শুক্রবার, এপ্রিল ১৭, ২০২৬

টাইম ম্যাগাজিনকে তারেক রহমান

পরিকল্পনার ৩০ শতাংশ বাস্তবায়ন করতে পারলেও জনসমর্থন পাব

নিজস্ব প্রতিবেদক

১৭ বছর নির্বাসন শেষে দেশে ফিরে তারেক রহমান এখন বাংলাদেশের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে। তার সাক্ষাৎকার নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রভাবশালী সাময়িকী টাইম ম্যাগাজিন। গতকাল বুধবার তা প্রকাশিত হয়। একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি দেশের রাজনীতি, বিচার বিভাগ, কর্মসংস্থান, আওয়ামী লীগের রাজনীতি, গণঅভ্যুত্থান, নির্বাচনসহ সমসাময়িক বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান মনে করেন, নিজের পরিকল্পনার ‘মাত্র ৩০ শতাংশ’ বাস্তবায়ন করতে পারলেও দেশের মানুষের সমর্থন পাবেন তিনি।

দেশে ফেরার পর তারেক রহমানের প্রথম এই সাক্ষাৎকারটি প্রকাশ করে টাইম ম্যাগাজিন। সাক্ষাৎকারে নিজের দেশে ফেরার উদ্দেশ্য, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, নিজের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত দুর্নীতির মামলা, শেখ হাসিনার শাসনামল, আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করাসহ নানা বিষয়ে কথা বলেন তিনি।

দেড় যুগ পর গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর লন্ডন থেকে দেশে ফেরা তারেক রহমান জানান, তার শরীর এখানকার (বাংলাদেশের) আবহাওয়ার সঙ্গে ধীরে ধীরে মানিয়ে নিচ্ছে। নিজের ব্যক্তিত্বের একটি উদাহরণ দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি আসলে খুব বেশি কথা বলতে পারি না। কিন্তু কেউ যদি আমাকে কোনো কাজ দেন, আমি আমার সেরাটা দিয়ে সেটা করার চেষ্টা করি।’

দেশে ফেরার পাঁচ দিন পর তারেক রহমান তার মা বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে হারান। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমার হৃদয়টা ভীষণ ভারি হয়ে আছে। কিন্তু তার কাছ থেকে আমি যে শিক্ষা পেয়েছি, তা হলো—আপনার ওপর যদি কোনো দায়িত্ব এসে পড়ে, তাহলে সেটা আপনাকে পালন করতেই হবে।’

টাইমের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে তারেক রহমান বলেন, দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। দেশের মানুষ তাকে যে আস্থা দিয়েছে, সেটাই তার রাজনীতিতে থাকার প্রধান কারণ। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ‘মা-বাবার বদৌলতে নয়, বিএনপির সমর্থকদের জন্যই আমি বর্তমান অবস্থানে এসেছি।’

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে তারেক রহমান পরিষ্কারভাবে এগিয়ে থাকা প্রার্থী। সাম্প্রতিক জনমত জরিপ অনুযায়ী, তার নেতৃত্বাধীন বিএনপির প্রতি প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটারের সমর্থন রয়েছে, যেখানে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর জনসমর্থন মাত্র ১৯ শতাংশ।

তবে একই সঙ্গে উঠে এসেছে উদ্বেগও। অতীতে বিএনপির শাসনামলে দুর্নীতির অভিযোগ, বিশেষ করে বিদ্যুৎ খাতের দুর্নীতির বিতর্ক এখনো তাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে। তারেক রহমান সব ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, আগের মামলাগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল এবং অন্তর্বর্তী সরকার সেগুলো বাতিল করেছে। তবে এটিও সত্য যে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগকে একটি অনুগত সংবাদমাধ্যম সহায়তা করেছিল, যারা অন্ধভাবে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছিল। তারেক রহমান বলেন, কেউ অপরাধ করলে বিচার হবে, কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিহিংসা দিয়ে দেশ চালানো যাবে না।

টাইম ম্যাগাজিনের প্রায় ৩ হাজার ৩০০ শব্দের বিশাল প্রতিবেদনে বাংলাদেশের সামগ্রিক পরিস্থিতিও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, টাকার দুর্বল মান, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট এবং যুব বেকারত্ব বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রতি বছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ কর্মবাজারে প্রবেশ করলেও সেই অনুপাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না—এ বিষয়টি তারেক রহমানের জন্য বড় পরীক্ষা বলে উল্লেখ করেছে টাইম।

