শুক্রবার, এপ্রিল ১৭, ২০২৬

দেশের পোশাক রপ্তানি কেবল যুক্তরাষ্ট্র নির্ভর হতে পারে না

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক

বাংলাদেশি পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্র যে সম্পূরক শুল্ক আরোপ করেছে, তা প্রতিদ্বন্দ্বী পোশাক রপ্তানিকারকদের প্রায় সমান হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তবে সাবেক এই বাণিজ্যমন্ত্রী মনে করেন, দেশের পোশাক রপ্তানি কেবল যুক্তরাষ্ট্র নির্ভর হতে পারে না।

তার ভাষায়, “এটা জয়-পরাজয়ের কোনো বিষয় না। যে শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতিযোগিতায় আমরা তুলনামূলকভাবে একটা সন্তোষজনক অবস্থানে আছি। আমরা ২০%, পাকিস্তান ১৯%, ভিয়েতনামে ২০%, ভারতে ২৫%।

“সেই ক্ষেত্রে আমি মনে করি, সার্বিকভাবে ট্যারিফের ফিগারটা সন্তোষজনক- প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে। ট্যারিফ বিষয়ে আমাদের প্রতিযোগীদের সাথে যেটা হয়েছে, সেটা ঠিকই আছে। এটা সন্তাষজনক।”

শুক্রবার দুপুরে গুলশানে নিজের বাসায় সাংবাদিকদের কাছে তিনি এ প্রতিক্রিয়া জানান।

বাণিজ্য নিয়ে দর কষাকষি শেষে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর সম্পূরক শুল্ক ৩৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২০ শতাংশ ঠিক করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

শুল্কের চাপ কমাতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কী কী বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে তা প্রকাশের দাবি জানান সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

তিনি বলেন, “পুরো নেগোসিয়েশনের সার্বিক বিষয়টা তো আমাদের জানা নেই। আমরা শুধু ট্যারিফের বিষয়টা জানি।

“সার্বিক বিষয়টা জানার পরে এই বিষয়ে মন্তব্য করতে পারব। এর (ট্যারিফ) বিপরীতে আর কী দিতে হয়েছে সেটা না জানা পর্যন্ত তো এর ইমপেক্টটা কী হবে, সেটা আমরা বলতে পারছি না।”

ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় বসার পর গত ২ এপ্রিল শতাধিক দেশের ওপর চড়া হারে শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। তাতে বাংলাদেশের ওপর বাড়তি ৩৭ শতাংশ শুল্কের ঘোষণা আসে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে এবং সংলাপের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ৬২৬টি পণ্যে শুল্ক ছাড়ের ঘোষণা দেওয়া হয় বাজেটে। এর মধ্যে ১১০টি পণ্যের আমদানি শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়।

কিন্তু তাতে ট্রাম্পের মন গলেনি। যুক্তরাষ্ট্র এবং বাংলাদেশের মধ্যে বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ ৬ বিলিয়ন ডলারের মত। সে কথা তিনি মনে করিয়ে দিয়ে ৭ জুলাই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন, বাংলাদেশের ওপর সম্পূরক শুল্কের হার হবে ৩৫ শতাংশ, যা কার্যকর হবে ১ অগাস্ট।

শুল্কের এই চাপ কমাতে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি অনুযায়ী বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয় বাংলাদেশ। মার্কিন উড়োজাহাজ নির্মাতা কোম্পানি বোয়িংয়ের কাছে ২৫টি উড়োজাহাজ কেনার ঘোষণা আসে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র থেকে গম, সয়াবিন তেল ও তুলা আমদানি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তবে কেবল বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়েই যে চাপ কমেনি তার ইঙ্গিত মিলেছে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরের বিবৃতিতে।

বাংলাদেশের ওপর ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক চূড়ান্ত হওয়ার পর এ দপ্তর বলেছে, “কেবল যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা পণ্যে শুল্ক কমিয়ে সেখানে রপ্তানি করা পণ্যে শুল্ক ছাড় মেলেনি। বরং অশুল্ক বাধা, বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা এবং নিরাপত্তার বিষয়গুলো নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ দূর করতে পদক্ষেপ নিতে হয়েছে।

“প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, কোনো দেশের ওপর শুল্কহার কত হবে, তা নির্ধারিত হবে এসব ক্ষেত্রে তাদের প্রতিশ্রুতির গভীরতার ভিত্তিতে।”

