“শহীদ ওয়াসিম: স্মৃতিতে, সংগ্রামে ও প্রেরণায়”
“সাধারণ শিক্ষার্থীদের পাশে আছে আমার প্রাণের সংগঠন। আমি এই পরিচয়েই শহীদ হবো।” মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের ইচ্ছায় এই ফেসবুক স্ট্যাটাসের ঠিক ১৬ ঘণ্টা পরই ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই শহীদ হয়েছিলেন ছাত্রদল নেতা ওয়াসিম আকরাম। বীর চট্টলার প্রথম শহীদ। জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের একজন নিবেদিতপ্রাণ কর্মী । শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আর্দশের সূর্য সৈনিক। জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল চট্টগ্রাম কলেজ আহ্বায়ক কমিটির অন্যতম সদস্য শহীদ ওয়াসিম আকরাম। শহীদ জিয়া স্মৃতি পাঠাগারের ১২৫৫ নং সদস্য ছিলেন শহীদ ওয়াসিম।
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের শুরু থেকেই সক্রিয় ছিলেন ছাত্রদলনেতা ওয়াসিম আকরাম । সে নগরীর প্রতিটি কর্মসূচিতে অংশ নিতো। আন্দোলন ধীরে ধীরে সহিংস হয়ে উঠলেও দমে যাননি স্বৈরাচারবিরোধী অকুতোভয় এ বীর সেনানী। বরং অন্য সহযোদ্ধাদের মতোই আরো বেশি সংগ্রামী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মধ্য জুলাইয়ে পরিস্থিতি যখন মারমুখী হয়ে ওঠে। তখন ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই দুপুর থেকে বার আউলিয়ার পূণ্য ভূমি বীর চট্টলার বিভিন্ন মোড়ে অবস্থান নেয় ফ্যাসিস্ট খুনী হাসিনার ছাত্রলীগ ও যুবলীগের অস্ত্রধারী হেলমেট বাহিনী। বিকেল ৩টা থেকে নগরীর মুরাদপুর, ২ নং গেট ও ষোলশহরের আশপাশের এলাকায় কোটা আন্দোলনকারীদের সাথে ছাত্রলীগ-যুবলীগ ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষের শুরুতে লাঠিপেটা করা হলেও, পরে গুলিবর্ষণ করে পুলিশসহ ছাত্রলীগ -যুবলীগের ক্যাডার বাহিনী । এ সময় পুলিশের সাথে সাদা পোষাকের কয়েকজন অস্ত্রধারীকেও দেখা যায। বেশ কিছু ককটেলও বিস্ফোরিত হয়। আন্দোলনকারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে এদিক-সেদিক ছুটোছুটি শুরু করে। পরে তারা ইট পাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকে। এভাবে অনেক্ষণ চলতে থাকে ধাওয়া পাল্টা-ধাওয়া। পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়। শিক্ষার্থীদের অনেকে অলিগলিতে ঢুকে পড়লে সেখানেও খুঁজে বের করে হামলা করা হয়। ১৬ জুলাই বেলা ৩টার দিকে চট্টগ্রামের মুরাদপুর এলাকায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশ ও ছাত্রলীগের দ্বিমুখী সংঘর্ষে দুপক্ষের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার একপর্যায়ে গুলিবিদ্ধ হন ওয়াসিম। পরে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। একই সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে শাহাদাৎ বরণ করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফয়সাল আহমেদ শান্ত এবং কাঠ ব্যবসায়ী মো. ফারুক। একইদিনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) শিক্ষার্থী আবু সাঈদ পুলিশের গুলিতে শহীদ হন। যা বাংলাদেশ সহ সারাবিশ্ব বিবেক কে নাড়িয়ে দিয়েছিলো। টেলিভিশন চ্যানেলে ফুটেজে স্পষ্ট দেখা যায় আবু সাঈদ বুক পেতে দিয়েছে আর পুলিশ গুলি করছে। সারা দুনিয়ায় এমন নির্মম হত্যাকাণ্ডে নিন্দার ঝড় উঠে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আবু সাঈদ প্রথম শহীদ আর বীর চট্টলার প্রথম সারা দেশে দ্বিতীয় শহীদ ওয়াসিম আকরাম।
চট্টগ্রাম কলেজের সমাজবিজ্ঞান অনুষদে স্নাতক তৃতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত ছিলেন শহীদ ওয়াসিম আকরাম । তিনি চকবাজার এলাকার একটি মেসে থেকে পড়াশোনার পাশাপাশি জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সক্রিয় কর্মী-নেতা ছিলেন। দীর্ঘ ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনে ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা নিজেদের পরিচয়ে বুক ফুলিয়ে রাজপথে শহীদ হয়েছে। গুপ্ত রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের বহুত লম্বা লম্বা সত্য মিথ্যা বয়ান শুনতে পাওয়া যায় কিন্তু চট্টগ্রামের প্রথম শহীদ ওয়াসিম আকরামের জীবনের শেষ ফেসবুক স্ট্যাটাসও ছিলো সবাইকে ষোলশহর চলে আসার উদাত্ত আহ্বান। খুনি হাসিনার লেলিয়ে দেওয়া ছাত্রলীগ-যুবলীগ হেলমেট বাহিনীর হাতে শহীদ হন কোরআনে হাফেজ কক্সবাজার জেলার পেকুয়া সদর ইউনিয়নের দক্ষিণ মেহেরনামা বাজার এলাকার প্রবাসী শফিউল আলমের মেঝ ছেলে। ওয়াসিমের বাবা তখন প্রবাসী ছিলেন। তৎকালীল মধ্যপ্রাচ্যের কাতারে একটি কোম্পানিতে চাকুরি করতেন। বর্তমানে দেশেই আছেন শহীদ ওয়াসিম আকরামের গর্বিত পিতা। পিতামাতার ৫ সন্তানের মাঝে ওয়াসিম দ্বিতীয় সন্তান। সবাই গ্রামের বাড়িতে থাকেন। বড় ভাই মহিউদ্দিন চাকুরি করেন। ছোট আরো এক ভাই ও দুই বোন পড়াশোনা করে।
