অনেকেই বলেন কবি হওয়া খুব কঠিন। আবার কেউ কেউ বলেন কাগজ কলম হাতে নিলেই কবিতার পর কবিতা বের হয়। তবে আমি বিশ্বাস করি— দুটো ভাবনাই সঠিক। যে পারে তার জন্য কবিতা লিখা পানির মতো সহজ আবার যে কবিতা বিষয়টাই বুঝে উঠতে পারে না তার জন্য কবিতা লিখা কঠিনই বটে।
অনুপ্রেরণা কাব্যগ্রন্থের লেখক কবি এস এম পিন্টু একজন দক্ষ সাংবাদিক। সাংবাদিকতার পাশাপাশি তিনি কবিতা, প্রবন্ধ, গল্প লেখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তার কবিতাগুলো সমাজের দর্পণ হয়ে কথা বলে। তার কবিতার শব্দমালায় নীল নীল ভালোবাসার ছোঁয়া দেখতে পাই। আবার তাঁর কবিতায় বাবা—মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা, দায়িত্ববোধের আকুলতা আপনার মনকে ছুঁয়ে দিতে বাধ্য করবে।

বইয়ের নামকরণ নিয়ে যদি বলতে হয় তাহলে বলি- কবিতা লিখতে গিয়ে, জীবনে রাঙাতে গিয়ে কবি অনেক নামজাদা কবির কবিতা ও আদর্শবান ব্যক্তিত্বদের জীবনকে অনুপ্রেরণা হিসেবে গ্রহণ করেছেন এবং কবি এস.এম পিন্টুর কবিতা ও জীবন বোধ আগামী প্রজন্মের কবিতা চর্চা, জীবনকে গড়ে তুলতে প্রেরণা হয়ে কাজ করবে বলে বিশ্বাস করি।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে যাঁরা অকাতরে নিজের জীবন দান করেছেন এবং আজকের স্বাধীন বাংলাদেশের পেছনে যাঁদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও সাহসী ভূমিকা ছিলো তাঁদের প্রতি ‘অনুপ্রেরণা’ কাব্যগ্রন্থটি উৎসর্গ করে কবি একজন দেশপ্রেমিক নাগরিকের দায়িত্ব পালন করেছেন।
এবার বইয়ের কবিতা নিয়ে একটু আলোকপাত করার চেষ্টা করি। প্রথম কবিতা ‘অনুপ্রেরণা’য় কবি লিখেছেন, ‘অন্ধকার রাতের শেষে ভোর আসে আলো নিয়ে/হতাশার ছায়া গলে যায় সূর্যের দীপ্তি ছুঁয়ে/পথে যদি থাকে কাঁটা, পা তবুও থামে না/অনুপ্রেরণাই শেখা মানুষ, হার মানা,মানে না। … ছোট্ট বীজে লুকায় যে মহীরুহের গান/তেমনি হৃদয়ে লুকায় স্বপ্ন, করে মানুষ মহান/পড়ে গেলে ওঠার সাহস, স্বপ্ন ছোঁয়ার ডানা/জীবন জয়ের মূলমন্ত্র, অন্তরে অনুপ্রেরণা। ‘ কবি তার কবিতায় যথার্থই বলেছেন, মানুষের জীবনে কখনো হার মানতে নেই, জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ক্লান্তি, হতাশা, পরাজয়কে জয় করে জীবনযুদ্ধে জয়ী হতে প্রেরণা যুগিয়েছেন।
“স্বর্গ চাই না ‘মা’ ছাড়া” কবিতাটি নিয়ে কেমন করে আলোচনা করবো তা ভেবে ভেবে আমি নিজেই হয়রান পেরেশান। আমার কাছে ‘মা’ আর স্বর্গ সমার্থক শব্দ বলে মনে হয়। পবিত্র গ্রন্থের বাণীতেও আছে, ‘মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত।’ নয় মাস দশ দিন সন্তানকে পেটে ধরে একজন ‘মা’ যে ত্যাগ বা কষ্ট করেন তা পৃথিবীর আর কোনো ত্যাগ বা কষ্টের পরিমাপক হতে পারে না।
কবি তার কবিতায় লিখেছেন, ‘আমি স্বর্গ চাইনি কখনো আমি চেয়েছি শুধু মা/সোনালী আলো, জ্যোৎস্না বা আকাশের অমর রঙ/কিছুই আমার প্রিয় নয়, যদি মা না থাকে/মা তোমার কোমল হাত, তোমার দৃষ্টি, তোমার নীরব আশ্রয়/সেই অভিসন্ধি ছাড়া এই পৃথিবীই শূন্য মনে হয়/আমি জানি স্বর্গের দরোজা যতই খোলা হোক/যদি সেখানে মা না থাকেন/আমি কখনই আনন্দ পাই না/মা তুমি ছাড়া জীবন/এটি শুধু নিঃশব্দ পথ/যেখানে সব আলো নিভে যায়/যেখানে সব সুর নিঃশব্দ হয়/তোমার হাসি ছাড়া পৃথিবী অচেনা/তোমার ছোঁয়া ছাড়া প্রতিটি দিন শূন্য।’ ‘মায়ের’ প্রতি কবির অসাধারণ ভাবাবেগ এখানে প্রতিটি শব্দে, প্রতিটি লাইনেই ফুটে উঠেছে।
