আমরা সন্তানকে পড়াশোনা শেখাই, ভালো স্কুলে ভর্তি করি, তার ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা পরিকল্পনা করি। কিন্তু খুব ছোটবেলা থেকে তাকে টাকা কীভাবে ব্যবহার করতে হয়, কেন সঞ্চয় করতে হয়, আর অপচয় কেন করা উচিত নয়, সেটি কি যথেষ্ট শেখাই?
আমাদের প্রজন্মের অনেকেই ছোটবেলায় শুনেছি, “টাকা পয়সা নিয়ে এখন তোমাদের ভাবতে হবে না। বড় হলে বুঝবে।”
আমাদের বাবা মায়েদের সেই চিন্তারও একটি বাস্তব কারণ ছিল। ছোট সন্তানকে টাকা পয়সার হিসাবের মধ্যে রাখলে হয়তো পড়াশোনার ক্ষতি হবে, হাতে টাকা দিলে হয়তো অপচয় করতে শিখবে। তাই টাকা উপার্জন, সঞ্চয়, খরচ কিংবা ব্যাংকিং আমাদের শৈশবের খুব পরিচিত আলোচনার অংশ ছিল না।
কিন্তু সময় বদলেছে। আমাদের সন্তানদের বড় হওয়ার পরিবেশও বদলেছে।
আজকের শহরের একটি স্কুলগামী শিশু অনলাইনে খাবার অর্ডার করছে, অনলাইনে কেনাকাটা করছে, কার্ড দিয়ে টাকা পরিশোধ করছে, মোবাইল আর্থিক সেবা ব্যবহার করছে। অনেক সময় দেখা যায়, বাবা মা কিংবা পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠদের অনলাইন লেনদেন, মোবাইল অ্যাপ কিংবা ডিজিটাল সেবার ক্ষেত্রেও স্কুলপড়ুয়া ছেলে মেয়েরাই সাহায্য করছে।
অর্থাৎ নতুন প্রজন্ম প্রযুক্তির সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নিচ্ছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, তারা কি একইভাবে টাকা ব্যবস্থাপনার সঙ্গেও পরিচিত হচ্ছে?
আমার প্রায় ১৫ বছরের ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা থেকে মনে হয়েছে, আর্থিক শিক্ষা এখন আর অতিরিক্ত কোনো বিষয় নয়। এটি একজন শিশুর ভবিষ্যৎ জীবনের একটি মৌলিক দক্ষতা।
আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় আর্থিক শিক্ষার জায়গা কোথায়:
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা বৈচিত্র্যময়। সরকারি ও বেসরকারি স্কুল, বাংলা ও ইংরেজি মাধ্যম, বিভিন্ন ধরনের মাদ্রাসা এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও এনজিও পরিচালিত শিক্ষা কার্যক্রমের মধ্যে আমাদের শিশুরা বেড়ে উঠছে।
একজন শিক্ষার্থী প্রাথমিক শিক্ষা থেকে এসএসসি পর্যন্ত অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শেখে। কিন্তু নিজের টাকা কীভাবে পরিচালনা করবে, সঞ্চয় কেন করবে, ব্যাংক হিসাব কীভাবে ব্যবহার করবে, ডিজিটাল লেনদেনের নিরাপত্তা কোথায়, কিংবা ভবিষ্যতের জন্য কীভাবে পরিকল্পনা করতে হয়, এসব বিষয়ে বাস্তব শিক্ষা এখনও আরও বিস্তৃত করা দরকার।
