রাঙামাটি জেলার কাপ্তাই উপজেলায় টানা কয়েক দিনের অবিরাম ভারী বর্ষণ শুধু পাহাড়ধসই ডেকে আনেনি, কেড়ে নিয়েছে হাজারো মানুষের জীবিকাও। পাহাড়ধস, সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা ও জলাবদ্ধতার কারণে উপজেলার প্রায় ১০ হাজার মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। কৃষিকাজ, মাছ চাষ, গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি পালন থেকে শুরু করে দিনমজুরির কাজ—সবকিছুই প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দুর্গত এলাকার মানুষ চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের আশঙ্কা, জরুরি ত্রাণ ও সরকারি সহায়তা দ্রুত না পৌঁছালে কাপ্তাইয়ে বড় ধরনের মানবিক সংকট সৃষ্টি হতে পারে।
স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, টানা বৃষ্টিতে উপজেলার অন্তত ৩২টি স্থানে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। এতে পাহাড়ি সড়ক ও ঘরবাড়ির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে মানুষকে সরিয়ে নিতে ১৮টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হলেও শনিবার পর্যন্ত সেখানে আশ্রয় নিয়েছেন মাত্র ৩১৭ জন। অনেকেই জীবনঝুঁকি জেনেও ঘরবাড়ি ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে অনীহা দেখাচ্ছেন।
কাপ্তাই উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান দিলদার হোসেন বলেন, একটানা বর্ষণের কারণে দিনমজুর ও কৃষকরা তাঁদের দৈনন্দিন কাজে যেতে পারছেন না, ফলে তাঁরা কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। আমার জানা মতে, কাপ্তাই উপজেলায় ১০ হাজার লোক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন, যাদের কোনো কাজই নেই। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য জরুরি ত্রাণ সহায়তা প্রয়োজন। অন্যথায় বড় ধরনের মানবিক সংকট সৃষ্টি হতে পারে। রাস্তাঘাট মেরামত এবং ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ির জন্য সরকারি সহায়তাও অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।
সীতারঘাটের স্থানীয় বাসিন্দা ডালিম বলেন, আমাদের সীতারঘাটসহ শিলছড়ির বিভিন্ন এলাকা এই টানা বৃষ্টি আর পাহাড়ধসে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এলাকার মানুষের ঘরবাড়ির ওপর পাহাড়ের মাটি ভেঙে পড়েছে। রাস্তাঘাট বন্ধ থাকায় মানুষ ঘরের বাইরে বের হতে পারছে না। আমরা খুব আতঙ্কের মধ্যে আছি এবং আমাদের এলাকায় দ্রুত সরকারি সাহায্য প্রয়োজন।
চন্দ্রঘোনা ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ড কলেজ এলাকার বাসিন্দা গৃহিণী মরিয়ম বেগমে বলেন, আজকে পাঁচ দিন ধরে আমাদের এলাকায় কোনো কারেন্ট নাই। কারেন্ট না থাকায় মোটর চালানো যাচ্ছে না, ডিপ-টিউবওয়েলের পানি পুরোপুরি বন্ধ। এলাকায় এক ফোঁটা বিশুদ্ধ খাওয়ার পানি নাই। বাধ্য হয়ে ছড়ার ও বৃষ্টির ঘোলা পানি ফুটিয়ে না ফুটিয়ে খাওয়াচ্ছে মানুষ। এভাবে চললে দু-একদিনের মধ্যে ঘরে ঘরে ডায়রিয়া আর পানিবাহিত রোগ ছড়াতে বাধ্য। আমরা চরম বিপর্যয়ে আছি।

রাইখালী ইউনিয়নের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক মো. সামশুল আলম বলেন, পাহাড়ে এবার যে রবি শস্য আর সবজির চাষ করেছিলাম, এই টানা বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলে তার সব শেষ। খেতের ফসল মাটির সাথে মিশে গেছে। এই ফসল বেঁচে আমাদের সারা বছরের সংসার চলে, ঋণের টাকা শোধ করতে হয়। এখন সবকিছু হারিয়ে আমরা পথে বসে গেছি। নতুন করে আবার চাষবাস শুরু করতে কমসে কম এক মাস লাগবে। এই এক মাস পরিবার নিয়ে কীভাবে চলব, সেই চিন্তায় রাতে ঘুম আসছে না।
ওয়াগ্গা ইউনিয়নের স্থায়ী বাসিন্দা ওজিদ কারবাইর বলেন, ওয়াগ্গা ছড়ার পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় কুকিমারা, শাক্তাজারী, বড়ইছড়ি বাজার ও রাইখালীসহ বিভিন্ন দুর্গম পাহাড়ি পাড়ার যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। পাহাড়ি ঢলে আমাদের কৃষিজমি ও রবি শস্যের খেত সব নষ্ট হয়ে গেছে। জেলেরাও নদীতে মাছ ধরতে পারছে না। মানুষ পুরোপুরি কর্মহীন। ঘরে খাবার নেই, গবাদি পশুর খাবার নেই—সব মিলিয়ে আমরা একটা চরম বিপর্যয়ের মধ্যে আছি। অবিলম্বে সরকারি ও বেসরকারি বড় ধরনের সাহায্য না আসলে মানুষ না খেয়ে পড়বে।
চন্দ্রঘোনা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি জাকির হোসেন জানান, চন্দ্রঘোনা ইউনিয়নের মিতিঙ্গাছড়ি, কর্ণফুলী কলেজ এলাকা এবং কেপিএমের ফকিরাঘোনাসহ বিভিন্ন পাড়ার অবস্থা খুবই নাজুক। পাহাড়ধসে বহু মানুষের ঘরবাড়ি ভেঙে গেছে, অনেকে চরম ঝুঁকিতে দিন কাটাচ্ছেন। বিদ্যুৎ না থাকায় পুরো এলাকা অন্ধকার, খাওয়ার পানির তীব্র সংকট চলছে। রাজনীতিবিদ হিসেবে আমি দেখছি, মানুষ কতটা অসহায় অবস্থায় আছে। এই মুহূর্তে ক্ষতিগ্রস্ত ও কর্মহীন পরিবারগুলোর জন্য জরুরি ভিত্তিতে চাল ও শুকনো খাবারের ত্রাণ পৌঁছানো দরকার।
কাপ্তাই উপজেলার নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. রায়হানুল ইসলাম বলেন, টানা ভারী বৃষ্টিতে কাপ্তাই উপজেলায় ৩২টি পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় চারজন আহত হয়েছেন। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে সরিয়ে মোট ১৮টি আশ্রয়কেন্দ্রে ৩১৭ জনকে রাখা হয়েছে। এর মধ্যে কর্ণফুলী সরকারি ডিগ্রি কলেজে ৭৩ জন, কর্ণফুলী স্টেডিয়ামে ৩০ জন, কাপ্তাই সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ১৮৪ জন এবং মুরালীপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৩০ জন অবস্থান করছেন।
ইউএনও আরও জানান, আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা মানুষের জন্য তিনবেলা খাবার ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করা হয়েছে। পাশাপাশি চিড়া, মুড়ি, বিস্কুট ও পানিসহ শুকনো খাবার বিতরণ করা হচ্ছে। দুর্যোগের কারণে যারা কর্মহীন হয়ে পড়েছেন, তাদের মধ্যে সরকারি সহায়তা হিসেবে চাল বিতরণের কার্যক্রমও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় উপজেলা প্রশাসন সার্বক্ষণিক নজরদারি চালিয়ে যাচ্ছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

