মঙ্গলবার, আগস্ট ৪, ২০২৬

সংখ্যার অর্থনীতি, মানুষের বাস্তবতা

আবদুল্লাহ মজুমদার

নিজস্ব প্রতিবেদক

মাসের শুরুতে বাজারের ব্যাগে যে স্বস্তির আভাস থাকে, মাসের শেষ দিকে সেটিই যেন ধীরে ধীরে অনিশ্চয়তার প্রতীকে পরিণত হয়। বাজারে দাঁড়িয়ে এখন মানুষ শুধু পণ্যের দামই দেখেন না, নিজের সামর্থ্যেরও হিসাব কষেন। কোনটি কেনা হবে, আর কোনটি পরের মাসের জন্য তুলে রাখতে হবে—এমন সিদ্ধান্ত এখন অনেক পরিবারের দৈনন্দিন বাস্তবতা। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে বিদ্যুৎ বিলের ক্রমবর্ধমান চাপ। ফলে অর্থনীতির সামষ্টিক সূচক কিছু ইতিবাচক ইঙ্গিত দিলেও সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা বলছে, জীবনযাত্রার ব্যয় আয়ের তুলনায় দ্রুত বেড়ে চলেছে। এই ব্যবধানই আজ জনজীবনের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ।

মূল্যস্ফীতি অর্থনীতির একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। তবে সেটি যখন দীর্ঘ সময় ধরে মানুষের আয় বৃদ্ধিকে ছাড়িয়ে যায়, তখন তা কেবল অর্থনৈতিক সূচকের বিষয় থাকে না; সামাজিক বাস্তবতায়ও গভীর প্রভাব ফেলে। একই আয়ে কম পণ্য কেনা যায়, ক্রয়ক্ষমতা কমে, সঞ্চয় ক্ষয় হয় এবং জীবনযাত্রার মান নেমে আসে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন নির্দিষ্ট আয়ের চাকরিজীবী, শ্রমজীবী মানুষ, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবার। অর্থনীতির পরিভাষায় এটি প্রকৃত আয়ের সংকোচন; সাধারণ মানুষের ভাষায় এটি সংসার চালানোর ক্রমবর্ধমান কঠিনতা।

দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির পেছনে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ—উভয় কারণই কাজ করছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, ডলারের বিনিময় হারের পরিবর্তন এবং পরিবহন ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি মূল্যস্ফীতিকে প্রভাবিত করে। একই সঙ্গে বাজার ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা, সরবরাহ শৃঙ্খলের অদক্ষতা এবং বিভিন্ন সময়ে সিন্ডিকেট বা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির অভিযোগও পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে। ফলে উৎপাদক ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন, আবার ভোক্তাকেও বেশি দাম গুনতে হয়। এই ব্যবধান বাজারের স্বাভাবিক প্রতিযোগিতাকে দুর্বল করে এবং জনআস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

বিদ্যুৎ খাতের ক্ষেত্রেও একই ধরনের বাস্তবতা দেখা যায়। জ্বালানি আমদানির ব্যয়, উৎপাদন খরচ এবং অবকাঠামোগত বিনিয়োগের চাপ বাস্তব। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই ব্যয়ের কতটা দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মোকাবিলা করা সম্ভব হয়েছে, আর কতটা শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর বর্তেছে? যদি মূল্য সমন্বয়ই প্রধান নীতিগত প্রতিক্রিয়া হয়ে দাঁড়ায়, অথচ উৎপাদন দক্ষতা বৃদ্ধি, সিস্টেম লস কমানো, অপচয় রোধ এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতে দৃশ্যমান অগ্রগতি না ঘটে, তবে জনঅসন্তোষ তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।

বিদ্যুৎ বিল ও দ্রব্যমূল্যের মধ্যে একটি প্রত্যক্ষ সম্পর্কও রয়েছে। বিদ্যুতের ব্যয় বাড়লে শিল্প উৎপাদন, সংরক্ষণ ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পায়। সেই অতিরিক্ত ব্যয় শেষ পর্যন্ত পণ্যের মূল্যের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ভোক্তার ওপরই বর্তায়। অর্থাৎ বিদ্যুৎ বিলের চাপ মূল্যস্ফীতিকে আরও ত্বরান্বিত করতে পারে, আর মূল্যস্ফীতি আবার মানুষের প্রকৃত আয়কে সংকুচিত করে। এই চক্র দীর্ঘস্থায়ী হলে অর্থনীতির পাশাপাশি সামাজিক স্থিতিশীলতাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এ পরিস্থিতিতে সাময়িক বাজার তদারকি বা বিচ্ছিন্ন প্রশাসনিক পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন বাজারব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কার। কৃষিপণ্যের সংরক্ষণ ও বিপণন ব্যবস্থার উন্নয়ন, সরবরাহ শৃঙ্খলের দক্ষতা বৃদ্ধি, প্রতিযোগিতামূলক বাজার নিশ্চিত করা, আইন প্রয়োগে নিরপেক্ষতা এবং বিদ্যুৎ খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা—এসব ক্ষেত্রেই দীর্ঘমেয়াদি মনোযোগ জরুরি। পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আর্থিক ও মুদ্রানীতির কার্যকর সমন্বয় এবং নিম্নআয়ের মানুষের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিধি ও কার্যকারিতা বাড়ানোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

অর্থনৈতিক সংকটের সময় রাষ্ট্র, ব্যবসায়ী ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা—সবারই নিজ নিজ দায়িত্ব রয়েছে। তবে নীতি নির্ধারণ, বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রধান দায়িত্ব রাষ্ট্রেরই। কারণ কার্যকর প্রতিষ্ঠান ছাড়া বাজার কখনোই ন্যায্য ও স্থিতিশীল হতে পারে না।

অর্থনীতির সাফল্য শেষ পর্যন্ত প্রবৃদ্ধির গ্রাফে নয়, মানুষের জীবনমানেই প্রতিফলিত হয়। একজন সাধারণ মানুষ যদি মাস শেষে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় বাজার করতে পারেন এবং ভবিষ্যতের জন্য কিছু সঞ্চয়ও রাখতে পারেন, তবেই অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্থবহ হয়ে ওঠে। তাই দ্রব্যমূল্য ও বিদ্যুৎ বিলকে সহনীয় পর্যায়ে রাখা শুধু অর্থনৈতিক নীতির প্রশ্ন নয়; এটি সামাজিক ন্যায়, জনআস্থা এবং টেকসই উন্নয়নেরও পূর্বশর্ত। অর্থনীতির প্রকৃত শক্তি সংখ্যায় নয়—মানুষের জীবনে তার ইতিবাচক প্রতিফলনেই।

লেখক: সাহিত্য সম্পাদক, দৈনিক আমাদের চট্টগ্রাম।

 

- Advertisement -spot_img
  • সর্বশেষ
  • পঠিত