কবি পরিস্কার ভাষায় বলতে চেয়েছেন, ‘মা ছাড়া এই পৃথিবী তার কাছে শূন্য বলের মতো। মা’কে ছাড়া কবি স্বর্গেও যেতে চান না। মায়ের প্রতি এমন মমত্ববোধ, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা প্রকাশ করা কবি এস.এম পিন্টুর মতো দরদী কবির পক্ষেই কেবল সম্ভব।’ মা’কে নিয়ে লেখা কবিতার ঠিক পরেই যে কবিতাটি স্থান পেয়েছে তা হলো বাবাকে নিয়ে। সত্যিই তো জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই মায়ের পরেই বাবার স্থান। প্রতিটি সন্তানের জীবনে আশা-ভরসা, অনুপ্রেরণা ও আস্থার জায়গা- বাবার উপর। ‘আমি ফ্যাসিস্ট’ কবিতায় কবি ফ্যাসিজমের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেছেন। মুখোশের আড়ালে মানুষ কিভাবে লুকায়, চাটুকারিতার কবলে নীতিহীনতার নীল দাগ, ক্ষমতার দেয়ালে আঁকা দুর্নীতির প্রতিচ্ছবি, সত্যকে অস্বীকার করার প্রবণতা, অন্যায়কে প্রশ্রয় দিয়ে দেশ-সমাজকে নষ্ট করার দিকগুলো শব্দের নানা ব্যন্জনায় সাবলীলভাবে তুলে ধরেছেন। ‘বাতাসে ভেসে আসে নতুন স্লোগান/নতুন মুখ, পুরনো ভাষা/জনতার চোখে আবারও জ্বলে/পরিবর্তনের আলো/কিন্তু সময় জানে, ইতিহাসও জানে/ক্ষমতার চাকা ঘুরে ঘুরে ফিরে আসে একই মঞ্চে/শুধু অভিনেতা বদলায়, নাটক নয়।’ কি সুন্দরভাবে তিনি কবিতার কথামালায় আমাদের বাংলাদেশের বর্তমান হালচাল তুলে ধরেছেন।
‘রক্তে রাঙা নির্বাচন’, ‘প্রতিশোধের রাজনীতি’, ‘স্বৈরাচারের মৃত্যু’, ‘স্বৈরাচার মরে না’, ‘বিপজ্জনক রাজনীতি’, ‘যে যায় লঙ্কায়, সে হয় রাবণ’, ‘রাজনীতি’, ‘ক্ষমতা’, ‘ক্ষমতার পালাবদল’ কবিতাগুলোর মধ্যে কবি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় নষ্ট মানসিকতার জয়জয়কারকে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। রাজনীতি ও ক্ষমতা দেশের জন্য, মানুষের জন্য। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি তা দেশ ও মানুষের কল্যাণে না হয়ে নিজেদের পেট পূজোর জন্য দৃশ্যমান সিঁড়ি হয়ে উঠেছে। রাজনীতিতে সততা, বিনয়, ন্যায়-নীতি যেন এখন যাদুঘরের শোকেচ এ সাজিয়ে রাখার বিষয়। তাইতো রাজনীতিতে এখন নষ্ট চরিত্রের মানুষগুলোর পাল্লা দিনদিন ভারি হচ্ছে। নির্বাচনে জনগণের ভোটের রায়কে প্রতিফলিত হতে না দেয়ার যে নষ্ট সংস্কৃতি স্বৈরশাসক চালু করেছে তাও কবিতার পঙ্থিমালায় তুলে এনেছেন কবি।
মা আর জন্মভূমিকে একই সমান্তরালে তুলে ধরার প্রয়াস চালিয়েছেন কবি তার ‘জন্মভূমি’ কবিতার মাধ্যমে। দেশের প্রতি মমত্ববোধকে তুলে ধরতে গিয়ে কবি বলেন, ‘জন্মভূমি শুধু মাটি নয়, এটি অনুভূতি/যেখানে শিখেছি ভালোবাসা, শিখেছি দয়া/যেখানে আত্মা খুঁজে পায় শান্তি ও স্নেহের আশ্রয়/সেখানে জন্মভূমি হয়ে ওঠে চিরন্তন প্রেরণা।’ আমাদের দেশ গ্রাম প্রধান দেশ। প্রবাদ আছে আটষট্টি হাজার গ্রাম বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে। ‘আমার গ্রাম’ কবিতায় কবি বলেন, ‘আমার গ্রাম শুধু স্থান নয়/এটি অনুভূতি, এটি স্মৃতি, এটি পরিচয়/রোদ-ছায়ার খেলা, পাখির কলতান/গাছের ছায়া, নদীর ছোঁয়া/সব মিলিয়ে আমার গ্রাম হয়ে ওঠে/এক জীবন্ত মহাকাব্য।’ কি অসাধারণ শব্দ চয়ন- ‘জীবন্ত মহাকাব্য।’ শৈশব-কৈশোরে গ্রামীণ পরিবেশে বড় হয়েছেন বলে, গ্রামকে অন্তর্দৃষ্টিতে দেখেছেন বলেই এমন চমৎকার শব্দমালায় চিত্রায়ণ করতে পেরেছেন।