নীতিগতভাবে তারেক রহমানকে একজন ‘টেকনোক্রেটিক’ রাজনীতিক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। তিনি খাল খনন, ব্যাপক বৃক্ষরোপণ, ঢাকায় নতুন সবুজ অঞ্চল তৈরি, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন, দক্ষতা উন্নয়ন এবং বেসরকারি খাতের সঙ্গে স্বাস্থ্য খাতে অংশীদারত্বের পরিকল্পনার কথা বলেছেন। তারেক রহমানের বিশ্বাস, এসব পরিকল্পনার ৩০ শতাংশ বাস্তবায়ন করতে পারলেও জনগণ তাকে সমর্থন করবে।

প্রতিবেদনে শেখ হাসিনাকে স্বৈরাচারী উল্লেখ করে তার পতনের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক রূপান্তর, ছাত্র আন্দোলন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং ইসলামপন্থি রাজনীতির উত্থান নিয়েও বিস্তারিত আলোকপাত করা হয়। এতে বলা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার প্রচেষ্টা এখনো অসম্পূর্ণ এবং নির্বাচন-পরবর্তী বাংলাদেশ কোন পথে যাবে, সেটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

তারেক রহমান বলেন, ‘আন্দোলনে যারা প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের প্রতি আমাদের একটি গুরু দায়িত্ব রয়েছে। আমাদের সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে কাজ করতে হবে, ঐক্যবদ্ধ হতে হবে, যাতে মানুষ তাদের রাজনৈতিক অধিকার পেতে পারে।’

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বাংলাদেশি পণ্যে ২০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছেন। এ বিষয়ে তারেক রহমান বলেন, তিনি দেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে এবং সম্ভাব্য উপায়ে বোয়িং বিমান এবং মার্কিন জ্বালানি অবকাঠামো কিনে প্রতিকারের জন্য আলোচনার উপায় অনুসন্ধান করছেন। তিনি বলেন, ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প তার দেশের স্বার্থ দেখবেন। আমি আমার দেশের স্বার্থ দেখব। কিন্তু আমরা একে অপরকে সহায়তাও করতে পারি। আমি নিশ্চিত, ট্রাম্প খুবই যুক্তিসংগত মানুষ।’

বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার হবে আইনের শাসন নিশ্চিত করা। মানুষ যাতে রাস্তায় নিরাপদে থাকে, ব্যবসা করার জন্য নিরাপদ থাকে, তা নিশ্চিত করা।’

তারেক রহমান নিজেকে তুলনামূলকভাবে নরম ও শ্রোতামনস্ক নেতা হিসেবে উপস্থাপন করছেন। একই সঙ্গে তিনি রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার বিরোধিতা করে বলেন, আজ কাউকে নিষিদ্ধ করলে কাল আমাকেও নিষিদ্ধ করা হবে না, তার নিশ্চয়তা কী? অবশ্য যদি কেউ কোনো ধরনের অপরাধের জন্য দায়ী হয়, তাকে অবশ্যই পরিণতি ভোগ করতে হবে।

টাইম ম্যাগাজিনের মূল্যায়নে তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের রাজনীতিতে আশার সঞ্চার করেছে ঠিকই, তবে অতীতের ভার, দলীয় শৃঙ্খলা এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতা—এই তিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে না পারলে সেই আশা দ্রুতই ম্লান হয়ে যেতে পারে।

প্রতিবেশী ভারত, দুই দেশের আমদানি-রপ্তানি, ট্রানজিটসহ বিভিন্ন বিষয়ে তারেক রহমান বলেন, আমাদের জনগণ ও দেশের স্বার্থ রক্ষা করাই অগ্রাধিকার। এরপর আমরা সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করব।

প্রতিবেদনের শেষাংশে তারেক রহমান স্পাইডার ম্যান সিনেমার একটি সংলাপ উদ্ধৃত করে বলেন, ‘বড় ক্ষমতার সঙ্গে বড় দায়িত্বও আসে। আমি মনেপ্রাণে এটি বিশ্বাস করি।’

 

 

 

- Advertisement -spot_img
  • সর্বশেষ
  • পঠিত