শুক্রবার, এপ্রিল ১৭, ২০২৬

‘মা হারানোর শোক যেন শক্তি হয় তারেক রহমানের’

এস এম পিন্টু

চেরাগি নিউজ ডেস্ক

মায়ের মৃত্যু কেবল একটি পারিবারিক শোক নয়, বিশেষ করে যখন সেই মা হয়ে ওঠেন একটি জাতির রাজনৈতিক ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বেগম খালেদা জিয়া শুধু তারেক রহমানের জন্মদাত্রী মা নন, তিনি ছিলেন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের এক অবিচল প্রতীক, একজন আপসহীন নেত্রী, যিনি ক্ষমতার মোহের চেয়ে জনগণের অধিকারকে বড় করে দেখেছেন। সেই মায়ের বিদায় তারেক রহমানের জীবনে এক গভীর শূন্যতা তৈরি করলেও, এই শোক যদি শক্তিতে রূপান্তরিত হয়, তবে তা শুধু ব্যক্তিগত পুনর্জাগরণ নয়, তা হতে পারে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা।
মানুষ যখন জীবনের সবচেয়ে বড় আশ্রয় হারায়, তখন সে ভেঙে পড়ে অথবা আরও দৃঢ় হয়। ইতিহাস বলে, বড় নেতৃত্ব অনেক সময়ই জন্ম নেয় গভীর বেদনার ভেতর দিয়ে। তারেক রহমানের রাজনৈতিক জীবন কখনোই সহজ ছিল না। রাষ্ট্রপতির সন্তান হওয়া, প্রধানমন্ত্রীর পুত্র হওয়া, এই পরিচয় যেমন তাকে সামনে এনেছে, তেমনি তৈরি করেছে সন্দেহ, সমালোচনা ও অবিশ্বাসের পাহাড়। কিন্তু এই উত্তরাধিকারই তার রাজনৈতিক পথকে মসৃণ করেনি; বরং প্রতিটি পদক্ষেপে তাকে প্রমাণ করতে হয়েছে তিনি কেবল “কারো সন্তান” নন, তিনি নিজস্ব চিন্তা ও অবস্থানের একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব।


মায়ের ছায়া তারেক রহমানের রাজনীতিতে ছিল নীরব কিন্তু গভীর। খালেদা জিয়া কখনো প্রকাশ্যে তাকে ‘উত্তরসূরি’ ঘোষণা করেননি, আবার আড়ালেও তাকে দূরে ঠেলে দেননি। তিনি জানতেন, রাজনীতিতে উত্তরাধিকার কাগজে নয়, তা প্রতিষ্ঠিত হয় ত্যাগ, সহনশীলতা ও সময়ের পরীক্ষায়। সেই শিক্ষাই ছিল তারেক রহমানের সবচেয়ে বড় পুঁজি। আজ সেই শিক্ষকের অনুপস্থিতি তাকে যেমন একাকী করেছে, তেমনি দিয়েছে আত্মনির্ভর হওয়ার কঠিন দায়িত্ব।
শোক মানুষকে ভেতরে ঢুকতে বাধ্য করে। রাজনীতিতে যিনি দীর্ঘ সময় প্রবাসে থেকেছেন, মামলা-নির্যাতন, চরিত্রহননের প্রচেষ্টা, দলীয় ভাঙন ও বিভ্রান্তির ভেতর দিয়ে গেছেন, তাঁর জন্য মায়ের মৃত্যু হতে পারে আত্মসমালোচনার এক গভীর মুহূর্ত। এই মুহূর্তে তারেক রহমান যদি শোককে কেবল আবেগে সীমাবদ্ধ না রেখে রাজনৈতিক পরিশুদ্ধির শক্তিতে রূপ দেন, তবে সেটিই হবে তার মায়ের প্রতি সবচেয়ে বড় শ্রদ্ধা।
বাংলাদেশের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে প্রতিহিংসা, বিভাজন ও ক্ষমতার নগ্ন লড়াইয়ের শিকার। এখানে নেতৃত্ব মানেই নিরাপত্তা নয়, বরং ঝুঁকি। খালেদা জিয়া সেই ঝুঁকিকে ভয় পাননি। তিনি কারাবরণ করেছেন, অসুস্থ শরীরেও নতি স্বীকার করেননি। এই দৃঢ়তার উত্তরাধিকার তারেক রহমানের রক্তে থাকলেও, এখন প্রয়োজন সেই দৃঢ়তাকে নতুন প্রজন্মের ভাষায় রূপান্তর করা। শোকের ভেতর দিয়ে যদি তিনি সহনশীলতা শেখেন, প্রতিশোধের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসার শক্তি পান, তবে তাঁর নেতৃত্ব আরও পরিণত হবে।
মায়ের মৃত্যু রাজনীতিবিদকে নরম করে, কিন্তু সেই নরমতা দুর্বলতা নয়, বরং মানবিকতা। তারেক রহমান দীর্ঘদিন ধরে যেসব অভিযোগ, বিতর্ক ও কুৎসার মুখোমুখি হয়েছেন, সেখানে অনেক সময় তার ভাবমূর্তি নির্মম রাজনীতির শিকার হয়েছে। এখন সময় এসেছে সেই কঠোর ইমেজ ভেঙে একজন শোকাহত পুত্র, একজন দায়িত্ববান নাগরিক ও একজন ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রনায়কের মানবিক রূপ সামনে আনার। মানুষ নেতা চায়, কিন্তু হৃদয়হীন নেতা নয়।


