বুধবার, জুলাই ২৯, ২০২৬

ঘুষের ইকোসিস্টেম ভাঙতে White Box e-Governance Transformation-হতে পারে পরবর্তী রুপান্তর

প্রকোশলী আরিফ হাছান চৌধুরী

চেরাগি নিউজ ডেস্ক

সকালে উপজেলা অফিসে গেছেন একজন সাধারণ মানুষ। উদ্দেশ্য—বাবার রেখে যাওয়া সামান্য জমির নামজারি সম্পন্ন করা। অনলাইনে আবেদন করেছেন, প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও জমা দিয়েছেন। কয়েক সপ্তাহ কেটে গেছে, কিন্তু কোনো অগ্রগতি নেই। অফিসে গেলে বলা হয়, “ফাইল প্রক্রিয়াধীন।” কিছুক্ষণ পর একজন মধ্যস্থতাকারী কাছে এসে ফিসফিস করে বলে, “কিছু খরচ করলে কয়েক দিনের মধ্যেই কাজ হয়ে যাবে।” আইন অনুযায়ী যে সেবা নাগরিকের অধিকার, সেটিই যেন অদৃশ্য এক মূল্য পরিশোধের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
এই গল্পটি কোনো এক ব্যক্তির নয়; এটি বাংলাদেশের লাখো মানুষের নিত্যদিনের বাস্তবতা।
কোন সেবা খাতগুলো বেশি ঝুঁকিপূর্ণ
সব সরকারি প্রতিষ্ঠান সমানভাবে ঝুঁকিপূর্ণ নয়। তবে যেসব সেবায় নাগরিকের সরাসরি যোগাযোগ, একাধিক অনুমোদন, উচ্চ মাত্রার বিবেচনাধিকার এবং তথ্যের অস্বচ্ছতা রয়েছে, সেখানে ঘুষের ঝুঁকি বেশি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—ভূমি প্রশাসন, পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা, বিআরটিএ ও পরিবহন, কর ও কাস্টমস, স্থানীয় সরকার, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পাসপোর্ট ও নাগরিক সেবা, সরকারি ক্রয় ও উন্নয়ন প্রকল্প, এবং পরিবেশ, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য ইউটিলিটি সেবা।
ঘুষের ইকোসিস্টেম
ঘুষকে আমরা সাধারণত ব্যক্তি-অপরাধ হিসেবে দেখি। কেউ ঘুষ দেয়, কেউ ঘুষ নেয়—বিষয়টি যেন এতটুকুতেই সীমাবদ্ধ। অথচ বাস্তবতা হলো, ঘুষ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক ইকোসিস্টেম। গত কয়েক দশকে তথ্যপ্রযুক্তিতে ,ই-গভর্নেন্স এবং অনলাইন সরকারি সেবার সম্প্রসারণ হলেও একটি পুরোনো সমস্যা আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থাকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দিচ্ছে—ঘুষের ইকোসিস্টেম। প্রশাসনিক জটিলতা, অপ্রয়োজনীয় অনুমোদন, অতিরিক্ত বিবেচনাধিকার, তথ্যের অস্বচ্ছতা, দালালচক্র, নগদ লেনদেন এবং দুর্বল জবাবদিহি—সব মিলিয়ে এমন একটি কাঠামো তৈরি হয়েছে, যেখানে ব্যক্তি বদলালেও ব্যবস্থা বদলায় না। ফলে দুর্নীতিও বারবার নতুন রূপে ফিরে আসে।
কীভাবে কাজ করে ?
