প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের গণমুখী ও সংস্কারধর্মী নানা উদ্যোগে বাংলাদেশ দ্রুত বদলে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও তার কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন। তিনি বলেছেন, ফ্যাসিবাদের অবসান ঘটিয়ে দীর্ঘ সময় পর অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত বর্তমান সরকার জনগণের প্রত্যাশা ও আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে সুশাসন ও অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত করতে অবিরাম কাজ করে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ সচিবালয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে নিজ দপ্তরে রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন মাহদী আমিন। রোববার (১৬ আগস্ট) বাসস সাক্ষাৎকারটির ভিত্তিতে এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
যেখানে সরকারের ১৮০ দিনের পথচলা, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অর্জন, বৈদেশিক সম্পর্কের উন্নয়ন এবং দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেন মাহদী আমিন।
মাহদী আমিন বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের গণমুখী ও সংস্কারধর্মী নানা উদ্যোগে দ্রুত বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশ। দেড় দশকের ভাঙাচোরা রাষ্ট্রকাঠামো পুনর্গঠন, জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা এবং ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতিতে পথ চলছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার।’
সাক্ষাৎকারে সারা দেশে কৃষি ঋণ মওকুফ, ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ, খাল খনন ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির মতো গণমুখী উদ্যোগ এবং বন্ধ শ্রমবাজারগুলো পুনরায় চালুর বিষয়গুলো উঠে আসে। একই সঙ্গে বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সংকট মোকাবিলায় সরকারের প্রস্তুতি, বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ এবং দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠার বাস্তবসম্মত রূপরেখা নিয়েও কথা বলেন তিনি।
বিগত দেড় দশকের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও দেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণ প্রসঙ্গে মাহদী আমিন বলেন, ‘২০১৪ সালের বিনা ভোটে প্রহসনের নির্বাচন, ২০১৮ সালের নিশি রাতের ভোট কিংবা ২০২৪ সালের ডামি নির্বাচনের মতো অন্ধকার অধ্যায় দেখেছে এ দেশের মানুষ। সেই সময়ে একটি অনির্বাচিত সরকার ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠা করে জনগণের মৌলিক স্বাধীনতা ও অধিকার কেড়ে নিয়েছিল। তাদের ক্ষমতার মূল ভিত্তি ছিল নতজানু পররাষ্ট্রনীতি। তবে সেই ফ্যাসিবাদের শৃঙ্খল ভেঙে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে আজ যে গণমুখী ও নির্বাচিত সরকার গঠিত হয়েছে, তার ক্ষমতার একমাত্র উৎস এ দেশের জনগণ। জনগণের অকৃত্রিম ভালোবাসাকে সম্বল করে সরকার প্রতিটি ক্ষেত্রে পরিবর্তন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।’
সরকারের গত ছয় মাসের উল্লেখযোগ্য অর্জন তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, নির্বাচনের পর মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকেই কৃষক সমাজের পাশে দাঁড়িয়ে সুদে-আসলে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ মওকুফের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রায় ১৩ লাখের বেশি কৃষক সরাসরি উপকৃত হয়েছেন।
এর পাশাপাশি দেশে নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে এবং গৃহস্থালি অর্থনীতিতে গতি আনতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করা হয়েছে। একই সঙ্গে ইমাম, মুয়াজ্জিন, খতিব এবং অন্যান্য ধর্মীয় প্রধানদের জন্য সরকারি ভাতা চালু, খান খনন ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির মতো প্রকল্পগুলো মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান রূপ নিয়েছে।
গ্রামীণ অর্থনীতিতে ফ্যামিলি কার্ড প্রকল্পের প্রভাব উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বিশ্বের বহু আন্তর্জাতিক সংস্থা ও উন্নয়ন সহযোগী আমাদের এই ফ্যামিলি কার্ডের ধারণাকে অত্যন্ত প্রশংসা করেছে। এটি কেবল অর্থ সহায়তা নয়; বরং নারীদের স্বনির্ভর ও মর্যাদাবান করে তোলার একটি নীরব বিপ্লব। নারীরা এই অর্থ সন্তানের পড়াশোনা, পরিবার ও ক্ষুদ্র ব্যবসার কাজে লাগাচ্ছেন। কার্ড বিতরণে কিছু কারিগরি অসংগতি নজরে এলে দ্রুততম সময়ে ডেটাবেজ হালনাগাদ ও ‘প্রক্সি মিন্স টেস্ট’ সংস্কারের কার্যক্রম জোরদার করা হচ্ছে, যেন কেবল প্রকৃত প্রাপ্য ব্যক্তিরাই এর সুবিধা পান।’