একটি জাতির ইতিহাসে কিছু মুহূর্ত থাকে, যা ব্যক্তি ও রাষ্ট্রকে এক সুতোয় বেঁধে ফেলে। খালেদা জিয়ার মৃত্যু তেমনই এক মুহূর্ত হতে পারে, যদি তারেক রহমান এটিকে কেবল পারিবারিক বেদনা না ভেবে রাজনৈতিক আত্মশুদ্ধির উপলক্ষ করেন। গণতন্ত্র, ভোটাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, এই মূল্যবোধগুলো তাঁর মায়ের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু ছিল। শোকের শক্তি যদি তাকে এই মূল্যবোধে আরও দৃঢ় করে, তবে বিএনপির রাজনীতি যেমন নতুন প্রাণ পাবে, তেমনি বাংলাদেশের গণতন্ত্রও এক নতুন আশার আলো দেখবে।
মা হারানোর শোক অনেক সময় মানুষকে নীরব করে দেয়, আবার কখনো উচ্চকণ্ঠ করে তোলে। তারেক রহমান কোন পথ নেবেন, নীরবতার, না দায়িত্বশীল উচ্চকণ্ঠতার, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। তবে ইতিহাস বলে, যে শোককে শক্তিতে রূপ দিতে পারে, সে-ই প্রকৃত নেতা হয়ে ওঠে। এই শোক যদি তাকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, আরও দূরদর্শী এবং আরও গণমুখী করে তোলে, তবে সেটাই হবে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের শেষ কিন্তু সবচেয়ে গভীর উত্তরাধিকার।
শেষ পর্যন্ত রাজনীতি মানুষের জন্য। মায়ের মৃত্যু তাকে যদি মানুষের কাছাকাছি আনে, অহংকার ভেঙে দায়িত্বের ভার বাড়ায়, তবে এই বেদনা বৃথা যাবে না। কারণ কোনো মা-ই চান না তার সন্তান শোকে হারিয়ে যাক; বরং চান সেই শোক থেকেই জন্ম নিক শক্তি, প্রজ্ঞা ও নতুন পথচলা।
খালেদা জিয়ার আদর্শ বনাম বর্তমান বাস্তবতা:
নির্বাচনের সময় একজন নেতার সামনে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা। দীর্ঘদিন ধরে ভোটাধিকার প্রশ্নবিদ্ধ হলে মানুষ শুধু দল নয়, পুরো রাজনৈতিক ব্যবস্থার ওপর বিশ্বাস হারায়। তারেক রহমানের সামনে এই আস্থা পুনর্গঠনের দায়িত্ব তাই শুধু বিএনপির নেতা হিসেবে নয়, গণতন্ত্রে বিশ্বাসী একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে। মা হারানোর শোক তাকে যদি আরও সংবেদনশীল করে তোলে, তবে সেই সংবেদনশীলতা মানুষের ভয়ের ভাষা বুঝতে সাহায্য করবে, যে ভয় মানুষকে ভোটকেন্দ্র থেকে দূরে রাখে।
নির্বাচনী দায়িত্বের আরেকটি কঠিন দিক হলো তরুণ সমাজকে যুক্ত করা। বাংলাদেশের তরুণরা রাজনীতি নিয়ে হতাশ, আবার ক্ষুব্ধও। তারা পরিবর্তন চায়, কিন্তু অতীতের সংঘাত ও ব্যর্থতার পুনরাবৃত্তি চায় না। তারেক রহমানের জন্য এটি এক বড় পরীক্ষা, তিনি কি তরুণদের সামনে কেবল অতীতের স্মৃতি তুলে ধরবেন, নাকি শোকের মধ্য দিয়ে অর্জিত নতুন উপলব্ধি দিয়ে ভবিষ্যতের রূপরেখা দেবেন? মায়ের জীবন ও সংগ্রাম থেকে পাওয়া শিক্ষা যদি তিনি তরুণদের ভাষায় উপস্থাপন করতে পারেন, তবে এই প্রজন্ম তাকে শুধু উত্তরাধিকারী হিসেবে নয়, একজন সময়োপযোগী নেতা হিসেবে গ্রহণ করবে।