এই জায়গায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন Student Banking Guidelines জারি করেছে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিংয়ের সঙ্গে পরিচিত করা, সঞ্চয়ের অভ্যাস তৈরি, আধুনিক ব্যাংকিং প্রযুক্তির ব্যবহার এবং দায়িত্বশীল আর্থিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ নীতিগত জায়গা তৈরি হয়েছে। এখন প্রয়োজন এই উদ্যোগকে পরিবার, স্কুল এবং সমাজের আরও গভীরে নিয়ে যাওয়া।
আর্থিক শিক্ষা যেন শুধু শহরের শিশুদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে:
ঢাকা কিংবা বড় জেলা শহরের একটি স্কুলে ব্যাংকিং ও আর্থিক শিক্ষা কার্যক্রম আয়োজন করা তুলনামূলকভাবে সহজ। ব্যাংকের শাখা আছে, ইন্টারনেট আছে এবং শিক্ষার্থী ব্যাংকিং নিয়ে বিভিন্ন ব্যাংকের উদ্যোগও রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও ব্যাংকগুলো ইতোমধ্যে জেলা পর্যায়েও School Banking Conference এবং আর্থিক সচেতনতা কার্যক্রম করছে। তাই বিষয়টি এখন আর শুধু শহরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং পরবর্তী চ্যালেঞ্জ হলো এই উদ্যোগকে আরও গভীরে নিয়ে যাওয়া।
চরাঞ্চল, নদীবেষ্টিত এলাকা, পাহাড়ি অঞ্চল কিংবা দেশের এমন প্রত্যন্ত জায়গা, যেখানে ভালো সড়ক যোগাযোগ এখনও সহজলভ্য নয় এবং অনেক মানুষের যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম নৌকা বা নদীপথ, সেখানকার শিশুরাও যেন একই মৌলিক আর্থিক জ্ঞান পাওয়ার সুযোগ পায়, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি।
আমাদের অর্থনীতি বড় হচ্ছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হচ্ছে। মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট দেশের অনেক প্রত্যন্ত এলাকাতেও পৌঁছে গেছে। ডিজিটাল আর্থিক সেবাও মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠছে।
তাহলে আর্থিক শিক্ষা কেন শুধু শহরকেন্দ্রিক হবে?
শহরের একটি শিশু যদি কার্ড, মোবাইল আর্থিক সেবা, অনলাইন পেমেন্ট এবং ব্যাংকের মোবাইল অ্যাপ সম্পর্কে জানতে পারে, একই মৌলিক জ্ঞান প্রত্যন্ত গ্রামের একটি স্কুলগামী শিশুর কাছেও পৌঁছানো উচিত।
কারণ সমাজের একটি বড় অংশকে পিছনে রেখে আমরা সামগ্রিকভাবে সামনে এগোতে পারব না।
প্রযুক্তি হতে পারে বড় সুযোগ:
আমাদের গ্রামের অনেক পরিবার এখনও ব্যাংকের কাগজপত্র, চেক, হিসাব পরিচালনা কিংবা আনুষ্ঠানিক আর্থিক সেবার সঙ্গে খুব বেশি পরিচিত নয়।
কিন্তু তাদের সন্তানদের সামনে নতুন একটি সুযোগ রয়েছে।
যে শিশু স্মার্টফোন ব্যবহার করতে শিখছে, সে ব্যাংকের মোবাইল অ্যাপও শিখতে পারে। যে শিশু মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহার করছে, সে ডিজিটাল লেনদেনের নিরাপত্তা সম্পর্কেও জানতে পারে।
আজ ব্যাংকিং শুধু শাখা বা এটিএমের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। অনেক ব্যাংক নিজস্ব মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে বিভিন্ন সেবা দিচ্ছে। ফলে ভৌগোলিক দূরত্ব আগের মতো বড় বাধা নয়।
