুক্ত করার একটি সুন্দর মাধ্যম। বিভিন্ন পেশা, বিভিন্ন বয়স, ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতার মানুষ এখানে একসঙ্গে দাঁড়ান। কেউ নিজের প্রথম কয়েক কিলোমিটার শেষ করতে এসেছেন, কেউ আবার দীর্ঘ দূরত্বের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কিন্তু ফিনিশ লাইনে পৌঁছানোর পর সবার আনন্দ যেন একই রকম।
সবচেয়ে ভালো লাগে একটি বিষয় – এখানে কেউ কাউকে ছোট করে না। বরং একজন আরেকজনকে উৎসাহ দেন, অভিনন্দন জানান, নতুনদের সাহস দেন। প্রতিযোগিতার চেয়ে সহযোগিতার এই সংস্কৃতিই আমাকে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করেছে।
একটি ইভেন্টে অংশ নিতে গিয়ে আরও একটি আনন্দের অভিজ্ঞতা হয়েছিল। সেখানে হঠাৎ করেই আমার কর্মস্থলের কয়েকজন সহকর্মীর সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। প্রতিদিন অফিসে যাঁদের সঙ্গে কাজ করি, সেদিন তাঁদের সঙ্গে একই ট্র্যাকে দাঁড়িয়েছিলাম। অফিসের আনুষ্ঠানিক পরিবেশের বাইরে আমরা সবাই তখন শুধু একজন অংশগ্রহণকারী।
সেদিন উপলব্ধি করেছিলাম, কর্মক্ষেত্রের সম্পর্ক শুধু সভাকক্ষ বা অফিসের দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। সুস্থ জীবনযাপনের মতো একটি ইতিবাচক অভ্যাস সহকর্মীদের মধ্যেও নতুন ধরনের বন্ধন তৈরি করতে পারে।

অফিসের বাইরে, একই ট্র্যাকে, একই প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন সহকর্মী, একসঙ্গে একটি স্মরণীয় সকাল।

তবে আমার এই যাত্রার সবচেয়ে স্মরণীয় দিনটি এসেছে অন্য একটি কারণে। ২০২৬ সালের ১১ জুলাই একটি রানিং ইভেন্টে আমি ১৫ কিলোমিটার বিভাগে অংশ নিয়েছিলাম। একই আয়োজনে শিশুদের জন্যও এক কিলোমিটারের একটি দৌড় ছিল। সেখানে অংশ নিয়েছিল আমার ছেলে।
আমি নিজের দৌড় নিয়ে যতটা ভাবছিলাম, তার চেয়েও বেশি অপেক্ষা করছিলাম ছেলের দৌড় দেখার জন্য। স্টার্ট লাইনে দাঁড়িয়ে তার চোখেমুখে ছিল উত্তেজনা, কৌতূহল আর একটু নার্ভাসনেস – ঠিক যেমনটা আমি অনুভব করেছিলাম আমার প্রথম ইভেন্টের দিন।
দৌড় শেষ হওয়ার পর যখন দেখলাম সে হাসিমুখে ফিনিশ লাইন পার করেছে, তখন মনে হলো – আজকের দিনটি আমার জন্য সত্যিই বিশেষ। আরও আনন্দের বিষয়, সে শিশুদের ১ কিলোমিটার ছেলেদের বিভাগে দ্বিতীয় রানার-আপ হওয়ার পুরস্কার অর্জন করে। ট্রফি হাতে তার আনন্দ আমার নিজের ১৫ কিলোমিটার শেষ করার আনন্দকেও ছাপিয়ে গিয়েছিল।
একজন বাবা হিসেবে তখন উপলব্ধি করলাম, আমার সবচেয়ে বড় সাফল্য নিজের ১৫ কিলোমিটার শেষ করা নয়। বরং আমার সন্তান নিজের ইচ্ছায় একটি স্বাস্থ্যকর অভ্যাসের সঙ্গে পরিচিত হয়েছে – এটাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

আমার ১৫ কিলোমিটার দৌড়ের দিন, ছেলের প্রথম ১ কিলোমিটার অংশগ্রহণ এবং পুরস্কার পাওয়ার আনন্দ।

