আগামী ২৫ জানুয়ারি দীর্ঘ ২১ বছর পর চট্টগ্রামে আসছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক পলোগ্রাউন্ড মাঠে অনুষ্ঠিতব্য বিএনপির নির্বাচনী মহাসমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখবেন তিনি। বিএনপির চেয়ারম্যান হিসেবে এটিই প্রথম চট্টগ্রাম সফর। এই মহাসমাবেশকে ঘিরে ইতোমধ্যে প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও অন্যান্য অঙ্গ এবং সহযোগী সংগঠন।
বারো আউলিয়ার পুণ্যভূমি চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে মহান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বীর উত্তম। ষোলশহরস্থ ঐতিহাসিক বিপ্লব উদ্যান থেকেই বিদ্রোহের সূচনা করেছিলেন শহীদ জিয়া। পরিতাপের বিষয় দেশ বিদেশি ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে এই চট্টগ্রামের মাটিতেই ১৯৮১ সালের ৩০ মে সার্কিট হাউসে ঘাতকের গুলিতে শহীদ হয়েছিলেন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান।
এই চট্টগ্রামেই ১৯৮৭ সালে ঐতিহাসিক লালদিঘী ময়দানের জনসভা থেকে বেগম খালেদা জিয়াকে দেশনেত্রী উপাধিতে ভূষিত করা হয়। জিয়া পরিবারের অজস্র স্মৃতি বিজড়িত বীর চট্টলায় তারেক রহমানের আগমনে বিএনপি দলীয় নেতা-কর্মীদের মাঝে আনন্দ-উচ্ছাস বিরাজ করছে। দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত এই আগমন ঘিরে তৃণমূল থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব পর্যন্ত সর্বস্তরের নেতা-কর্মীদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা, আশাবাদ ও প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে। তাঁর উপস্থিতিকে ঘিরে দলীয় কার্যক্রমে গতি সঞ্চারিত হয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত ধানের শীষের প্রার্থীকে বিজয়ী করতে বীর চট্টলার নেতা-কর্মীরা দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।
স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে সর্বদলীয় সিদ্ধান্ত-১৯৮৬ সালের নির্বাচনে যারা যাবে তারাই হবে জাতীয় বেইমান। আপোষহীন দেশনত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি ৮৬ সালের প্রহসনের নির্বাচনে যায়নি। পলাতক খুনী হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ জাতীয় বেইমান হিসেবে ঠিকই স্বৈরাচার এরশাদের নির্বাচনে গিয়েছিলো। স্বৈরাচার এরশাদের অধীন ১৯৮৬ সালে অনুষ্ঠিত তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর প্রথম চট্টগ্রামে জনসমাবেশে বক্তব্য রাখেন বেগম খালেদা জিয়া। নির্বাচনের পর থেকে বেগম খালেদা জিয়ার আপসহীন আন্দোলনে দিশেহারা হয়ে পড়ে স্বৈরশাসক এরশাদ। তখন স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের উত্তাল সময়। বেগম খালেদা জিয়া’র নেতৃত্বে সারাদেশ এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে ঐক্যবদ্ধ।

১৯৮৭ সালের ৪ নভেম্বর চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক লালদিঘী ময়দানে বিএনপির জনসভার দিন। বিকালে লালদিঘীর জনসভায় বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার বক্তব্য রাখার কথা। সকালের ফাস্ট ফ্লাইটে বেগম জিয়ার চট্টগ্রামে আসা ঠেকাতে পারলেও শেষ পর্যন্ত বিমানেই তিনি চট্টগ্রাম পৌঁছেন দুপুরের দিকে। বিকালের আগেই দুপুর থেকেই লালদিঘীর ময়দান লোকে লোকারণ্য হয়ে ওঠে। এসময় মাঠে এসে উপস্থিত হন এরশাদ সরকারের হুলিয়া মাথায় নিয়ে আত্মগোপনে থাকা সেই সময়ের চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সভাপতি আব্দুল্লাহ আল নোমান। সমাবেশে তাঁর উপস্থিতি নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত করে তোলে। সমাবেশে বেগম খালেদা জিয়া ছাড়াও ডাক্তার বদরুদ্দোজা চৌধুরীসহ একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা উপস্থিত ছিলেন। লালদিঘির বিশাল সমাবেশে উপস্থিত লাখো জনতার সামনে সভাপতি আব্দুল্লাহ আল নোমান বেগম জিয়ার উদ্দেশ্যে তৈরি করা ‘দেশনেত্রী’ উপাধিতে ভূষিত করার ঐতিহাসিক মানপত্রটি যখন পাঠ করেন তখন সমাবেশে উপস্থিত লাখো জনতার করতালি-শ্লোগানের মধ্যেই ‘দেশনেত্রী’ অভিধাপত্রটি বিএনপি চেয়ারপার্সনের হাতে তুলে দেন। সেই থেকে বেগম খালেদা জিয়া ‘দেশনেত্রী’ হিসাবে দেশ-বিদেশের গণমাধ্যমেও প্রচারিত হতো।
বীর প্রসবিনী চট্টগ্রামের জনগণের পক্ষ থেকে দেওয়া ‘দেশনেত্রী’ উপাধির সম্মান তিনি আমৃত্যু মর্যাদার সাথে রক্ষা করেছেন। আপোষহীন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া কখনোই মাথা নত করেন নি। পলাতক ফ্যাসিস্ট হাসিনা মিথ্যা মামলায় সাজা দিয়ে জেলে পাঠিয়েছেন তারপরও তিনি মাথা উচু করেই জেল জীবন বেছে নিয়েছিলেন। খুনি হাসিনা কারণে সঠিক চিকিৎসা থেকেও বঞ্চিত হন তিনি। শুধুমাত্র আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তার কারণেই খুনী হাসিনার রোষানলে পড়েন বেগম জিয়া। খুনি হাসিনার ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার শিকার হয়ে সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া শুধু দেশের মানুষের জন্য আমৃত্যু সংগ্রাম করে গেছেন। গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে বেগম খালেদা জিয়া’র নাম স্বর্নাক্ষরে লিখা থাকবে ইতিহাসের পাতায়।