আমরা হয়তো প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রতিটি স্কুলে নিয়মিত গিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম চালাতে পারব না। কিন্তু অনলাইন মাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মোবাইল ফোন এবং ডিজিটাল শিক্ষা উপকরণের মাধ্যমে সেই শিশুর কাছেও প্রাথমিক আর্থিক শিক্ষা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।
এর পাশাপাশি স্থানীয় ব্যাংক শাখা, উপশাখা ও এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে আশপাশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নিয়মিত কার্যক্রম করা যেতে পারে।
বাবা মায়ের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি:
আর্থিক শিক্ষার শুরু আসলে পরিবার থেকে।
একটি শিশু যখন স্কুলে যাওয়ার বয়সে পৌঁছায়, তখন থেকেই বাবা মা চাইলে তার নামে একটি ছোট সঞ্চয়ী হিসাব খুলতে পারেন। বর্তমানে শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যাংকগুলোতে বিভিন্ন ধরনের Student Banking সুবিধা রয়েছে।
তবে শুধু হিসাব খুলে দিলেই দায়িত্ব শেষ নয়।
সন্তানের নামে ছোট একটি সঞ্চয়ী হিসাবের পাশাপাশি সামর্থ্য অনুযায়ী অল্প অল্প করে নিয়মিত সঞ্চয়ের অভ্যাস তৈরি করা যেতে পারে। আজকের ছোট সঞ্চয় আগামী দিনে বড় একটি তহবিলে পরিণত হতে পারে।
একসময় সেই টাকা দিয়ে সন্তানের জন্য একটি ল্যাপটপ কেনা যেতে পারে, উচ্চশিক্ষার সময় কাজে লাগতে পারে কিংবা কোনো জরুরি প্রয়োজনে পরিবারের ওপর চাপ কমাতে পারে।
বিশেষ করে মফস্বল ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের বাবা মায়েদের জন্য এই অভ্যাসটি গুরুত্বপূর্ণ। সবার নিয়মিত বড় অঙ্কের সঞ্চয় করার সামর্থ্য নেই। কিন্তু সামর্থ্য অনুযায়ী ছোট অঙ্ক দিয়ে শুরু করা সম্ভব।
বিষয়টি কত টাকা সঞ্চয় করলাম, সেটি নয়। মূল বিষয় হলো সঞ্চয়ের মানসিকতা তৈরি করা।
কন্যাসন্তান কিংবা পুত্রসন্তান, সবার জন্যই ছোটবেলা থেকে এই অভ্যাস তৈরি করা উচিত। তবে কন্যাসন্তানের শিক্ষা, উচ্চশিক্ষা কিংবা ভবিষ্যতের বড় প্রয়োজনের কথা মাথায় রেখে বাবা মা যদি একেবারে ছোট বয়স থেকেই সামর্থ্য অনুযায়ী অল্প অল্প করে সঞ্চয় শুরু করেন, দীর্ঘ সময়ে সেটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়তায় পরিণত হতে পারে।
এই সঞ্চয় শুধু ভবিষ্যতের বড় কোনো পরিকল্পনার জন্য নয়। জীবনের ছোটখাটো বিপদ, জরুরি প্রয়োজন কিংবা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতেও একটি সঞ্চয় পরিবারকে কিছুটা আর্থিক স্বস্তি দিতে পারে।
সঞ্চয় শুধু শেখানো নয়, অনুভব করানোও জরুরি:
পিতামাতা হিসেবে আমরা সন্তানকে শুধু সঞ্চয়ের কথা বললেই হবে না। তাকে সঞ্চয়ের আনন্দটাও অনুভব করাতে হবে।
