মঙ্গলবার, আগস্ট ৪, ২০২৬

৫ আগস্ট: ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক বিজয়, ফ্যাসিস্ট হাসিনার পলায়ন

জহিরুল ইসলাম জহির

চেরাগি নিউজ ডেস্ক

ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা তার দীর্ঘ শাসনামলে অহংকার করে বার বার বলেছিলেন, ‘শেখ হাসিনা পালায় না’। কিন্তু চব্বিশের ৩৬ জুলাই অর্থাৎ ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ভারতে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন খুনী হাসিনা। এর মাধ্যমে প্রায় ১৭ বছরের স্বৈরশাসনের অবসান ঘটে প্রিয় মাতৃভূমির। স্বৈরশাসনের কবল থেকে মুক্তি পায় বাংলাদেশ। হাসিনার অনুগত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠন যুবলীগ ও ছাত্রলীগ, হেলমেট বাহিনীর সশস্ত্র ক্যাডারদের হামলায় জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শত শত মানুষ নিহত এবং অসংখ্য মানুষ আহত হন। অজস্র জুলাই যোদ্ধার চোখের আলো নিভে যায়। অনেকেই অন্ধত্ব বরণ করেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থান আমাদের দ্বিতীয় স্বাধীনতা এনে দিয়েছে, এনে দিয়েছে বাক স্বাধীনতা।

স্বৈরাচার হাসিনা শাসনামলে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে টানা আন্দোলন শুরু হয়েছিল চব্বিশের ১ জুলাই। অহিংস এ আন্দোলন সহিংস হয় ১৫ জুলাই থেকে। কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকার’ স্লোগানের জবাব ছাত্রলীগই দেবে বলে মন্তব্য করেছিলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। দুপুরে কোটা সংস্কার আন্দোলনে যারা ‘আমি রাজাকার’ স্লোগান দিচ্ছেন, তাদের শেষ দেখিয়ে ছাড়বেন বলে মন্তব্য করেন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাদ্দাম হোসেন। এর আগে শেখ হাসিনা গণভবনে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের রাজাকারের বাচ্চা বলে গালি দেন। অহিংস আন্দোলন ধীরে ধীরে সহিংস রুপ ধারণ করে ১৬ জুলাই রংপুরে আন্দোলনকারী বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ পুলিশের সামনে দাঁড়িয়ে দুহাত প্রসারিত করে বুলেটে নিহত হওয়ার সেই ভিডিও সারাবিশ্বসহ বাংলাদেশের সমস্ত মানুষকে খুনী হাসিনা বিরোধী আন্দোলন ত্বরান্বিত করতে সহায়তা করে। ১৬ জুলাই বার আউলিয়ার পূণ্য ভূমি চট্টগ্রামের মুরাদপুরে ছাত্রলীগ-যুবলীগের গুলিতে চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্রদলের সদস্য, শহীদ জিয়া স্মৃতি পাঠাগারের ১২৫৫ নং সদস্য ওয়াসিম আকরাম মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লে বাংলার জাতীয়তাবাদী শক্তির খুনি হাসিনাবিরোধী আন্দোলন ছাত্র-জনতার মাঝে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। চট্টগ্রামে ঐদিন শহীদ ওয়াসিম আকরাম সহ মোট ৩ জনের মৃত্যু হয়। ঢাকার কোটা বিরোধী আন্দোলন সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। পুলিশের গুলি ক উপেক্ষা করে লাশের উপর দাঁড়িয়ে স্লোগান স্লোগান মুখরিত হয় সারাদেশের রাজপথ।ঢাকা পরিণত হয় মৃত্যুপুরীতে। সারাদেশে শুরু হয় বিএনপির ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের গ্রেফতার -নির্যাতন। তৎকালীন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী লড়াই সংগ্রামে আমাদের বিএনপি যুবদল-ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা রাজপথেই ছিলো। গুম খুন জেল-জরিমানা, গায়েবি মামলার বেড়াজাল সব হাসিমুখে মেনে নিয়ে এদেশের জনগণের নেতা জনাব তারেক রহমানের নেতৃত্বে খুনী হাসিনার পতনের মধ্য দিয়েই চুড়ান্ত বিজয় আসে। প্রিয় বাংলাদেশ ফ্যাসিস্ট মুক্ত হয়। এদেশের মানুষ দ্বিতীয় স্বাধীনতা অর্জন করে।