ঘুষের ইকোসিস্টেম সাধারণত একটি নির্দিষ্ট ধারা অনুসরণ করে। প্রথমে জটিল ও অস্বচ্ছ প্রক্রিয়া তৈরি হয়। এরপর নাগরিক আবেদন করার পর ফাইল অদৃশ্য প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় আটকে যায়। ইচ্ছাকৃত বিলম্বের সুযোগে দালাল সক্রিয় হয় এবং দ্রুত সেবার বিনিময়ে অনানুষ্ঠানিক অর্থের প্রস্তাব দেয়। ঘুষের অঙ্ক নির্ধারণের পর ফাইল দ্রুত নিষ্পত্তি হয়। অনেক ক্ষেত্রে এই অর্থ বিভিন্ন স্তরে ভাগ হয় এবং শেষ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটি একটি স্বাভাবিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়। এরপর একই চক্র আবার নতুন একজন সেবাগ্রহীতার ক্ষেত্রে পুনরাবৃত্তি ঘটে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, দেশের অধিকাংশ পরিবার অন্তত একটি সরকারি বা বেসরকারি সেবা নিতে গিয়ে কোনো না কোনো ধরনের দুর্নীতির অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছে। একই সঙ্গে নাগরিকদের কাছ থেকে আদায় হওয়া ঘুষের আর্থিক পরিমাণ হাজার হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। আন্তর্জাতিক দুর্নীতি ধারণা সূচকেও (Corruption Perceptions Index) বাংলাদেশের অবস্থান এখনো উদ্বেগজনক। বিশ্বব্যাংক, ইউএনডিপি এবং ওইসিডির বিভিন্ন গবেষণাও দেখিয়েছে, দুর্নীতি শুধু নৈতিক সমস্যা নয়; এটি বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করে, সেবার মান কমায়, উন্নয়ন ব্যয় বাড়ায় এবং রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের আস্থা ক্ষুণ্ন করে।
কেন এই ইকোসিস্টেম টিকে থাকে
ঘুষের মূল শক্তি কোনো ব্যক্তি নয়; বরং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অস্বচ্ছ সমন্বয়। একটি ফাইল প্রায়ই মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর, জেলা, উপজেলা ও মাঠপর্যায়ের বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরে বেড়ায়। কোথায় ফাইল আছে, কে দায়িত্বে আছেন, কেন বিলম্ব হচ্ছে—এসব তথ্য নাগরিক জানতে পারেন না। একই সঙ্গে বহুস্তরীয় অনুমোদন, বিচ্ছিন্ন তথ্যব্যবস্থা, দুর্বল নিরীক্ষা, রাজনৈতিক-প্রশাসনিক প্রভাব এবং জবাবদিহির অভাব ঘুষের সুযোগ আরও বাড়িয়ে দেয়। ফলে দুর্নীতি কোনো একক অফিসের সমস্যা না হয়ে পুরো প্রশাসনিক কাঠামোর একটি প্রাতিষ্ঠানিক ইকোসিস্টেমে পরিণত হয়।
ঘুষের ইকোসিস্টেমে কারা জড়িত
ঘুষের ইকোসিস্টেম শুধু ঘুষদাতা ও ঘুষগ্রহীতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি একটি বহুমাত্রিক নেটওয়ার্ক। এর সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত থাকে সেবাগ্রহীতা, মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী, অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষ, দালাল ও মধ্যস্থতাকারী, কিছু ক্ষেত্রে প্রভাবশালী মহল, ব্যবসায়ী-ঠিকাদার এবং দুর্বল তদারকি ব্যবস্থা। প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে এই চক্রকে সচল রাখে। ফলে ব্যক্তি পরিবর্তন হলেও ব্যবস্থা অপরিবর্তিত থাকে।