ধরা যাক, ঈদ বা পূজায় আমি আমার সন্তানকে একটি নতুন জামা কিনে দিলাম। পাশাপাশি তাকে বলতে পারি, “তুমি যদি আজ থেকে অল্প অল্প করে টাকা জমাও, কয়েক মাস পরে তোমার নিজের জমানো টাকা দিয়ে আরেকটি কিছু কিনতে পারবে।”
সেটি হতে পারে একটি বই, খেলনা, ক্রিকেটের ব্যাট কিংবা পছন্দের কোনো ছোট জিনিস।
টিফিনের জন্য ১০ টাকা দেওয়া হলে সে যদি ৮ টাকা খরচ করে ২ টাকা জমিয়ে রাখে, অঙ্কটি হয়তো খুব ছোট। কিন্তু অভ্যাসটি বড়।
কোনো আত্মীয়ের কাছ থেকে উপহার হিসেবে টাকা পেলে সেখান থেকেও একটি অংশ জমাতে পারে।
একদিন নিজের জমানো টাকা দিয়ে যখন সে পছন্দের কিছু কিনবে, সেই আনন্দ অন্যরকম হবে। কারণ সে বুঝবে, সেটির পেছনে তার নিজেরও একটি অবদান আছে।
এই ছোট অভিজ্ঞতাই ধীরে ধীরে সঞ্চয়, অপেক্ষা, পরিকল্পনা এবং দায়িত্ববোধের অভ্যাস তৈরি করে।
শিক্ষক, বড় ভাই বোন এবং পরিবারের অন্য সদস্যদের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ:
আর্থিক শিক্ষা শুধু বাবা মায়ের দায়িত্ব নয়। শিক্ষক শিক্ষিকা এবং পরিবারের বড় ভাই বোনের ভূমিকাও অনেক গুরুত্বপূর্ণ।
একজন শিক্ষক যখন শ্রেণিকক্ষে অঙ্ক শেখাচ্ছেন, তখন শুধু বইয়ের অঙ্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তব জীবনের সঙ্গে সেটিকে যুক্ত করা যায়।
বাড়ির পাশের মুদি দোকান থেকে ৫০ টাকার পণ্য কিনলে কত টাকা ফেরত পাওয়া উচিত, পাঁচটি কলমের দাম কত, ১০০ টাকার মধ্যে কত টাকা খরচ করে কত টাকা রাখা যায়, কিংবা মাসের টিফিনের টাকা কীভাবে ভাগ করা যায়, এমন উদাহরণ থেকেই একটি শিশুর মধ্যে টাকা ব্যবস্থাপনার ধারণা তৈরি হতে পারে।
স্কুলের লাইব্রেরি, ক্যান্টিন কিংবা স্টেশনারি দোকানও হতে পারে শেখার জায়গা।
বড় ভাই বা বোনও ছোটদের সামনে ভালো উদাহরণ তৈরি করতে পারে। তারা কীভাবে টাকা খরচ করছে, কীভাবে সঞ্চয় করছে, কোনো কিছু কেনার আগে প্রয়োজন ও ইচ্ছার মধ্যে পার্থক্য করছে কি না, ছোটরা সেখান থেকেও শেখে।
সঞ্চয়ের পাশাপাশি অপচয় বন্ধ করাও আর্থিক শিক্ষা:
আমরা সন্তানকে শুধু সঞ্চয় করতে শেখাব, কিন্তু অপচয় করতে দেব, সেটি হতে পারে না।
একটি ১৫০ পৃষ্ঠার খাতা কিনে কয়েকটি পৃষ্ঠা অকারণে ছিঁড়ে ফেলা, একটি কলম পুরোপুরি শেষ হওয়ার আগেই ফেলে দেওয়া, পেন্সিল অসাবধানতায় ভেঙে ফেলা কিংবা খাবার নষ্ট করা, এগুলোও এক ধরনের অপচয়।
হয়তো এগুলো খুব ছোট বিষয়। কিন্তু অর্থের মূল্য বোঝার শিক্ষা এই ছোট জায়গাগুলো থেকেই শুরু হয়।
বাবা মা যদি বলেন, “এই কলমটি কিনতে ১০ টাকা লেগেছে, তাই যত্ন করে ব্যবহার করো”, তাহলে শিশু শুধু কলমের মূল্য নয়, তার পেছনে থাকা অর্থের মূল্যও বুঝতে শুরু করবে।
সঞ্চয়ের মানসিকতার পাশাপাশি অপচয় না করার অভ্যাস তৈরি করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
একটি ব্যাংক হিসাব শিশুর কাছে শুধু হিসাব নয়:
