রাউজানের গর্ব, দেশের অহংকার, গণস্বাস্থ্য আন্দোলনের অগ্রদূত ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর ৩য় মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ২০২৩ সালের ১১ এপ্রিল ঢাকার গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন। তাঁর প্রয়াণে জাতি হারিয়েছে এক দূরদর্শী চিন্তাবিদ, সাহসী মুক্তিযোদ্ধা এবং মানবতার অকৃত্রিম সেবককে।

১৯৪১ সালের ২৭ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার কর্ণফুলী নদীতীরবর্তী কোয়েপাড়া গ্রামে তাঁর জন্ম। শিক্ষাজীবনে মেধার স্বাক্ষর রেখে তিনি ঢাকার নবকুমার ইনস্টিটিউশন ও ঢাকা কলেজ থেকে পড়াশোনা শেষে ১৯৬৪ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে যুক্তরাজ্যের রয়্যাল কলেজ অব সার্জনসে উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণের সময়ই ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁকে তিনি নিজেকে আবিষ্কার করেন।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি বিলেতে স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবন ত্যাগ করে দেশের ডাকে সাড়া দেন। ভারতে গিয়ে গেরিলা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন এবং ত্রিপুরার মেলাঘরে ডা. এম এ মবিনের সঙ্গে যৌথভাবে ৪৮০ শয্যার “বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতাল” প্রতিষ্ঠা করেন। সীমিত সম্পদে গড়ে ওঠা এই হাসপাতাল ছিল মুক্তিযোদ্ধা ও শরণার্থীদের চিকিৎসার এক অনন্য আশ্রয়স্থল। নারীদের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় প্রশিক্ষিত করে তিনি যে মডেল তৈরি করেছিলেন, তা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পায় এবং বিশ্বখ্যাত মেডিকেল জার্নাল ল্যানসেট-এ প্রকাশিত হয়।
স্বাধীনতার পর তাঁর চিন্তা ও কর্মে গড়ে ওঠে ‘গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র’ একটি অনন্য স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান, যা গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় চিকিৎসা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক ভূমিকা পালন করে।
“চল গ্রামে যাই” এই স্লোগানকে ধারণ করে তিনি স্বাস্থ্যসেবাকে শহরকেন্দ্রিকতা থেকে বের করে গ্রামমুখী করার আন্দোলন গড়ে তোলেন।
১৯৮২ সালে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ‘জাতীয় ঔষধ নীতি’ প্রণয়নে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দেশের স্বাস্থ্যখাতে যুগান্তকারী পরিবর্তন আনে। সুলভ মূল্যে মানসম্পন্ন ওষুধ নিশ্চিত করার এই নীতি আজও বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত।
ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী শুধু চিকিৎসক নন, তিনি ছিলেন একজন প্রখর রাজনৈতিক চিন্তাবিদ ও সমাজসংস্কারক। মানুষের মৌলিক অধিকার, বিশেষত স্বাস্থ্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় তিনি আজীবন সোচ্চার ছিলেন। তাঁর লেখালেখির মধ্যেও ফুটে উঠেছে জনস্বাস্থ্য ও নীতিনির্ধারণী চিন্তা—বিশেষ করে “The Politics of Essential Drugs: The Makings of a Successful Health Strategy: Lessons from Bangladesh” গ্রন্থটি বিশ্বব্যাপী সমাদৃত।
তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ১৯৭৭ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়া রামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার (১৯৮৫), রাইট লাইভলিহুড অ্যাওয়ার্ড (১৯৯২), ‘ইন্টারন্যাশনাল হেলথ হিরো’ (২০০২) সহ বহু আন্তর্জাতিক সম্মাননায় ভূষিত হন। মানবকল্যাণে অনন্য অবদানের জন্য ২০২৬ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করে।
জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত তিনি সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবা, ন্যায়ভিত্তিক সমাজব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্যখাতের সংস্কার নিয়ে নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন। কিডনি জটিলতাসহ নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগলেও তাঁর কর্মস্পৃহা কখনো থেমে থাকেনি।
ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর জীবন আমাদের শিখিয়ে দেয়—একজন মানুষের দৃঢ় সংকল্প, দেশপ্রেম ও মানবিকতা কিভাবে একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণে প্রভাব ফেলতে পারে। তাঁর আদর্শ, সংগ্রাম ও ত্যাগ নতুন প্রজন্মের জন্য এক উজ্জ্বল প্রেরণা হয়ে থাকবে।
রাউজানের এই সূর্যসন্তানের ৩য় মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধায় তাঁকে স্মরণ করছি। মহান আল্লাহ তাঁর সকল নেক আমল কবুল করুন এবং তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসীব করুন—এই প্রার্থনাই সমগ্র জাতির।
লেখক: সভাপতি, রাউজান প্রেসক্লাব, রাউজান, চট্টগ্রাম।