১৭ জুলাইয়ের পর থেকেই সারা বাংলাদেশের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়, প্রাইভেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল কলেজ এমনকি মাদ্রাসার ছাত্র -ছাত্রীরা সবাই রাজপথে নেমে আসতে শুরু করে। হাসিনার প্রশাসনও নেমে উঠে খুন, গুম আর গ্রেফতার বাণিজ্যে। ছোট ছোট স্কুলের বাচ্চাদের মামলার বেড়াজালে গ্রেফতার করতেও ওদের মায়া লাগে নাই। আন্দোলন চুড়ান্ত রুপ পায় জুলাইয়ের শেষ দিকে। ছাত্রদের পক্ষ থেকে আসতে থাকলো কর্মসুচি, নামগুলোও ছিল সুন্দর স্মার্ট যেমন বাংলা ব্লকেড, মার্চ ফর জাস্টিস’, রিমেম্বারিং আওয়ার হিরোজ’, কমপ্লিট শাটডাউন, দেয়াল লিখন ও গ্রাফিতি কর্মসূচি পালন করেন আমাদের কার্টুনিস্টরা। কর্মসূচিতে সাধারণ মানুষ যার যার জায়গা থেকে পানি কিনে দিয়ে, কেউ নাস্তা করাইয়ে সবাই ছাত্রদের পাশে ছিলো। সাধারণ জনগন সব সময় ছাত্রদের পাশে ছিলো।

প্রতিটি দিন তখন নতুন নতুন ইতিহাস সৃষ্টি হয়। গদি রক্ষায় ইন্টারনেট বন্ধ করে নিত্য নতুন কুটচালে ব্যস্ত হাসিনা গং। মেট্রোরেলে আগুন দিয়ে হাসিনার মায়া কান্নার নাটক অন্য দিকে হাসপাতালের মর্গে লাশের সারি বড় হতে থাকলো দিনের পর দিন। হেলিকপ্টার থেকেও গুলি করা হলো শিক্ষার্থীদের এতো লাশের পরও হাসিমুখে মৃত্যুকে বরণ করার আন্দোলন রুখবার সাধ্য কারো ছিলো না। মুগ্ধ’র সেই কথা পানি লাগবে, কারো পানি লাগবে। মানুষের চোখ ভিজে যায় আজও। স্কুলের ছেলেরা বাসায় চিরকুট লিখে আন্দোলন অংশ নেওয়ার বিরল ইতিহাস শুধু জুলাই গণঅভ্যুত্থানেরই। জুলাই মাস বড় হতে থাকলো। ৩১ জুলাই আসলো কিন্তু আমরা আগষ্ট না আমরা জুলাই কে ধারণ করলাম ফ্যাসিবাদের পতনের জন্য। সারাদেশে দেয়ালে গ্রাফিতি আর হাসিনার পা-চাটা প্রশাসনের কুকীর্তি। সারাদেশে তখন একটাই দাবী হাসিনার পদত্যাগ। হাসিনাকে গদিতে আর এক মুহূর্তেও দেখতে চায়নি এদেশের জনগণ। দলমতনির্বিশেষে সবার দাবি একটাই হাসিনার পদত্যাগ। ৩১ জুলাই মার্চ ফর জাস্টিস কর্মসুচির ৩২ জুলাই পর ( ১আগষ্ট ) ডিবি হেফাজতে থাকা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ৬ সমন্বয়ককে ছেড়ে দেওয়া হয়। দুপুর দেড়টার একটু পরেই তারা ডিবি কার্যালয় থেকে কালো রঙের একটি গাড়িতে বেরিয়ে আসেন। জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরকে নিষিদ্ধ করে প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার। রাজপথ সহ সারাদেশ তখন হাসিনা বিরোধী আন্দোলনে ঐক্যবদ্ধ। দাবী একটাই হাসিনা তুই কবে যাবি।

৩৩ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে জুমার নামাজের পর ‘প্রার্থনা ও ছাত্র-জনতার গণমিছিল’ কর্মসূচি পালিত হয় ২৮ জেলায়। একই সঙ্গে পালন করা হয় শিক্ষক ও নাগরিক সমাজের ‘দ্রোহযাত্রা’ কর্মসূচি। শিল্পীসমাজের ব্যতিক্রমী প্রতিবাদে শামিল হন সর্বস্তরের মানুষ। যা প্রতিটি মানুষকে রাজপথে আরো বেশি সম্পৃক্ত করেছে। যার ফলে খুনি হাসিনার পতনে সমাজের সব পেশার মানুষকে এক করে রাজপথের আন্দোলনকে ত্বরান্বিত করেছিলো।