আমার নিজের পরিবারের একটি ছোট অভিজ্ঞতা এখানে বলতে পারি।
আমার মেয়ের বয়স এখন প্রায় ১৩ বছর। তার বয়স যখন চার বা পাঁচ বছর, তখনই আমি তার নামে একটি স্কুল ব্যাংকিং হিসাব খুলে দিয়েছিলাম।
একদিন তার নিজের নাম লেখা একটি ডেবিট কার্ড তার হাতে দিলাম।
কার্ডে নিজের নাম দেখে তার যে আনন্দ, সেটি হয়তো ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।
একটি ছোট শিশুর কাছে সেটি শুধু একটি ব্যাংকিং পণ্য নয়। তার কাছে সেটি ছিল নিজের একটি পরিচয়।
আমার ছেলের ক্ষেত্রেও একই অভিজ্ঞতা হয়েছে। কয়েক বছর আগেই তার জন্য একটি হিসাব খুলে দিয়েছি।
এখন বিভিন্ন সময়ে দাদা, নানু, খালামণি, মা কিংবা বাবা যখন তাদের কিছু টাকা দেন, তারা সেই টাকা আমার হাতে দিয়ে বলে, “পাপ্পা, এই টাকাটা আমার ব্যাংকে জমা করে দিও।”
এই ছোট অভ্যাসটিই আর্থিক শিক্ষার শুরু।
আমার নিজের একটি ছোট শখ আছে। মাঝে মাঝে প্রাইজ বন্ড কিনি। আমার সন্তানরাও সেটি লক্ষ্য করেছে। তাদের হাতে কিছু টাকা এলে কখনও কখনও তারা বলে, “পাপ্পা, আমার জন্য প্রাইজ বন্ড কিনে দিও।”
হয়তো এটি বড় কোনো আর্থিক পরিকল্পনা নয়। কিন্তু আর্থিক আচরণ তো এভাবেই তৈরি হয়।
মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদেরও সমানভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে:
বাংলাদেশের বৈচিত্র্যময় শিক্ষা ব্যবস্থায় মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদেরও আর্থিক শিক্ষা কার্যক্রমের সমান অংশীদার করতে হবে।
এটি কোনো একটি শিক্ষা ব্যবস্থার বিষয় নয়। একজন শিশু যে মাধ্যমেই পড়াশোনা করুক, তাকে অর্থের মূল্য, সঞ্চয়, দায়িত্বশীল ব্যয় এবং নিরাপদ আর্থিক আচরণ সম্পর্কে ধারণা দেওয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের কার্যক্রমও বিস্তৃত হয়েছে। ইসলামী ব্যাংক ও অন্যান্য ব্যাংকের ইসলামী ব্যাংকিং কার্যক্রমের মাধ্যমে মাদ্রাসা ও ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের জন্য বয়স উপযোগী আর্থিক শিক্ষা কার্যক্রম করা যেতে পারে।
সঞ্চয়, দায়িত্বশীল ব্যয়, আর্থিক শৃঙ্খলা এবং ইসলামী আর্থিক ব্যবস্থার মৌলিক ধারণা সহজ ভাষায় শেখানো সম্ভব।
একজন মাদ্রাসার শিক্ষার্থীকে জটিল ব্যাংকিং তত্ত্ব শেখানোর প্রয়োজন নেই। তাকে নিজের অর্থের মূল্য এবং সঠিক ব্যবহারের শিক্ষা দেওয়াই প্রথম কাজ।
আমাদের লক্ষ্য শুধু গ্রাহক তৈরি করা নয়:
Student Banking-এর সাফল্য শুধু কতগুলো হিসাব খোলা হলো, সেটি দিয়ে মাপা উচিত নয়।
একটি শিশুর ব্যাংক হিসাব খোলা আমাদের সাফল্যের শেষ ধাপ নয়, বরং আর্থিক শিক্ষার প্রথম ধাপ।
আমাদের নিজেদেরও একটি প্রশ্ন করা দরকার:
আমরা কি শিশুর হাতে শুধু একটি ব্যাংক হিসাব তুলে দিচ্ছি, নাকি তাকে সেই হিসাব ব্যবহার করতেও শেখাচ্ছি?