বিদ্যুৎ, গ্যাস ও নিত্যপণ্যের বাজার প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র বলেন, ‘দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই পবিত্র রমজান ও দুটি ঈদে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং শ্রমিকদের বকেয়া বেতন-বোনাস সঠিক সময়ে পরিশোধ নিশ্চিত করা সরকারের একটি বড় সফলতা ছিল। তবে ফ্যাসিবাদ আমলের বিগত দেড় দশকে ধারাবাহিকভাবে গড়ে ওঠা জ্বালানি সংকট ৬ মাসে শতভাগ সমাধান করা দুরূহ কাজ। তদুপরি মার্কিন ইউএস-বাংলাদেশ বিজনেস কাউন্সিল, মালয়েশিয়ার পেট্রোনাস এবং চীনা বিনিয়োগকারীদের সাথে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে বিকল্প সোর্স থেকে সাশ্রয়ী মূল্যে গ্যাস ও জ্বালানি নিশ্চিত করার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।’
বিভিন্ন দেশের শ্রমবাজারের সম্ভাবনার বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে মাহদী আমিন জানান, মালয়েশিয়ার সঙ্গে নিবিড় আলোচনার মাধ্যমে বন্ধ থাকা শ্রমবাজার চালু চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি আগস্ট মাসের শেষ নাগাদ এই জটিলতার অবসান ঘটবে বলে আশা করা হচ্ছে। এটি চালু হলে পরবর্তী চার মাসে অন্তত এক লাখের বেশি কর্মী সেখানে যাওয়ার সুযোগ পাবেন।
তিনি আরও বলেন, কেবল নির্দিষ্ট খাত নয়; বরং রিয়েল এস্টেট, এগ্রিকালচার ও ম্যানুফ্যাকচারিংসহ সবকটি খাতে আমাদের কর্মীরা অংশ নিতে পারবেন। এছাড়া জাপান, ওমান, জর্ডান এবং মধ্যপ্রাচ্য ছাড়া ইউরোপের অন্যান্য দেশে দক্ষ জনশক্তি পাঠাতে কারিগরি ভাষা শিক্ষা প্রশিক্ষণ ও জামানতহীন বিশেষ ঋণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। একই সঙ্গে পূর্ব ইউরোপের বাজারগুলোতে নতুন করে আমাদের জনশক্তি রপ্তানি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিগত ৬ মাসে দেশে বাকস্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা শতভাগ সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ‘দেশ পরিচালনায় চরম সমালোচনা কিংবা উস্কানিমূলক আচরণের মুখোমুখি হয়েও সরকার সর্বোচ্চ রাজনৈতিক ধৈর্য প্রদর্শন করেছে। আইনশৃঙ্খলার ক্ষেত্রে পুলিশ ও প্রশাসনকে ফ্যাসিবাদী মানসিকতা থেকে বের করে এনে একটি প্রকৃত সেবামুখী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা হচ্ছে। হাতি হত্যা থেকে শুরু করে ছোট-বড় সব অপরাধের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচারপ্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। কোনো অপরাধীকেই দলীয় বা রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়া হচ্ছে না।’
পররাষ্ট্রনীতির সুনির্দিষ্ট অবস্থান তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা বলেন, ‘আমাদের বৈদেশিক নীতির মূল কথাই হলো ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। ভারতসহ বিশ্বমঞ্চের সকল রাষ্ট্রের সাথে আমরা সমতা, ন্যায়বিচার ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে গভীর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক চাই। দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করার যে আইনি প্রক্রিয়া, তাতে একটি বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্র হিসেবে ভারত পূর্ণ সহযোগিতা করবে বলে বর্তমান সরকারের প্রত্যাশা।’
অর্থনৈতিক প্রসারে সরকারের নতুন রোডম্যাপ তুলে ধরে সাক্ষাৎকারে মাহদী আমিন বলেন, দেশের অর্থনৈতিক ভিত সুদৃঢ় করতে ও আগামী দিনে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ার লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাজ করছে। ব্যবসা সহজীকরণে ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’ কার্যকরকরণ, বন্দরে ২৪ ঘণ্টা কার্গো সার্ভিস চালুর সিদ্ধান্ত এবং অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়াতে কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ছাড় দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ভুলত্রুটি শুধরে নিয়ে সরকারের যে সততা, সদিচ্ছা ও দায়বদ্ধতা রয়েছে, তা কাজে লাগিয়েই ইনশাল্লাহ বাংলাদেশ একটি সমৃদ্ধ ও আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্র হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে।
সূত্র: বাসস

