আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম (আইআইইউসি) ট্রাস্ট পরিচালিত ‘আইআইইউসি টাওয়ার’ থেকে প্রায় ১২ কোটি ৮০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ১৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
দুদকের উপসহকারী পরিচালক কমল চক্রবর্তী বৃহস্পতিবার (৩০ অক্টোবর) মামলাটি দায়ের করেন। দুদক চট্টগ্রামের উপপরিচালক সুবেল আহমেদ জানান, মামলায় ১৬ জনকে আসামি করা হয়েছে। তদন্তকালে আরও কারও সম্পৃক্ততা ধরা পড়লে তাদেরও আসামি করা হবে।
মামলায় প্রধান আসামি করা হয়েছে-আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য ও আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম (আইআইইউসি) বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সাবেক চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. আবু রেজা মুহাম্মদ নেজামুদ্দিন নদভীকে। তার সঙ্গে আরও আসামি হয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য প্রফেসর আনোয়ারুল আজিম আরিফ, ট্রাস্টের সাবেক সদস্য প্রফেসর ড. কাজী দ্বীন মোহাম্মদ, প্রফেসর ড. মোহাম্মদ সালেহ জহুর, ড. ইঞ্জিনিয়ার রশিদ আহমেদ চৌধুরী, রিজিয়া সুলতানা এবং মোহাম্মদ খালেদ মাহমুদ।
এ ছাড়া অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন প্রফেসর ড. মো. ফসিউল আলম, প্রফেসর মো. আব্দুর রহিম, ড. মো. শামসুজ্জামান, মোহাম্মদ বদিউল আলম, প্রফেসর ড. মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির, মুহাম্মদ শফিউর রহমান, অধ্যাপক ড. মাহি উদ্দিন, অধ্যাপক আফজল আহমদ এবং ড. মোজাফফর হোসাইন নদভী।
দুদকের এজাহারে বলা হয়েছে, ২০২১ সালের ৬ মার্চ থেকে ২০২৪ সালের ৩১ জুলাই পর্যন্ত আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে ট্রাস্টের ১২ কোটি ৭৯ লাখ ৪১ হাজার ৫৫৬ টাকা আত্মসাত করেছেন। ট্রাস্টের আইন ও বিধি উপেক্ষা করে তারা শিক্ষাবৃত্তি, দরিদ্র শিক্ষার্থীদের সহায়তা ও সমাজকল্যাণমূলক অর্থ নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেছেন।
দুদকের অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০০৫ সালে ট্রাস্ট চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকায় একটি প্লট ক্রয় করে এবং ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের সহায়তায় ১৫ তলা বাণিজ্যিক ভবন আইআইইউসি টাওয়ার নির্মাণ করে। ২০১১ সালের অক্টোবর থেকে ভবনটির বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু হয়। স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে থাকা ট্রাস্ট সদস্যরা নিয়মবহির্ভূতভাবে সম্মানী, বোনাস, ভাতা ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করেছেন।
তদন্তে দেখা গেছে, আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম (আইআইইউসি) ট্রাস্ট পরিচালিত ১৫ তলাবিশিষ্ট টাওয়ার থেকে মাসে গড়ে ৯০ লাখ টাকা আয় হয়। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, এই আয়ের একটি অংশ অবশ্যই বিশ্ববিদ্যালয় ও ছাত্রদের কল্যাণে ব্যয় করার নিয়ম রয়েছে। টাওয়ার দখলের সময় কয়েকজন কর্মকর্তা ব্যক্তিগতভাবে উল্লেখযোগ্য সুবিধা নিয়েছেন। সেখান থেকে নদভী সম্মানী হিসেবে মাসে ১০ লাখ নয় হাজার ৩৩৩ টাকা নিতেন। এর বাইরে গাড়ির জ্বালানি বাবদ নিতেন ৫০ হাজার টাকা এবং মোবাইল বিল বাবদ নিতেন সাত হাজার টাকা। এ ছাড়া দুই ঈদে উৎসব ভাতা হিসেবে প্রতিবার নিতেন ছয় লাখ ২২ হাজার ২২৩ টাকা।
কাজী দ্বীন মোহাম্মদ (ট্রাস্টি বোর্ডের ভাইস চেয়ারম্যান) সম্মানী হিসেবে ৬ লাখ ৩০ হাজার ৬৬৭ টাকা নিতেন। আনলিমিটেড জ্বালানি সুবিধা এবং মোবাইল বিল বাবদ ৩,০০০ টাকা। দুই ঈদে উৎসব ভাতা প্রতিবার ৪ লাখ ১৭ হাজার ৭৭৭ টাকা। রিজিয়া রেজা সুলতানা (ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য ও নদভীর স্ত্রী) সম্মানী হিসেবে নিতেন প্রতি মাসে ২ লাখ ৭০ হাজার ৬৬৭ টাকা। মোবাইল বিল ৩,০০০ টাকা। দুই ঈদে উৎসব ভাতা প্রতিবার ২ লাখ ২২ হাজার ২২৩ টাকা।
