দুই দেশের বিদ্যমান সম্পর্ক আরও উচ্চমাত্রায় নিয়ে যেতে আগামী ২৩ ও ২৪ জুন চীন সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সফরকালে বাণিজ্য, অবকাঠামো উন্নয়ন, কূটনৈতিক অবস্থান, রোহিঙ্গা সংকট এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানা গেছে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর এটিই হবে তার প্রথম চীন সফর। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এ সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক নতুন মাত্রা পাবে এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
গত মাসে স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়নমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে সরকারের একটি প্রতিনিধি দল চীন সফর করে। প্রতিনিধি দল বেইজিংসহ দেশটির একাধিক প্রদেশ পরিদর্শন করে এবং বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে। ওই সফরের আগে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানও চীন সফর করেন। বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর অল্প সময়ের মধ্যে সরকারের নীতিনির্ধারকদের ধারাবাহিক এ সফর দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে বিশ্লেষকদের মতে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরটি হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন এবং এটি দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।
জানা গেছে, ২০২৫ সালের জুন থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ছয় মাসে ত্রিদেশীয় আঞ্চলিক ফোরাম গঠনের উদ্যোগ নিয়ে সক্রিয় ছিল চীন। বাংলাদেশকে এতে যুক্ত করতে ওই সময়ে নানা পর্যায়ে কূটনৈতিক তৎপরতা ও আলোচনা চালানো হয়। তবে বাংলাদেশে ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ায় বিষয়টি আর বেশি দূর এগোয়নি। পরে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার বিষয়টি পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের ওপর ছেড়ে দেয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরকালে বিষয়টি নতুনভাবে আলোচনায় আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের আঞ্চলিক ফোরামে যুক্ত হলে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ও কৌশলগতভাবে নতুন সুযোগ পেতে পারে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, চীন বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্যিক অংশীদার। দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলার। যদিও চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি উল্লেখযোগ্য, তবু দেশটির বিনিয়োগ প্রতি বছরই বাড়ছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণে চীনের সক্রিয় অংশগ্রহণ রয়েছে। সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ, বন্দর এবং যোগাযোগ খাতের একাধিক প্রকল্পে চীনা প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। এ ছাড়া সম্প্রতি বাংলাদেশের ৯৭ শতাংশ পণ্যে শুল্ক ছাড়া দিয়েছে চীন। ফলে দুই দেশের বাণিজ্য ঘাটতি কিছুটা হলেও কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, এ সুবিধা কার্যকরভাবে কাজে লাগানো গেলে বাংলাদেশের রফতানি বাজার আরও সম্প্রসারিত হবে।
অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান র্যাপিডের প্রধান ড. আবদুর রাজ্জাক বলেন, ‘বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য ঘাটতি অনেক বেশি। বিশেষ করে আমরা যে পরিমাণ পণ্য আমদানি করি, তার তুলনায় রফতানি অনেক কম। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরের মাধ্যমে এ ঘাটতি কমিয়ে আনার বিষয়ে কার্যকর আলোচনা হতে পারে বলে আশা করছি। সরকারপ্রধানদের পর্যায়ে আলোচনায় নিজেদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা প্রস্তাব উপস্থাপনের সুযোগ থাকে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও এ বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে বলে মনে করি।’
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের উচিত চীনের বিশাল বাজারে নিজেদের পণ্যের প্রবেশাধিকার বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, চামড়াজাত পণ্য, কৃষিপণ্য এবং ওষুধশিল্পের জন্য চীনের বাজার বড় সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে প্রযুক্তি ও শিল্প খাতে যৌথ বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে দুই দেশই লাভবান হবে।
