রবিবার, এপ্রিল ১৯, ২০২৬

চবি উপাচার্য ও উপ-উপাচার্যের পদত্যাগ চায় ছাত্রদল

চেরাগি নিউজ ডেস্ক

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মূল চেতনা ছিল বৈষম্যহীন সমাজ গঠন ও মেধার যথাযথ মূল্যায়ন। সহস্রাধিক ছাত্র-জনতার প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত এই নতুন বাংলাদেশে আমরা প্রত্যাশা করেছিলাম প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত হবে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, সেই জুলাই অভ্যুত্থানের পবিত্র চেতনার প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) বর্তমান জামায়াতপন্থী প্রশাসন পরিকল্পিতভাবে নিয়োগ বাণিজ্যের মহোৎসবে লিপ্ত হয়েছে।

প্রকৃত কোনো চাহিদা না থাকা সত্ত্বেও গত ১৫ মাসে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী মিলিয়ে প্রায় ২৫০ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং আরও ৩০৪টি পদের নিয়োগ প্রক্রিয়া তড়িঘড়ি করে সচল রাখা হয়েছে। গত দেড় বছরে মোট ৫৫৪ জনের এই বিশাল নিয়োগ প্রক্রিয়া মূলত একটি বিশেষ রাজনৈতিক গোষ্ঠীর দল ভারী করার নগ্ন মহোৎসব ছাড়া আর কিছুই নয়। এই বিশাল নিয়োগ অভিযানের মধ্যে সবচেয়ে স্পষ্ট স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের দৃষ্টান্ত হলো — উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. শামীম উদ্দিন খানের কন্যা মাহীরা শামীমকে ফিন্যান্স বিভাগে প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ প্রদান।

উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ৭ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (UGC) সকল ধরনের নিয়োগ কার্যক্রম স্থগিত রাখার নির্দেশ দেয়। কিন্তু সেই নির্দেশকে প্রকাশ্যে অমান্য করে ১৯ ডিসেম্বর উপ-উপাচার্যের কন্যার জন্য নিয়োগ বোর্ড অনুষ্ঠিত হয়। ফিন্যান্স বিভাগের ৪টি প্রভাষক পদের বিপরীতে ৫১ জন আবেদন করলেও পরিকল্পিতভাবে বহু যোগ্য প্রার্থীকে পরীক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়। এনালগ পদ্ধতিতে ডাকযোগে পরীক্ষার তারিখ জানানোয় অনেক প্রার্থী সময়মতো খবর পাননি, যা উপ-উপাচার্যের কন্যার জন্য প্রতিযোগিতার পথ ইচ্ছাকৃতভাবে সহজ করে দেয়।
এরপর মাত্র ৫০ নম্বরের একটি লিখিত পরীক্ষা নেওয়া হয়, যার প্রশ্ন তাৎক্ষণিকভাবে নিয়োগ বোর্ডের সদস্যরাই প্রস্তুত করেন। এই নিয়োগ বোর্ডের অন্যতম সদস্য ছিলেন ফিন্যান্স বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ নেছারুল করিম, যিনি চবির জামায়াতপন্থী শিক্ষকদের ‘সাদা দল’-এর শীর্ষ নেতৃত্বে রয়েছেন এবং উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. শামীম উদ্দিন খানের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, পরীক্ষা শেষ হওয়ার দিনই ফলাফল ঘোষণা করা হয়, যেখানে কেবল নির্বাচিত প্রার্থীদের নাম প্রকাশ করা হয়েছে। কে কত নম্বর পেয়েছে তা সম্পূর্ণ গোপন রাখা হয়, যা এই নিয়োগ প্রক্রিয়াকে চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এমনকি বিভাগের মেধাতালিকায় ১২তম অবস্থানে থাকা সত্ত্বেও উপ-উপাচার্যের কন্যাকে ১১ জন যোগ্য প্রার্থীকে টপকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