আইআইইউসির বেতনের পাশাপাশি টাওয়ার থেকে সম্মানী হিসেবে তৎকালীন রেজিস্ট্রার আখতারুজ্জামান কায়সারকে ৭০ হাজার, ট্রেজারার মহিউদ্দিন মাহীকে ৮৫ হাজার, ডিরেক্টর (ইনচার্জ) মাহফুজুর রহমানকে ৪০ হাজার, ইফতেখার উদ্দিনকে ২৫ হাজার, ফয়সাল আহমেদকে ২৫ হাজার, ডিরেক্টর (ইনচার্জ) ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ ইফতেখারুল আলমকে ২৫ হাজার, কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক জিয়াউর রহমানকে ২০ হাজার এবং ইংরেজি বিভাগের চেয়ারম্যান সারোয়ার আলমকে ২৫ হাজার টাকা দেওয়া হতো। ‘নদভীর লুটপাটে সহায়তাকারী’ বিবেচনায় তাদের অতিরিক্ত এ ভাতা দেওয়া হতো বলে মনে করেন বিশ্ববিদ্যালয়টির কর্মকর্তা-শিক্ষকেরা।
নিয়ম অনুযায়ী আইআইইউসির টাওয়ার কমিটির কোনো সদস্য মেডিকেল ভাতা পান না। কিন্তু রিজিয়া রেজা দুবাইয়ে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে তার জন্য টাকা পাঠাতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেন নদভী। গলব্লাডার (পিত্তথলি) অপারেশনের জন্য নদভীর স্ত্রীর জন্য টাওয়ার থেকে পাঠানো হয় ৩০ লাখ টাকা। এরপর ওই টাকা সমন্বয় করতে গিয়ে বিপাকে পড়েন কর্মকর্তারা। এ কারণে নদভী ওই সময় টাওয়ার কমিটির মিটিংয়ের রেজুলেশন সংশোধন করেন।
জুলাই ২০২২ থেকে ডিসেম্বর ২০২৩ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়-ব্যয়ের হিসাববিবরণীতে টাওয়ার থেকে কোনো আয় দেখানো হয়নি। টাওয়ার ফান্ড থেকে অনুমতি ছাড়া দুই দফায় চার লাখ ডলার সমপরিমাণ অর্থ সৌদি আরবে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া টাওয়ার থেকে প্রাপ্ত অর্থ আলাদাভাবে জমা রাখা হতো এবং পরে নয়ছয় করা হতো। তিন বছরে এইভাবে অন্তত ৩২ কোটি টাকা নয়ছয় করা হয়েছে।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০১০ এর ৪৪ (৬) ধারার লঙ্ঘন। টাওয়ারের ইসলামী ব্যাংকের স্টেটমেন্টে এটির প্রমাণ মেলে। আবার টাওয়ার থেকে প্রাপ্ত মাসিক অর্থ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফান্ডে জমা না দিয়ে আলাদাভাবে জমা রাখা হতো। এরপর এসব টাকা নয়ছয় করা হতো। তিন বছরে এভাবে অন্তত ৩২ কোটি টাকা নয়ছয় করা হয়েছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন- ২০১০ অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের সব আয় একটি মাত্র অ্যাকাউন্টে জমা হবে এবং একটি মাত্র অ্যাকাউন্ট থেকেই অর্থব্যয় হবে। এ ছাড়া এ টাওয়ারের দাতা সংস্থা ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক থেকেও বলা হয়েছিল যে, এ টাওয়ার হতে অর্জিত অর্থ শুধু আইআইইউসি’র উন্নয়ন ও শিক্ষার্থীদের কল্যাণে ব্যবহৃত হবে।
নদভীকে গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর রাজধানীর উত্তরা থেকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ গ্রেপ্তার করে। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর নদভীর বিরুদ্ধে গত বছরের অক্টোবরে চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় একটি হত্যাচেষ্টার মামলা হয়। ওই মামলায় তিনি ছাড়াও তাঁর ভাতিজা মাদার্শা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আ ন ম সেলিম চৌধুরীসহ আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের ৪৯ নেতা-কর্মীকে আসামি করা হয়।
মামলার বাদী সাতকানিয়া উপজেলার কেঁওচিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা ও বিএনপি নেতা মো. মোস্তাফিজুর রহমান। বর্তমানে ড. আবু রেজা মুহাম্মদ নেজামুদ্দিন নদভী চট্টগ্রাম জেলা কারাগারে বন্দি আছেন। তার স্ত্রীসহ অন্যান্য আসামিরা আত্মগোপনে আছেন।