চব্বিশের ৩৫ জুলাই অর্থাৎ ৪ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাহেবের সাথে পরামর্শ করে একদিন এগিয়ে এনে যা ৬ আগষ্ট করার কথা ছিলো, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের পদত্যাগের ইঙ্গিত দিয়ে ৫ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ঘোষণা দেন। সরকার পদত্যাগের এক দফা দাবিতে শিক্ষার্থীদের সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনে সারা দেশে কমপক্ষে ১১৪ জন নিহত হন একদিনেই। সারাদেশে নিস্তব্ধতা, মানুষের চোখে মুখে হাসিনার পতনের সেই কাঙ্ক্ষিত মুহুর্তের অপেক্ষা।

কড়াকড়ি কারফিউ উপেক্ষা করে ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি সফল করতে হাজার হাজার মানুষ রাজধানী ঢাকা অভিমুখে পদযাত্রা করে। দেশজুড়ে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার লাখ লাখ মানুষ রাজপথে নেমে আসেন। পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান শেখ হাসিনা। সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান শেখ হাসিনার পদত্যাগের খবর নিশ্চিত করার পর জনতার উল্লাসে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে চারদিক। এক মুহূর্তেই ভেঙে পড়ে শেখ হাসিনার ক্ষমতার আধিপত্য এবং আওয়ামী লীগের কথিত রাজনৈতিক দুর্গ। শেখ হাসিনা হঠাৎ দেশত্যাগ করার পরও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী রাজধানীসহ সারা দেশে ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালায়। এতে অনেক মানুষ নিহত ও আহত হন। রাজধানীর রাজপথ দখলে নেয় স্বৈরাচার হঠানোর আন্দোলনে অংশ নেওয়া ছাত্র-জনতা। তাদের মধ্যে হাজার হাজার বিক্ষুব্ধ মানুষ শেখ হাসিনার সরকারি বাসভবন গণভবনে প্রবেশ করে বিজয় উদযাপন করে। শুধু গণভবন নয়, শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করার পর অসংখ্য মানুষ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও জাতীয় সংসদেও প্রবেশ করে। দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শিশু, বৃদ্ধ, শ্রমজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী-সবাই রাজপথে নেমে দীর্ঘদিনের একনায়কতান্ত্রিক শাসনের পতন উদযাপন করে।

সেই দিন ঢাকার রাজপথে থাকার সৌভাগ্য আমারও হয়েছিলো। ঢাকার রাজপথে মানুষের মিছিল আর মিছিল। চারিদিকে মানুষের রাজপথে নেমে বিজয়ের আনন্দ করতে দেখেছি নিজের স্বচক্ষে।পরিবারের সবাই একসাথে রাস্তায় নেমে এমন উদযাপন এদেশের ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে থাকবে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট, বিকেল প্রায় সোয়া ২টায় , শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেন এবং তার বোন শেখ রেহানার সঙ্গে সি-১৩০জে হেলিকপ্টারে করে দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যায়। তিনি আগরতলা হয়ে দিল্লিতে পৌঁছান। পলায়নের আগে তিনি একটি বক্তব্য রেকর্ড করার ইচ্ছা প্রকাশ করলেও সে সুযোগ টুকুও দেওয়া হয়নি।

এ বিজয় দীর্ঘ ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনের ফসল। কোটা বিরোধি আন্দোলন থেকে হাসিনার পতন ঘটিয়েছে কিন্তু হাসিনা যে ফ্যাসিস্ট এটার ইতিহাসে জড়িয়ে আছে বিএনপি সহ গণতান্ত্রিক আন্দোলনের রাজনৈতিক শক্তির ১৭ বছরের দীর্ঘ রাজনৈতিক আন্দোলনের বিজয়। দেশের মানুষের মুখে হাসি, এদেশ পেলো নতুন নেতা বিএনপির তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ও দীর্ঘ ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনের সকল শহীদদের রুহের মাগফেরাত কামনা করছি বিজয়ের এই দিনে। দীর্ঘ রাজনৈতিক আন্দোলন সংগ্রামের সকল আহত যোদ্ধা, গুমের শিকার পরিবারসহ আহত জুলাই যোদ্ধাদের পাশে থাকবে সরকার এটাই আমাদের চাওয়া। ভালো থাকুক প্রিয় স্বদেশ। সবার আগে বাংলাদেশ, বাংলাদেশ জিন্দাবাদ।

লেখক : জহিরুল ইসলাম জহির
সাবেক সহ-দপ্তর সম্পাদক,
চট্টগ্রাম মহানগর যুবদল।

- Advertisement -spot_img
  • সর্বশেষ
  • পঠিত