আমি কখনো চাই না আমার সন্তান শুধু একজন ভালো রানার হোক। আমি চাই, সে একজন সুস্থ, শৃঙ্খলাবদ্ধ এবং ইতিবাচক মানুষ হয়ে উঠুক। কারণ জীবনে জয় মানে সব সময় প্রথম হওয়া নয়; অনেক সময় শেষ পর্যন্ত লেগে থাকাটাই সবচেয়ে বড় সাফল্য।
এই চার বছরে আমি আরও একটি বিষয় খুব স্পষ্টভাবে বুঝেছি, হাঁটা কিংবা ম্যারাথন একা সুস্থ থাকার নিশ্চয়তা দেয় না। এর সঙ্গে দরকার সুষম খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত ঘুম, পর্যাপ্ত পানি, বিশ্রাম, মানসিক প্রশান্তি এবং শরীরের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ। সুস্থতা কোনো এক দিনের প্রকল্প নয়; এটি প্রতিদিনের একটি অভ্যাস।
আজও আমি নতুন কোনো ইভেন্টে নিবন্ধন করলে জয়ের কথা ভাবি না। ভাবি, আরেকটি সুন্দর সকাল হবে। নতুন কিছু মানুষের সঙ্গে পরিচয় হবে। নিজের সীমাকে আরেকটু জানার সুযোগ হবে।
আমার সামনে এখনো একটি ছোট্ট স্বপ্ন আছে, একদিন হাফ ম্যারাথন, অর্থাৎ ২১.১ কিলোমিটার সফলভাবে শেষ করা। কবে পারব, সেটি জানি না। তবে তাড়াহুড়োও নেই। কারণ এই যাত্রায় আমি শিখেছি, গন্তব্যের চেয়ে পথচলাটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

“I AM FINISHER” – অন্যকে হারানোর নয়, নিজের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণের আনন্দ।

আজ আমার বুকশেলফে সাজানো মেডেলগুলো অনেকের চোখে হয়তো কয়েকটি ধাতব স্মারক। কিন্তু আমার কাছে প্রতিটি মেডেল একটি গল্প। প্রতিটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি ভোর, একটি সিদ্ধান্ত, কিছু প্রিয় মানুষের অনুপ্রেরণা, কিছু ক্লান্তি, কিছু হাসি এবং নিজের সঙ্গে করা একটি নীরব প্রতিশ্রুতি।

পেছনে ফিরে তাকালে বুঝতে পারি, আমি কখনো ম্যারাথন জেতার জন্য দৌড়াইনি। আমি দৌড়েছি নিজেকে একটু ভালো রাখার জন্য, নিজের সীমাকে একটু একটু করে বিস্তৃত করার জন্য।
আজও কেউ যদি আমাকে জিজ্ঞেস করেন, “ম্যারাথন শুরু করতে কী লাগে?” আমি খুব সহজ একটি উত্তর দেব – এক জোড়া আরামদায়ক জুতা, নিজের জন্য প্রতিদিন একটু সময়, আর প্রথম পদক্ষেপ নেওয়ার সাহস।
আর একটি বিষয় অবশ্যই মনে রাখতে হবে – শরীর যদি সায় না দেয়, জোর করে কোনো ইভেন্ট শেষ করার প্রয়োজন নেই। একটু থামুন, পানি পান করুন, বিশ্রাম নিন। প্রয়োজনে সেদিন শেষ না করেও ফিরে আসুন। পরেরবার আবার চেষ্টা করা যাবে। ভালো করতে গিয়ে যেন উল্টো ক্ষতি না হয়।
কারণ জীবনের বড় পরিবর্তনগুলো কখনো একদিনে আসে না। সেগুলো শুরু হয় খুব ছোট একটি সিদ্ধান্ত থেকে। আমার জীবনে সেই সিদ্ধান্তটি ছিল – একদিন ঘর থেকে বের হয়ে হাঁটা শুরু করা।

“ছোট ছোট পদক্ষেপই একদিন বড় গন্তব্যে পৌঁছে দেয়।”

 

লেখক: মো: কামরুল ইসলাম

ব্যাংকার

- Advertisement -spot_img
  • সর্বশেষ
  • পঠিত