আমরা চাই, একটি শিশু ছোটবেলা থেকেই বুঝুক টাকার মূল্য কী।
সে সঞ্চয় করতে শিখুক।
প্রয়োজন ও ইচ্ছার পার্থক্য করতে শিখুক।
অপচয় না করতে শিখুক।
ডিজিটাল আর্থিক সেবা নিরাপদে ব্যবহার করতে শিখুক।
ভবিষ্যতে দায়িত্বশীলভাবে ঋণ নেওয়ার ধারণা তৈরি করুক।
অর্থ সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করলে ভবিষ্যতের সুযোগ তৈরি করা যায়, সেটি বুঝতে শিখুক।
আর এই শিক্ষা যেন শহর বা একটি নির্দিষ্ট শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে।
চরের একটি শিশু, নদীবেষ্টিত এলাকার একটি শিশু, পাহাড়ের একটি শিশু, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন বা দুর্গম এলাকার একটি শিশু এবং মাদ্রাসায় পড়া একটি শিশুও একই আর্থিক শিক্ষার অধিকারী।
শেষ কথা:
আমাদের প্রজন্মের অনেকেই আর্থিক শিক্ষা শিখেছি জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে। কেউ সঞ্চয়ের মাধ্যমে, কেউ ভুল সিদ্ধান্তের মাধ্যমে, কেউ আবার প্রয়োজনের সময় সমস্যায় পড়ে।
আমাদের সন্তানদের কি একইভাবে শিখতে হবে?
আমার মনে হয় না।
আমরা তাদের ছোটবেলা থেকেই শেখাতে পারি।
টাকা শুধু খরচ করার বিষয় নয়।
টাকা ব্যবস্থাপনার বিষয়।
সঞ্চয়ের বিষয়।
পরিকল্পনার বিষয়।
অপচয় রোধের বিষয়।
দায়িত্বের বিষয়।
আর আর্থিক শিক্ষা শুধু ব্যাংকের গ্রাহক তৈরি করার বিষয় নয়। এটি দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরি করার বিষয়।
শহরের শিশুরা যখন অনলাইনে খাবার অর্ডার করছে, কার্ড বা মোবাইল আর্থিক সেবা দিয়ে টাকা পরিশোধ করছে, তখন প্রত্যন্ত গ্রামের শিশুটিও যেন অন্তত জানে ব্যাংক কী, সঞ্চয় কী, ডিজিটাল লেনদেন কী এবং নিজের অর্থ কীভাবে নিরাপদে পরিচালনা করতে হয়।
আমরা যদি এই জ্ঞান শহর থেকে গ্রাম, জেলা থেকে চর, সমতল থেকে পাহাড় এবং স্কুল থেকে মাদ্রাসা পর্যন্ত পৌঁছে দিতে পারি, তাহলে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি শুধু একটি ব্যাংকিং ধারণা থাকবে না।
এটি হয়ে উঠবে একটি সামাজিক পরিবর্তনের হাতিয়ার।
কারণ একটি শিশুর হাতে শুধু একটি ব্যাংক হিসাব তুলে দেওয়া যথেষ্ট নয়।
তার হাতে যদি আমরা আর্থিক জ্ঞান, সঞ্চয়ের অভ্যাস, অপচয় না করার মানসিকতা এবং দায়িত্বশীলভাবে অর্থ ব্যবস্থাপনার শিক্ষা তুলে দিতে পারি, তাহলেই হয়তো আমরা সত্যিকার অর্থে একটি আর্থিকভাবে সচেতন বাংলাদেশের ভিত্তি তৈরি করতে পারব।
লেখক: মো: কামরুল ইসলাম
ব্যাংকার ও কলামিস্ট