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু বলেন, “নেগোসিয়েশনের পেছনের যে বিষয়গুলো- এটা তো একটা প্যাকেজ। এখানে অনেকগুলো সিদ্ধান্ত হয়েছে। শুধুমাত্র ট্যারিফের কত পারসেন্ট কমানো হলো, সেটাতে তো সিদ্ধান্ত হয়নি।

“এই সিদ্ধান্তের পেছনে অনেক আলাপ-আলোচনা, আমেরিকানরা কী পাঠাতে পারবে? বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের কী দাবি-দাওয়া ছিল, এই বিষয়গুলো প্রকাশ হলে আমরা বুঝতে পারব।”

শুল্কের চাপ কমাতে ২৫টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ, এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে আমীর খসরু বলেন, “কিছু তো করতেই (কেনাকাটা) হবে; কারণ আমেরিকানদের পুরো ট্যারিফের বিষয়টা হচ্ছে, আমেরিকানদের পণ্য রপ্তানির স্বার্থে। সেজন্য তো এই অতিরিক্ত ট্যারিফ আরোপ করা হয়েছে।

কিন্তু সেটা করতে গিয়ে বাংলাদেশ কতটুকু অ্যাবজরভ করতে পারবে, আমাদের অর্থনীতি কতটুকু অ্যাবজরভ করতে পারবে, আমাদের
ব্যবসায়ীরা কতটুকু অ্যাবজরভ করতে পারবে, আমাদের ইকোনমি কতটুকু অ্যাবজরভ করতে পারবে- সেই বিষয়গুলো আলোচনার বিষয়। আমরা বিস্তারিত জানলে সেটার ওপর মন্তব্য করতে পারব।”

তিনি বলেন, “এটা আমাদের মনে রাখতে হবে, এটা শুধুমাত্র একটা ট্যারিফের বিষয় নয়। এর পেছনের আরো যে বিষয়গুলো জড়িত আছে, সেগুলো সম্মিলিতভাবে আমাদের বিবেচনায় আনতে হবে। সেই বিবেচনাটা গুরুত্বপূর্ণ আগামী দিনের জন্য।

“বাট, আমাদের রপ্তানিকারকরা আপাতত স্বস্তি পেয়েছে বলে আমি মনে করি।”

আমীর খসরু বলেন, “বাণিজ্য শুধু আমাদের আমেরিকার সাথে নয়, অন্যান্য দেশে সাথেও আমাদের পণ্য রপ্তানি হয়। সেই জায়গাগুলো বিবেচনায় নিয়ে সম্মিলিতভাবে আমরা কোথায় দাঁড়াচ্ছি সেটা বুঝতে হবে, পর্যালোচনা করতে হবে।”

গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ মোট ৩৯ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে। এর মধ্যে কেবল যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হয়েছে ৭ দশমিক ৫৪ বিলিয়ন ডলার বা মোট পোশাক রপ্তানির ১৯ দশমিক ১৮ শতাংশ।

এর বাইরে জার্মানি, স্পেন, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, পোল্যান্ড, ইতালি, ডেনমার্ক, যুক্তরাজ্যে ও কানাডাতেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পোশাক রপ্তানি হয়ে থাকে। আর অপ্রচলিত বাজারের তালিকায় রয়েছে- জাপান, অস্ট্রেলিয়া, ভারত, তুরস্ক, রাশিয়া, কোরিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়ার মতো দেশ।

যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে পোশাক রপ্তানির নতুন বাজার খোঁজার তাগিদ দিয়েছেন সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

তিনি বলেন, “রপ্তানিটা আমাদের আরো বেশি ডাইভারসিফাই করতে হবে। বিদেশে ডাইভারসিফাই করতে, দেশেও ডাইভারসিফাই…আমাদের শুধু আমেরিকা নির্ভরশীল অর্থনীতি হতে পারে না। সেটাই হচ্ছে আমাদের আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ।

“সেজন্য বাংলাদেশে বিনিয়োগ পরিবেশ, অর্থনীতিতে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ এবং আমাদের যে ক্যাপাসিটি- বিল্ডিং ইউজ অব ড্রিম বিজনেস, যেটা অত্যন্ত নিচে এখন- সেটাকে এই ডিরেগুলেশনের মাধ্যমে, রিভেলুয়েশনের মাধ্যমে আমাদের পরিবর্তন আনতে হবে। বড় ধরনের পরিবর্তন আমাদের আনতে হবে।”

- Advertisement -spot_img
  • সর্বশেষ
  • পঠিত