নির্বাচনের সময় শৃঙ্খলা রক্ষা করাও একটি নীরব কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। রাজনৈতিক কর্মীদের আচরণ অনেক সময় নেতার ব্যক্তিত্বের প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে। শোকাহত নেতা যদি প্রতিহিংসার ভাষা ব্যবহার করেন, তা কর্মীদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে। আবার যদি তিনি সংযম, সহনশীলতা ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধার বার্তা দেন, সেটিও তৃণমূল পর্যন্ত পৌঁছে যায়। তারেক রহমানের জন্য এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, শক্ত অবস্থান আর দায়িত্বশীল আচরণের মধ্যে সঠিক ভারসাম্য তৈরি করা।
আন্তর্জাতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এই নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ। গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের প্রশ্নে বিশ্ব এখন বাংলাদেশের দিকে তাকিয়ে। তারেক রহমানের ওপর দায়িত্ব পড়ে এমন একটি রাজনৈতিক ভাষা ও কৌশল গড়ে তোলার, যা দেশের সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রেখে আন্তর্জাতিক আস্থাও তৈরি করে। শোকের সময়ে এই কূটনৈতিক দায়িত্ব পালন সহজ নয়, কিন্তু এখানেই নেতৃত্বের গভীরতা প্রকাশ পায়, যখন ব্যক্তিগত বেদনা রাষ্ট্রিক দায়িত্বকে আড়াল করতে পারে না।
মায়ের মৃত্যু তাকে স্মরণ করিয়ে দেয় ক্ষমতার ক্ষণস্থায়িত্ব। আজ যে ক্ষমতা বা বিরোধিতা, কাল তা ইতিহাস। কিন্তু দায়িত্বশীল আচরণ থেকে যায় স্মৃতিতে। নির্বাচনকালীন সময় যদি তিনি প্রতিপক্ষের প্রতি শালীনতা দেখান, মতভিন্নতাকে শত্রুতা না বানান, তবে সেটিই হবে খালেদা জিয়ার রাজনীতির নৈতিক উত্তরাধিকার বহন করার প্রমাণ। এই নৈতিক শক্তিই শোককে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত করে।
নির্বাচনের দিনগুলোতে সিদ্ধান্ত নিতে হয় দ্রুত, কিন্তু ভুলের সুযোগ থাকে না। কখন আন্দোলন, কখন সংলাপ, কখন অপেক্ষা, এই তিনের সমন্বয় করতে না পারলে বড় ক্ষতি হতে পারে। তারেক রহমানের রাজনৈতিক জীবনের এই পর্যায় তাই সবচেয়ে সংবেদনশীল। মায়ের অভাব তাকে একা করেছে, কিন্তু সেই একাকীত্ব যদি তাকে গভীর চিন্তাশীল করে তোলে, তবে সিদ্ধান্তগুলো হবে আরও পরিমিত ও দূরদর্শী।
সবশেষে, নির্বাচন শেষ হলে শোক আবার ফিরে আসবে নীরবে। তখন ক্যামেরা থাকবে না, স্লোগান থাকবে না। থাকবে শুধু দায়িত্বের হিসাব। সেই মুহূর্তে যদি তারেক রহমান দেখতে পান, তিনি একটি শান্তিপূর্ণ, অংশগ্রহণমূলক ও মর্যাদাপূর্ণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখতে পেরেছেন, তবে সেটিই হবে শোকের সবচেয়ে অর্থবহ রূপান্তর। কারণ একজন মায়ের জন্য সবচেয়ে বড় শান্তি হলো, তার সন্তান যেন কেবল সফল না হয়, দায়িত্ববানও হয়।
এইভাবেই মা হারানোর শোক তারেক রহমানের জন্য দুর্বলতা নয়, বরং শক্তির উৎস হতে পারে, যদি সেই শোক তাকে আরও মানবিক, আরও দায়িত্বশীল এবং আরও গণমুখী নেতা হিসেবে গড়ে তোলে।

লেখক: সাংবাদিক ও কবি, সভাপতি, রেলওয়ে জার্নালিস্ট এসোসিয়েশন।

- Advertisement -spot_img
  • সর্বশেষ
  • পঠিত