গত ৩০ ডিসেম্বর মরহুমা বেগম খালেদা জিয়া মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের ডাকে আমাদের থেকে বিদায় নিয়েছেন। মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার জানাজা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বীর উত্তম এর জানাজার পর সর্ববৃহৎ জানাজা এমনকি এই জানাজা সারা বিশ্বের সবচেয়ে বড় জানাজা। জিয়া পরিবার এদেশের মানুষের হ্নদয় জয় করে নিয়েছেন। সবার আগে বাংলাদেশ এটাই জিয়া পরিবারের রাজনৈতিক দর্শন।
বাংলাদেশে ১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপির ক্ষমতায় আসা এখনো দেশের নির্বাচন ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বড় একটি বিস্ময় হিসেবেই দেখা হয়। ১৯৯১ সালে চট্টগ্রামের বৃহত্তর পাহাড়তলী তৎকালীন চট্টগ্রাম-৮ আসন থেকে সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছিলেন পরবর্তীতে উপ-নির্বাচনে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এই আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। সবমিলিয়ে জিয়া পরিবারের সাথে বীর চট্টলার সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। এদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ঘোষণা থেকে স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলন, ১৯৯১ এর ঐতিহাসিক পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম থেকে আপোষহীন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া বিপুল ভোটে এমপি বিজয়ী হওয়া। এই চট্টগ্রামের মানুষ জিয়া পরিবারের অনেক আপন।
তারেক রহমান সর্বশেষ ২০০৫ সালে চট্টগ্রামে এসেছিলেন। তখন তিনি বিএনপির সি. যুগ্ম মহাসচিবের দায়িত্বে ছিলেন। সে সময় চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের প্রচারণায় অংশ নিয়ে তিনি নগরীর লালদিঘী ময়দানে এক জনসভায় বক্তব্য দেন। দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময় পর তার চট্টগ্রাম আগমনকে ঘিরে বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ ও উদ্দীপনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
২৫ জানুয়ারি ঐতিহাসিক পলোগ্রাউন্ড মাঠের সমাবেশের প্রস্তুতির জন্য বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী গত ১৯ জানুয়ারি রাতে নগরীর মেহেদীবাগের বাসভবনে যৌথসভা করেছেন। বিএনপি, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল শৃঙ্খলা ও প্রচার উপ-কমিটি গঠন করার মধ্য দিয়ে পলোগ্রাউন্ড মাঠের মহাসমাবেশ কে সফল করার লক্ষ্যে দিন-রাত নিরলসভাবে পরিশ্রম করে যাচ্ছে। নির্বাচনী আচরণ বিধি মেনে ব্যানার, ফেস্টুন, লিফলেট, পোস্টারিং, শহরজুড়ে মাইকিং ডিজিটাল প্রচারণা সোস্যাল মিডিয়া কনটেন্ট তৈরি। তারেক রহমানের আগমন কে ইতিহাসের সাক্ষী করতে নগর বিএনপি- যুবদল সব ধরনের প্রস্তুতি ইতিমধ্যে সম্পন্ন করেছে। পুরো চট্টগ্রাম শহর ২৫ জানুয়ারি পলোগ্রাউন্ড মাঠে পরিনত হবে।
ঐতিহাসিক পলোগ্রাউন্ড মাঠ আয়তনে বিশাল। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সমাবেশের ইতিহাসে এটি একবারই কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ছিলো ২০১২ সালে ৯ জানুয়ারি দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া প্রধান অতিথির বক্তব্য দিয়েছিলেন। খুনী হাসিনা দীর্ঘ ফ্যাসিবাদ আমলে পলোগ্রাউন্ড মাঠে একবার সমাবেশের আয়োজন করে কোটি কোটি টাকা খরচ করেও অর্ধেক মাঠ পুরণ করতে পারে নাই। ২০১২ সালের পলোগ্রাউন্ড মাঠের বেগম খালেদা জিয়া’র মহাসমাবেশর সমান আরেকটি সমাবেশের স্বপ্ন ফ্যাসিস্ট হাসিনার সারাজীবন অপূর্ণই থেকে গেলো। এরপর আর পলাতক হাসিনার আওয়ামী লীগ আর কোন দিন পলোগ্রাউন্ড মাঠে সমাবেশ আয়োজনের সাহস করে নাই।
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে বরণ করে নিতে বীর চট্টলা প্রস্তুত। পলোগ্রাউন্ড মাঠের একশ ফিট বাই পঞ্চাশ ফিটের স্টেজ রেডি দল-মত নির্বিশেষে বীর চট্টলার আপামর জনসাধারণ প্রিয় নেতা বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বক্তব্য শুনতে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। রাজনৈতিক সভা- সমাবেশের ইতিহাসের আগামী ২৫ জানুয়ারি চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক পলোগ্রাউন্ড মাঠ আরেকটি নতুন ইতিহাসের সাক্ষী হতে যাচ্ছে।
লেখক: মোঃ জহিরুল ইসলাম (জহির)
সাবেক সহ দপ্তর সম্পাদক
চট্টগ্রাম মহানগর যুবদল।
মোবাইল: ০১৮১৯৬১৭৩৮০
E-mail: zahir.affable@gmail.com