শহীদ আবু সাঈদ ও শহীদ ওয়াসিম আকরামের মৃতুর পর চট্টগ্রাম সহ সারা দেশের বৈষম্যবিরোধী ছাত্রআন্দোলন নতুন গতি পায় এবং সেদিন থেকেই গণঅভ্যুত্থান আরও একধাপ এগিয়ে যায়। খুনি হাসিনার রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ওই রাতেই চট্টগ্রাম কলেজ ক্যাম্পাসে ওয়াসিমের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে তার মরদেহ গ্রামের বাড়ি কক্সবাজার জেলার পেকুয়ার দক্ষিণ মেহেরনামা গ্রামে দাফন করা হয়।
ওয়াসিমের জানাজা-দাফন থেকেও পরিবার ছিল বিচ্ছিন্ন। ক্ষমতালোভী আওয়ামী হায়েনার দল গদি রক্ষা করার জন্য কি করে নাই। নিরীহ ছাত্র জনতার উপর অবাধে গুলিবর্ষণ, নিষ্পাপ শিশু সহ রাস্তায় পড়ে থাকা সারি সারি লাশ। মানুষের বিবেক নাড়িয়ে দিয়েছিলো। রাজপথ তখন ছিলো মুক্তিকামী ছাত্র-জনতার। তৎকালীন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমানের নেতৃত্বে ফ্যাসিস্ট হাসিনা বিরোধী আন্দোলন নতুন গতির সঞ্চার করে। সারাদেশের মানুষ ডিজিটাল বাকশালী খুনি হাসিনার পতন নিশ্চিত করে বিজয়ী হয়েই ঘরে ফিরে আসে। ৩৬ জুলাই (৫ আগষ্ট )খুনী হাসিনার ভারতে পলায়নের মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় স্বাধীনতা লাভ করে প্রিয় মাতৃভূমি । এদেশ ফ্যাসিস্ট মুক্ত হয়। তারেক রহমানের নেতৃত্বে ছাত্রদল যুবদল বিএনপির হাজার হাজার নেতা-কর্মীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয় দ্বিতীয় স্বাধীনতা। গুপ্ত নয় বিএনপির নেতা-কর্মীরা নিজেদের পরিচয়েই রাজনীতি করেছে। রাজপথে বুকের তাজা রক্তে শাহাদাৎ বরণ করেছে প্রিয় জন্মভূমিকে ফ্যাসিবাদ মুক্ত করতে।
২০২৬ সালের ১৬ জুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম কক্সবাজার সফরের সময় শহীদ ওয়াসিমের পরিবারের সদস্যদের সাথে নিয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ ওয়াসিম আকরামের কবর জিয়ারত করেছেন। রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনে শত ব্যবস্হার মাঝেও নিজ দলের কর্মীদের কথা স্বরণ রেখেছেন সবার আগে বাংলাদেশ স্লোগান হ্নদয়ে ধারণ করে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
শহীদ ওয়াসিম আকরাম নিজের জীবন উৎসর্গ করে খুনী হাসিনা বিরোধী আন্দোলন ত্বরান্বিত করে প্রিয় স্বদেশকে ফ্যাসিস্ট মুক্ত করে গেছেন। শহীদ ওয়াসিমকে হারিয়ে জাতি হারাল এক দেশপ্রেমিক মেধাবী ছাত্র। ছাত্রদল হারাল দলের একজন নিবেদিত অর্গানাইজার দল প্রেমিক ছাত্রনেতা। পিতা-মাতা হারাল তাদের পরিবারের আশার আলোকে। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হাতেগড়া সংগঠন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের গর্ব শহীদ ওয়াসিম আকরাম। ওয়াসিমকে হারানোর এই বেদনা আমাকে আমৃত্যু বয়ে বেড়াতে হবে। তবে ওয়াসিমের ত্যাগ শ্রমেই আমরা আজ মুক্ত। এ জাতি চিরকাল ওয়াসিমদের স্মরণে রাখবে। সবার মুখে মুখে থাকবে ওয়াসিমের সেই সাহসী বার্তা ‘চলে আসুন ষোলশহর।’
যতোদিন বাংলাদেশ রবে, ততোদিন রয়ে যাবে জুলাইয়ের গর্বিত শহীদ ওয়াসিম আকরামের নাম। ইতিহাসের স্বর্ণাক্ষরে লিখা থাকবে শহীদ ওয়াসিমের দলের প্রতি দায়িত্ববোধের কথা। নিজের পরিচয়ে রাানীতির কথা। গুপ্ত রাজনৈতিক শক্তির শরীরে আগুন জ্বালিয়ে যাবে যুগে যুগে। ১৬ জুলাই ২০২৬ শহীদ ওয়াসিম আকরামের দ্বিতীয় মৃত্যু বার্ষিকীতে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন জান্নাতের উচ্চ মাকাম দান করুন এ অকুতোভয় বীর যোদ্ধা কে – আমিন।
লেখক: সাবেক সহ-দপ্তর সম্পাদক,
চট্টগ্রাম মহানগর যুবদল।
মোবাইল: ০১৮১৯৬১৭৩৮০
E-mail: zahir.affable@gmail.com

