শনিবার, আগস্ট ৮, ২০২৬

পাচারমুক্ত বাংলাদেশ

নুহা তানহিয়াহ

চেরাগি নিউজ ডেস্ক

সদ্য অতিক্রান্ত ৩০ জুলাই ‘বিশ্ব মানব পাচারবিরোধী দিবস’ হিসেবে চিহ্নিত। মানব পাচার সম্পর্কে গণসচেতনতা বৃদ্ধি এবং পাচারের শিকার ব্যক্তিদের অধিকার সুরক্ষার লক্ষ্যে জাতিসংঘ কর্তৃক দিবসটি প্রবর্তিত হয়েছে। মানব পাচার আজ মানবাধিকার ও জাতীয় বিপর্যয়ের এক ভয়াবহ রূপ।
২০২৬ সালের জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময়ে ভারতের জাতীয় তদন্ত সংস্থা (এনআইএ) উত্তর ২৪ পরগনার বংগাঁর সাহাবুদ্দিন মণ্ডল ও তাঁর ছয় সহযোগীর নেতৃত্বাধীন একটি আন্তঃসীমান্ত মানব পাচার চক্রের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে। অভিযোগ, এই চক্রটি ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের বেড়াবিহীন বংগাঁ ও বাগদা এলাকা দিয়ে বাংলাদেশিদের অবৈধভাবে ভারতে ঢুকিয়ে হাওড়া হয়ে দিল্লি, মুম্বাই, বেঙ্গালুরু ও হায়দরাবাদসহ বিভিন্ন শহরে পাঠাত। এটি ২০২৬ সালের বৃহত্তর অভিযানেরই অংশ, যেখানে লখনৌয়ের বিশেষ আদালত ১৩ বাংলাদেশি ও দুজন রোহিঙ্গাসহ ১৫ পাচারকারীকে পাঁচ বছর করে কারাদণ্ড দেন। একই সঙ্গে তদন্তকারীরা অনুপ্রবেশকারীদের সহায়তাকারী টেলিগ্রাম নেটওয়ার্কের সন্ধান পায়।
১০ ডিসেম্বর ২০২৫, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবসে, ঢাকা সিআইডি বনানীর একটি ম্যাসাজ পার্লারে অভিযান চালিয়ে যৌন নির্যাতনের শিকার ১২ জন—ছয় কন্যাশিশুসহ—উদ্ধার করে এবং ছয় পাচারকারীকে গ্রেপ্তার করে।
আইজেএমের বাংলাদেশে সমর্থিত প্রথম এই অভিযান একটি এমন চক্রের সন্ধান পায়, যারা ২০ জন নারী ও শিশুকে আটকে রেখে প্রতিদিন ১০ জন পর্যন্ত গ্রাহকের কাছে পাঠাত।
২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) মতিঝিলের একটি হোটেলে অভিযান চালিয়ে চার রোহিঙ্গা ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে। তারা একটি মানব পাচার চক্র পরিচালনার কথা স্বীকার করে।
অভিযানকালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ওই চক্র পরিচালনায় ব্যবহৃত মোবাইল ফোন এবং কয়েকটি জাল ভিসা জব্দ করে।
কর্মসংস্থানের লোভ দেখিয়ে কম্বোডিয়ার সাইবার স্ক্যাম চক্রে পাচার করা হাজারো বাংলাদেশির মধ্যে ৫৮৩ জনকে ২০২৬ সালের ১ জুলাই উদ্ধার করা হয়।
এ ধরনের অজস্র ঘটনা আমাদের চারপাশে ঘটে থাকে। সমস্যার বাস্তবতা কতটা ভয়াবহ, তা আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনেই স্পষ্ট। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের ২০২৫ সালের ট্রাফিকিং ইন পারসনস (টিআইপি) রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশ ‘টিয়ার-২’-এ রয়েছে।
অর্থাৎ, বাংলাদেশ মানব পাচার ঠেকাতে উল্লেখযোগ্য চেষ্টা করেছে, কিন্তু পূর্ণ মানদণ্ড অর্জন করতে পারেনি। ওই বছর সরকার ১ হাজার ৪৬২ জন পাচারের শিকার ব্যক্তিকে শনাক্ত করেছে। আর বেসরকারি সংস্থা ও আন্তর্জাতিক সংগঠন মিলে আরও ৩ হাজার ৪১০ জনকে চিহ্নিত করেছে। অর্থাৎ, প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি।
মানব পাচারের মূল কারণ দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও মর্যাদাজনক কর্মসংস্থানের অভাব। এসব কারণে তরুণেরা বিদেশে ভালো বেতনের প্রলোভনে ঝুঁকিপূর্ণ পথে পা বাড়ায়। এ ছাড়া বাল্যবিবাহ, জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক প্রতারণা এবং দুর্বল আইন প্রয়োগ ও খালাসের সংস্কৃতি পাচারকারীদের উৎসাহিত করে।
পাচার মোকাবিলায় রাষ্ট্র ইতোমধ্যে বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ২০২৬ সালের ‘মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান (প্রতিরোধ ও দমন) আইন’ সাইবার স্ক্যাম ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রতারণাকে কঠোর শাস্তির আওতায় এনেছে। ভুক্তভোগী শনাক্ত ও সেবার জন্য চালু হয়েছে ডিজিটাল জাতীয় রেফারেল মেকানিজম (এনআরএম)। দ্রুত বিচারের জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল এবং ‘প্রতিরোধ-সুরক্ষা-বিচার-অংশীদারিত্ব’ চার-স্তম্ভভিত্তিক জাতীয় কর্মপরিকল্পনা (২০২৬-২০৩০) গ্রহণ করা হয়েছে।
পাচার ঠেকাতে নাগরিক হিসেবে আমাদের সচেতন হতে হবে। বিদেশ গমনের আগে বিএমইটি ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে চাকরি, নিয়োগকারী ও ভিসা যাচাই, রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স দেখা, ভিজিট ভিসায় চাকরির প্রলোভন এড়িয়ে চলা, পাসপোর্ট কারও কাছে না দেওয়া, সন্দেহজনক দালাল সম্পর্কে ৯৯৯ বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানো, ফেরত আসা ভুক্তভোগীদের পুনর্বাসনে সহায়তা করা এবং শিশুদের জন্মনিবন্ধন নিশ্চিত করা পাচার রোধের কার্যকর উপায়।
পাচারমুক্ত বাংলাদেশ গঠনে পুলিশ বা আদালতের একার প্রচেষ্টা যথেষ্ট নয়।
এর জন্য প্রয়োজন প্রতিটি নাগরিকের সচেতন হওয়া। কেননা, সচেতন নাগরিক অন্য নাগরিককে সচেতন করে। আর কেবল সচেতন নাগরিকই নিশ্চিত করতে পারে পাচারমুক্ত বাংলাদেশ।

লেখক: নুহা তানহিয়াহ

ডিপার্টমেন্ট অব ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

(২০২৫-২০২৬) সেশন।

- Advertisement -spot_img
  • সর্বশেষ
  • পঠিত