কবিতার বই হবে আর সে বইয়ে প্রেম-ভালোবাসা নিয়ে কোনো প্রেম থাকবে না তা কি করে হয়? ‘অনুপ্রেরণা’ কাব্যগ্রন্থের কবি এস.এম পিন্টু এই ঘরনার বাহিরে যেতে পারেননি বলেই তিনি এই গ্রন্থে বেশ কয়েকটি প্রেমের কবিতার সন্নিবেশ ঘটিয়েছেন। বইয়ের দ্বিতীয় কবিতা ‘ভালোবাসোনি বলে’, ‘জানি তুমি আসবে না’, ‘শুধু তুমি ডেকেছিলে বলে’, ‘বেদনার গোলাপ’, ‘অপূর্ণ প্রেম’, ‘ নীলাঞ্জনার মন ভালো নেই’, ‘নীল পরীর চোখে জল’, ‘সব ফুল ঝরে গেছে অভিমানে’, ‘ ভাঙ্গা হৃদয়’, ‘তুমি ছিলে না বলে চাঁদ ওঠেনি’, ‘হৃদয়ে রক্তক্ষরণ’- কবিতার পরতে পরতে প্রেম-ভালোবাসা-মায়া-স্মৃতি পাঠকে বিমোহিত করে তুলবে। প্রেমের আহবানে একজন প্রেমিক বা প্রেমিকা পৃথিবীর সবকিছু ছুঁড়ে ফেলে ছুটে যেতে পারে প্রিয়জনের কাছে। ‘শুধু তুমি ডেকেছিলে বলে’ কবিতায় কবি লিখেছেন, ‘শুধু তুমি ডেকেছিলে বলে/আমি এসেছি অজানা পথে/যেখানে বাতাস ভরে শান্তি/সেখানে আমি খুঁজেছি তোমার ছায়া/শুধু তুমি ডেকেছিলে বলে/থামতে পারিনি দূরের স্বপ্নে/প্রতিটি পা, প্রতিটি নি:শ্বাস/মিশে গেছে তোমার নামের সুরে।’ কি অসাধারণ প্রেমের ডায়ালগ। কবির মনে প্রেমের দোলা লেগেছিলো বলেই ভালোবাসায় এমন সাবলিল ভাষায় কবিতার চিত্রায়ণ করতে পেরেছেন।
আমরা জানি কবি একজন সাংবাদিকও বটে। তিনি দীর্ঘ দুই দশক সাংবাদিকতার নানা পথে, নানা চোরা গলিতে হেঁটে বেড়িয়েছেন বলেই একেবারে সামনে থেকে অবলোকন করতে পেরেছেন লাল, হলুদ, নীল, কালো সাংবাদিকতার ছদ্ম পরিচয়। ‘আমি সাংবাদিক’ কবিতায় কবি সরাসরি তুলে ধরেছেন সাংবাদিকতা নামে অপসাংবাদিকতা মোকাবেলা করে, সাহসের সাথে নীতি নৈতিকতাকে আঁকড়ে ধরে এগিয়ে চলার প্রত্যয়। সৎ সাংবাদিকতায় শিরদাঁড়া উঁচু করে চলার প্রত্যয়। কবিতার শুরুতেই কবি বলেন, ‘আমি কারো তাবেদারি করি না, কারণ আমি সাংবাদিক/অন্যায়কে বলি অন্যায় ন্যায়কে বলি ন্যায়, এই আমার নৈতিক ঠিক। কারো গোপন এজেন্ডা- বয়ে চলা নয় আমার কাজ/আমি দায়িত্ব পালন করি, সত্যের পথেই হাঁটি – সকাল সাজ। … কবিতার শেষ দিকে বলেন, ‘আমার কলমই আমার পরিচয়’/আমার সাহসই আমার পরিচ্ছদ। ন্যায়ের খাতায় নাম লেখাই প্রতিদিন/সত্যেই পথেই আমার অগ্রযাত্রা অবিরত।
রুবাব পাবলিকেশন থেকে প্রকাশিত ৬৪ পৃষ্ঠার ঝকঝকে ছাপানো বইটির মূল্য ৩০০ টাকা। চমৎকার প্রচ্ছদটি করেছেন মেধাবী ডিজাইনার আলমগীর ইমন। বইটি অনলাইন রকমারি.কম সহ চট্টগ্রামের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বই বিপনিতে পাওয়া যাবে।
সব শেষে একটি কথা বলতে হয়- কবি’র প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘অনুপ্রেরণা’য় স্থান পাওয়া প্রতিটি কবিতাই কাব্যপ্রেমিদের মন জয় করবে বলে বিশ্বাস করি।
লেখক: কবি, গল্পকার।

