শনিবার, এপ্রিল ১৮, ২০২৬

জনপ্রশাসন বিষয়ক কমিটি বাতিল

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রশাসনের পদোন্নতি ও বদলি সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে ভূমিকা রাখা জনপ্রশাসন বিষয়ক কমিটি বাতিল করেছে সরকার। তবে কমিটি গঠনের পরই প্রশাসনে ব্যাপক সমালোচনা চলতে থাকে। কেউ কেউ কমিটি বাতিলের দাবি জানালেও সরকার আমলে নেয়নি। অবশেষে বৃহস্পতিবার (৩০ অক্টোবর) মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এতে প্রশাসনের কর্মকর্তা পর্যায়ে স্বস্তি ও উল্লাসের সৃষ্টি হয়েছে।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (কমিটি ও অর্থনৈতিক) মো. হুমায়ুন কবির স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, প্রেসিডেন্টের আদেশক্রমে জনপ্রশাসন বিষয়ক কমিটি গঠনের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সব প্রজ্ঞাপন বাতিল করা হয়েছে। ফলে এখন থেকে প্রশাসনের কর্মকর্তা পদায়ন, বদলি ও শৃঙ্খলাবিষয়ক পরামর্শ প্রদানের ক্ষমতা আর কমিটির হাতে থাকছে না।

স্বাধীনতার পর থেকেই এসএসবি ছিল মূল কাঠামো

স্বাধীনতার পর থেকেই সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ড (এসএসবি) প্রশাসনের পদোন্নতি ও সিনিয়রিটি নির্ধারণের একমাত্র বোর্ড হিসেবে কাজ করত। মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে গঠিত কমিটিতে স্বরাষ্ট্র, লেজিসলেটিভ সচিব, সিএজি প্রধান, জনপ্রশাসন সচিব, অর্থ সচিব,ও প্রধান উপদেষ্টা/প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মূখ্যসচিব/সচিব এই বোর্ডে থাকেন। তারাই কর্মকর্তাদের পদোন্নতির সুপারিশ করতো।

কিন্তু ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে এসএসবির পাশাপাশি নতুন করে জনপ্রশাসন বিষয়ক কমিটি গঠন করা হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসকসহ যুগ্ম সচিব ও এর ওপরে পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের নিয়োগ, বদলি ও শৃঙ্খলা সংক্রান্ত বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া।

তবে সময়ের সঙ্গে এই কমিটি নিয়ে বিতর্ক বাড়তে থাকে। অভিযোগ ওঠে—কিছু উপদেষ্টা তাঁদের পছন্দের কর্মকর্তাদের বদলি ও পদায়নে প্রভাব খাটাচ্ছেন। আবার যাঁরা তাঁদের পছন্দের ছিলেন না, তাঁদের যোগদানও বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে। এসব অনিয়মের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার অবশেষে কমিটি বিলুপ্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়।

বাতিল হওয়া কমিটির কাঠামো:

গত ৮ জানুয়ারি গঠিত ছয় সদস্যের কমিটির সভাপতি ছিলেন অর্থ ও বিজ্ঞান–প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। সদস্য ছিলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও জনপ্রশাসন সচিব।

কমিটির সদস্য–সচিব ছিলেন সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মো. নাহিদ ইসলাম। তিনি পরে জাতীয় নাগরিক পার্টিতে (এনসিপি) যোগ দেওয়ায় পদত্যাগ করেন।

উপদেষ্টাদের প্রভাব ও সমালোচনা

সরকারি সূত্র জানায়, কিছু উপদেষ্টা তাঁদের প্রভাব খাটিয়ে বদলি ও পদোন্নতিতে হস্তক্ষেপ করছিলেন। এতে এসএসবি–র নিরপেক্ষ ভূমিকা ক্ষুণ্ন হয়। একাধিক মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, “যোগ্যতার চেয়ে পরিচয়ই হয়ে দাঁড়ায় মূল মানদণ্ড।”

এক যুগ ধরে প্রশাসনে চলা “রাজনৈতিক আনুগত্য নির্ভর” সংস্কৃতির ভেতরে এসএসবিও ক্রমে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। বোর্ডের একাধিক সদস্য পরে জানান, “উপর থেকে চাপ ছিল।”

বঞ্চিতদের পদোন্নতি ও নতুন হাওয়া:

গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ‘বঞ্চিত’ কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দেওয়া শুরু করে অন্তর্বর্তী সরকার। গত ১৮ আগস্ট একসঙ্গে ২০১ জনকে যুগ্ম সচিব পদে, ১৩ আগস্ট ১১৭ জনকে উপসচিব পদে এবং ২৫ আগস্ট ১৩১ জনকে অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়।

এই প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও যোগ্যতাভিত্তিক করার উদ্দেশ্যে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ কাজ করছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। জনপ্রশাসন বিষয়ক কমিটি বাতিল হওয়ায় প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তা মনে করছেন, “অবশেষে প্রশাসন স্বাভাবিক নিয়মে ফিরছে।”

কমিটির কার্যক্রম ও প্রতিবেদন:

গত জানুয়ারিতে গঠিত কমিটিকে ৯০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হলেও, তারা নির্ধারিত সময়ের আগেই প্রতিবেদন জমা দেয়। এতে মোট ১ হাজার ৫৪০টি আবেদন যাচাই-বাছাই করা হয়; এর মধ্যে ৭৬৪ জন কর্মকর্তার পদোন্নতির সুপারিশ করা হয়। তবে ৭৬৩ জনের আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয় এবং প্রত্যেক ক্ষেত্রে কারণ উল্লেখ করা হয়।

কমিটি যাঁদের জন্য সুপারিশ করেছে, তাঁদের মধ্যে সচিব পদে ১১৯ জন, গ্রেড-১ পদে ৪১ জন, অতিরিক্ত সচিব পদে ৫২৮ জন, যুগ্ম সচিব পদে ৭২ জন ও উপসচিব পদে ৪ জন রয়েছেন।

প্রশাসনে প্রতিক্রিয়া:

এক যুগের রাজনৈতিক প্রভাব ও লবিং–নির্ভর পদায়নের সংস্কৃতি থেকে মুক্তি পাওয়ার আশায় অনেক কর্মকর্তা এই সিদ্ধান্তকে “ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা” বলে মনে করছেন।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক যুগ্ম সচিব নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কমিটি বাতিল হওয়ায় এখন যোগ্যতা ও মেধার ভিত্তিতেই পদোন্নতির সুযোগ তৈরি হবে। এটা প্রশাসনের জন্য বড় স্বস্তি।”

পুরনো কাঠামোতে ফিরছে সরকার:

এ সিদ্ধান্তের ফলে প্রশাসনের পদোন্নতি ও বদলি এখন থেকে আবারও সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ড (এসএসবি)–র হাতে থাকবে। তবে এসএসবি–কে নিরপেক্ষ ও কার্যকর করার নির্দেশনা দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার।

প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, যদি এই সংস্কার সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হয়, তবে পদোন্নতি প্রক্রিয়া দ্রুত, স্বচ্ছ ও কার্যকর হবে। দীর্ঘসূত্রতা ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কমবে, বাড়বে প্রশাসনিক কাজের গতি।

- Advertisement -spot_img
  • সর্বশেষ
  • পঠিত