সাবেক বাণিজ্য সচিব ড. মাহবুব আহমেদ বলেন, আমরা আশা করছি, প্রধানমন্ত্রীর এ সফরে দুই দেশের বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন সংক্রান্ত বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হবে। একই সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও জোরদারে এ সফর মাইলফলক হয়ে থাকতে পারে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ এখন উন্নয়ন ও বিনিয়োগের নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। এ সময়ে চীনের মতো বৃহৎ অর্থনীতির দেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হলে শিল্পায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
বাংলাদেশ-চায়না চেম্বারের প্রেসিডেন্ট মো. খোরশেদ আলম বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের বড় ধরনের বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে এ কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। এ ঘাটতি কমিয়ে আনতে প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। চীন মূলত ব্যবসা ও বিনিয়োগকেন্দ্রিক চিন্তাভাবনা করে। তাই বাংলাদেশ থেকে সরাসরি তৈরি পোশাক রফতানির সুযোগ বাড়ানো গেলে দেশ লাভবান হবে। বর্তমানে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক যুক্তরাষ্ট্র হয়ে চীনে যাচ্ছে, ফলে প্রত্যাশিত সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে না।
তিনি আরও বলেন, চীনের কাছ থেকে প্রযুক্তিগত সহায়তা নিতে পারলে বাংলাদেশ অনেক এগিয়ে যাবে। একই সঙ্গে চীনা বিনিয়োগ আকর্ষণে তাদের জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল বরাদ্দের বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে সে ক্ষেত্রে অবকাঠামো উন্নয়ন জরুরি। দেখা গেছে, একটি চীনা কোম্পানি ছয় বছর আগে বিনিয়োগ করলেও এখনও গ্যাস সংযোগ পায়নি। তাই উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় সরকারের সদিচ্ছা ও বাস্তব পদক্ষেপের বিষয়গুলো তুলে ধরা প্রয়োজন।
খোরশেদ আলম আরও বলেন, বাংলাদেশে চীনা ব্যাংক স্থাপনের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। দেশে যখন শ্রীলঙ্কাসহ বিভিন্ন দেশের ব্যাংক কার্যক্রম চালাতে পারে, তখন চীনা ব্যাংকের অনুমোদন দেওয়ার ক্ষেত্রেও ইতিবাচক ভাবা যেতে পারে। এতে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সহজ হবে এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য অর্থনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা আরও সুবিধাজনক হবে।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এ সফরে চীনের সঙ্গে রাজনৈতিক যোগাযোগ আরও জোরদার হতে পারে। পাশাপাশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, তিস্তা মহাপরিকল্পনা, মোংলা বন্দর আধুনিকায়ন এবং সাংহাই-চট্টগ্রাম সরাসরি ফ্লাইট চালুর বিষয়গুলোও গুরুত্ব পেতে পারে। এ ছাড়া তথ্যপ্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং কৃষি খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়েও আলোচনা হতে পারে বলে জানা গেছে।
প্রধানমন্ত্রীর সফরে কয়েকজন মন্ত্রী, সংসদ সদস্য এবং ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দল সঙ্গী হতে পারেন বলে জানা গেছে। এর আগে কুনমিংয়ে একটি বিশেষ বাণিজ্য মেলায় বাংলাদেশি ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দলের অংশগ্রহণের সম্ভাবনাও রয়েছে। ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, এ ধরনের আয়োজন দুই দেশের বাণিজ্যিক যোগাযোগ আরও বাড়াবে এবং নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করবে।
ঐতিহাসিক ‘সিল্ক রোড’-এর মাধ্যমে বহু আগে থেকেই বাংলাদেশ ও চীনের যোগাযোগ গড়ে উঠেছিল। উপকূলীয় রাষ্ট্র হওয়ায় দুই দেশের মধ্যে সমুদ্রপথে বাণিজ্য ও যোগাযোগও ছিল সমৃদ্ধ। বর্তমানে বাংলাদেশ ও চীন কৌশলগত অংশীদারত্বের ভিত্তিতে সামরিক ও বেসামরিক সহযোগিতা জোরদার করছে। বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে দুই দেশের মধ্যে সরাসরি রেল ও সড়ক যোগাযোগ স্থাপনের সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।
তারা মনে করছেন, এ ধরনের যোগাযোগব্যবস্থা চালু হলে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে এবং বাংলাদেশ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগকেন্দ্র হিসেবে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