White Box e-Governance
বাংলাদেশে ঘুষ কেন টিকে আছে, তার উত্তর ব্যক্তি নয়—সিস্টেমের মধ্যে। ধরা যাক, একজন নাগরিক অনলাইনে একটি লাইসেন্সের আবেদন করলেন। আবেদন জমা পড়ল, কিন্তু এরপর কী হলো? ফাইল কোথায়? কার টেবিলে? কেন বিলম্ব হচ্ছে? নির্ধারিত সময় কত? এসব প্রশ্নের উত্তর নাগরিক জানেন না। এই অস্বচ্ছতার সুযোগেই দালালচক্র সক্রিয় হয় এবং বলে, “কিছু ব্যবস্থা করলে কাজ দ্রুত হবে।” অর্থাৎ, ডিজিটাল আবেদনও শেষ পর্যন্ত একটি অস্বচ্ছ মানবিক প্রক্রিয়ার মধ্যে আটকে যায়। এই বাস্তবতাই প্রমাণ করে যে, আমাদের অনেক সরকারি সেবা ফ্রন্ট-এন্ডে ডিজিটাল হলেও ব্যাক-এন্ডে এখনো ব্ল্যাক বক্স। নাগরিক শুধু আবেদন করেন; কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণের পুরো প্রক্রিয়া তাঁর দৃষ্টির বাইরে থেকে যায়। আর এই অদৃশ্য অংশই ঘুষের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়।
এই কারণেই শুধু কঠোর আইন বা শাস্তি সমস্যার স্থায়ী সমাধান দিতে পারে না। অর্থনীতিবিদ রবার্ট ক্লিটগার্ডের বিখ্যাত সূত্রটি আজও প্রাসঙ্গিক—Corruption = Monopoly + Discretion − Accountability। অর্থাৎ, যেখানে একচেটিয়া ক্ষমতা বেশি, ব্যক্তিগত বিবেচনার সুযোগ বেশি এবং জবাবদিহি কম, সেখানে দুর্নীতির ঝুঁকিও বেশি। তাই ব্যক্তি বদলালেও যদি সিস্টেম অপরিবর্তিত থাকে, তবে দুর্নীতির পুনরাবৃত্তি ঘটতেই থাকবে।
বাংলাদেশের সামনে এখন একটি নতুন সুযোগ রয়েছে। কেবল ডিজিটাল সেবা নয়, বরং Digital White Box e-Governance Transformation-এর মাধ্যমে প্রশাসনের পুরো কাঠামোকে স্বচ্ছ, অনুসরণযোগ্য এবং জবাবদিহিমূলক করা সম্ভব।
আমার প্রস্তাবিত এই ধারণার মূল কথা হলো—সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রতিটি ধাপ নাগরিকের কাছে দৃশ্যমান হতে হবে। একটি আবেদন জমা পড়ার পর থেকে নিষ্পত্তি পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায় ডিজিটালভাবে ট্র্যাক করা যাবে। কোন কর্মকর্তা কতদিন ফাইলটি নিজের কাছে রেখেছেন, কেন বিলম্ব হয়েছে, কোন নিয়মে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে—সবকিছু একটি নিরাপদ ডিজিটাল অডিট ট্রেইলে সংরক্ষিত থাকবে।
এর ফলে দালালের প্রয়োজন কমবে, অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগের সুযোগ কমবে এবং ঘুষের পরিবেশ স্বাভাবিকভাবেই সংকুচিত হবে।
এই ব্যবস্থায় প্রতিটি আবেদন একটি ইউনিক ট্র্যাকিং নম্বর পাবে। নির্ধারিত সময় অতিক্রম করলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে সতর্কবার্তা যাবে। নাগরিক মোবাইল ফোন থেকেই দেখতে পারবেন তাঁর আবেদন কোন পর্যায়ে আছে। কোনো কর্মকর্তা অস্বাভাবিকভাবে ফাইল আটকে রাখলে বা একই ধরনের সিদ্ধান্তে অসঙ্গতি দেখা দিলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (AI) বিশ্লেষণ ব্যবস্থা সেটিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করতে পারবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই ব্যবস্থায় নাগরিককেও সিস্টেমের অংশ করতে হবে। প্রতিটি ধাপে অভিযোগ, আপত্তি বা অনিয়মের তথ্য দেওয়ার জন্য একটি সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম থাকতে হবে। নাগরিক যদি দেখেন তাঁর ফাইল অযৌক্তিকভাবে আটকে আছে, অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হয়েছে বা নিয়মবহির্ভূত কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তাহলে তিনি সরাসরি অভিযোগ করতে পারবেন। অভিযোগের অগ্রগতি ও নিষ্পত্তিও তিনি অনলাইনে অনুসরণ করতে পারবেন। এতে প্রশাসনের পাশাপাশি নাগরিকও হবে সুশাসনের অংশীদার। Digital White Box e-Governance Transformation একটি নতুন রাষ্ট্র পরিচালনা দর্শন, যেখানে প্রতিটি সিদ্ধান্ত হবে দৃশ্যমান, প্রতিটি প্রক্রিয়া হবে অনুসরণযোগ্য, প্রতিটি কর্মকর্তা হবেন জবাবদিহিমূলক এবং প্রতিটি নাগরিক পাবেন মর্যাদাপূর্ণ, হয়রানিমুক্ত সেবা।
ঘুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুধু দুর্নীতিবাজের বিরুদ্ধে নয়; এটি সেই ইকোসিস্টেমের বিরুদ্ধে, যা দুর্নীতিকে বাঁচিয়ে রাখে। যদি আমরা সেই ইকোসিস্টেম ভেঙে একটি স্বচ্ছ, ডিজিটাল ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন গড়ে তুলতে পারি, তবে সেটিই হবে বাংলাদেশের পরবর্তী বড় রাষ্ট্রীয় রূপান্তর।

 

লেখক: প্রকোশলী আরিফ হাছান চৌধুরী
সহকারী অধ্যাপক , ইউনিভার্সিটি অব সাইন্স এন্ড টেকনোলজি চট্টগ্রাম।।

- Advertisement -spot_img
  • সর্বশেষ
  • পঠিত