শুক্রবার, জুলাই ১৭, ২০২৬

এ.কে.এম. ফজলুল কাদের চৌধুরী: শিক্ষা, উন্নয়ন ও রাষ্ট্রনায়কোচিত নেতৃত্বের এক উজ্জ্বল অধ্যায়

নিজস্ব প্রতিবেদক

আজ ১৮ জুলাই। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস এবং চট্টগ্রামের শিক্ষা ও উন্নয়নের ধারায় এক গভীর তাৎপর্যপূর্ণ দিন। আজ তৎকালীন পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের (ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি) স্পিকার, ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি, বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ ও জননেতা এ.কে.এম. ফজলুল কাদের চৌধুরীর ৫৩তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৭৩ সালের এই দিনে ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে অন্তরীণ অবস্থায় হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যু শুধু একজন রাজনীতিকের বিদায় নয়; বরং শিক্ষা, উন্নয়ন ও রাষ্ট্রচিন্তার এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি।
১৯১৯ সালের ২৬ মার্চ চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার গহিরা গ্রামের ঐতিহ্যবাহী চৌধুরী পরিবারে তাঁর জন্ম। পিতা খান বাহাদুর আবদুল জব্বার চৌধুরী এবং মাতা বেগম ফাতেমা খাতুন চৌধুরীর স্নেহধন্য এই কৃতী সন্তান কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইতিহাসে স্নাতক এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএল ডিগ্রি অর্জন করেন। ছাত্রজীবনেই তিনি কারমাইকেল হোস্টেল ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতি (ভিপি) এবং অল ইন্ডিয়া মুসলিম স্টুডেন্টস ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়ে অসাধারণ নেতৃত্বের পরিচয় দেন।

ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন ও পাকিস্তান আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রেখে তিনি রাজনীতিতে নিজস্ব অবস্থান সুদৃঢ় করেন। ১৯৪৯ সালে চট্টগ্রাম জেলা বোর্ডের চেয়ারম্যান, ১৯৫৪ সালে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য (এমএলএ), ১৯৬২ সালে পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকারের একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী এবং ১৯৬৩ সালে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের স্পিকার নির্বাচিত হন। আইয়ুব খান ক্ষমতা ত্যাগের প্রাক্কালে তিনি ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্বও পালন করেন।
তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান শিক্ষা ও উন্নয়ন খাতে। তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্ব ও উদ্যোগে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ, বর্তমান চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) পূর্বসূরি প্রকৌশল কলেজ, বাংলাদেশ মেরিন একাডেমি, চট্টগ্রাম পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, মেরিন ফিশারিজ ইনস্টিটিউটসহ চট্টগ্রাম অঞ্চলের বহু গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়িত হয়। আজও এসব প্রতিষ্ঠান দেশের শিক্ষা, গবেষণা ও মানবসম্পদ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে।
দীর্ঘ সময় পর হলেও তাঁর এই ঐতিহাসিক অবদানের প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়েছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। ২০২৫ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৫৯তম সিন্ডিকেট সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নির্মাণাধীন একটি আবাসিক হলের নাম ‘এ.কে.এম. ফজলুল কাদের চৌধুরী হল’ রাখার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা ও বিকাশে তাঁর অবদানের এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি।

একই ধারাবাহিকতায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে চৌধুরী পরিবারের সম্পৃক্ততার নতুন অধ্যায়ও সূচিত হয়েছে। এ.কে.এম. ফজলুল কাদের চৌধুরীর সেজ পুত্র, বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান এবং রাউজান সংসদীয় আসনের সংসদ সদস্য জননন্দিত জননেতা আলহাজ্ব গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে। দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে চৌধুরী পরিবারের অবদানের যে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি মিলেছে, তা নতুন প্রজন্মের কাছে ইতিহাসকে পুনরায় তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা, গবেষণা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করতে তিনি কার্যকর ভূমিকা রাখবেন বলে সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা।
রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের ধারাবাহিকতায় তাঁর পুত্র আলহাজ্ব গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী এবং নাতি হুমাম কাদের চৌধুরী জাতীয় সংসদে রাউজান ও রাঙ্গুনিয়া সংসদীয় আসনে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীও বাংলাদেশের রাজনীতির সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তাঁকে আওয়ামী সরকার আমলে আদালতকে ব্যবহার করে ফাঁসি দড়ি পড়িয়েছেন।
আজ তাঁর ৫৩তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে রাউজানের গহিরাস্থ নিজ গ্রামের বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে কবর জিয়ারত, পুষ্পস্তবক অর্পণ, মিলাদ, দোয়া মাহফিল ও স্মরণানুষ্ঠানসহ নানা কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে। এতে পরিবারের সদস্য, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, শুভানুধ্যায়ী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশগ্রহণ করবেন।
পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এ.কে.এম. ফজলুল কাদের চৌধুরীর শিক্ষা-দর্শন, উন্নয়ন ভাবনা ও রাষ্ট্রনায়কোচিত নেতৃত্ব আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর নামে আবাসিক হল প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত এবং তাঁর পরিবারের পুনরায় বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিনির্ধারণী পর্ষদে সম্পৃক্ততা প্রমাণ করে—ইতিহাসে যাঁদের অবদান জাতির সম্পদে পরিণত হয়, সময়ের ব্যবধানে হলেও তাঁদের যথাযথ মূল্যায়ন একদিন প্রতিষ্ঠিত হয়।
আজ তাঁর ৫৩তম মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি এই বরেণ্য রাষ্ট্রনায়ককে। মহান আল্লাহ তাঁর বিদেহী আত্মাকে মাগফিরাত দান করুন এবং জান্নাতুল ফেরদৌসে সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করুন। আমিন।

লেখক: কাজী সরোয়ার খান মনজু,সভাপতি
রাউজান প্রেস ক্লাব, রাউজান, চট্টগ্রাম।

- Advertisement -spot_img
  • সর্বশেষ
  • পঠিত