এ ধরণের অনিয়ম শুধু একটি বিভাগেই সীমাবদ্ধ নয়। ফিন্যান্স বিভাগের জামায়াতপন্থী শিক্ষক বেগম ইসমত আরা হক তার ছেলে হাসান মোহাম্মদ রাফিকে ব্যাংকিং ও ইন্স্যুরেন্স বিভাগে নিয়োগ নিশ্চিত করেছেন। এছাড়া দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত “চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৫ মাসে ২৫০ নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক” শীর্ষক প্রতিবেদনে জানা যায়, বাংলা বিভাগের সভাপতি আনোয়ার সাঈদ লিখিতভাবে জানিয়েছেন যে তার বিভাগে শিক্ষকের কোনো প্রয়োজন নেই — তবুও সেখানে জোরপূর্বক সাতটি পদের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে। একইভাবে ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের সভাপতি আলতাফ হোসেন জানান, পরিকল্পনা কমিটির অনুমোদন ছাড়াই তার বিভাগে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে। ওই বিভাগে স্বজনপ্রীতির অভিযোগে ২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর তিনজন প্রার্থী সংবাদ সম্মেলন করলেও প্রশাসন তা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেছে। এছাড়া চবি ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন জামায়াতপন্থী রেজিস্ট্রার সাইফুল ইসলামের ভাই আবদুল কাইউম।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে জামায়াতপন্থী প্রশাসনের এই নগ্ন স্বজনপ্রীতি ও নিয়োগ-জালিয়াতি মূলত তাদের সুপ্ত ফ্যাসিবাদী চরিত্রের এক কুৎসিত ট্রেইলার মাত্র। এই স্বাধীনতাবিরোধী ও সাম্প্রদায়িক অপশক্তি আজ একটি বিদ্যাপীঠে যে পৈশাচিক লালসার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে, তা থেকে স্পষ্ট যে, রাষ্ট্রযন্ত্রের চাবিকাঠি কিংবা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ পেলে তারা গোটা দেশকে স্বজনপ্রীতির এক অন্ধকার গহ্বরে নিক্ষেপ করবে। প্রশাসনের এই দুঃশাসনের বিরুদ্ধে যখন সাধারণ শিক্ষার্থীদের হৃদয়ে ক্ষোভের দাবানল জ্বলছে, তখন শিবির-অধ্যুষিত চাকসু এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিবির-অধ্যুষিত ছাত্র সংসদগুলোর নির্লজ্জ নীরবতা প্রমাণ করে, এই নিয়োগ বাণিজ্যের সুবিধাভোগী হিসেবে তারাও জামায়াতপন্থী প্রশাসনের সঙ্গে নেপথ্যে সমঝোতায় লিপ্ত।

জামায়াতপন্থী প্রশাসনের এহেন কর্মকাণ্ড ও ছাত্র সংসদের এই নির্লজ্জ্ব নীরবতা অকাট্যভাবে প্রমাণ করে যে, রক্তস্নাত জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পবিত্র স্পিরিটকে নাকচ করে তারা মূলত ৫ই আগস্ট পূর্ববর্তী সেই পুরনো ফ্যাসিবাদী কাঠামোকেই ভিন্ন লেবাসে পুনঃস্থাপন করতে মরিয়া। এই সাম্প্রদায়িক বিষবৃক্ষকে এখনই সমূলে উৎপাটন করতে না পারলে আগামীর বাংলাদেশ এক ভয়াবহ অস্তিত্বের সংকটে নিপতিত হবে। আমরা সাধারণ শিক্ষার্থীদের আহ্বান জানাচ্ছি, এই নব্য ফ্যাসিবাদী শক্তির অন্যায় ও স্বজনপ্রীতির বিরুদ্ধে বজ্রকঠিন প্রতিরোধ গড়ে তুলতে, যাতে আমাদের মেধা ও অধিকার সংরক্ষিত হয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ফের কোনো বিশেষ সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর দখলদারিত্ব স্থায়ী না হতে পারে।

এই প্রেক্ষাপটে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের দাবিসমূহ—

১) স্পষ্ট স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের অভিযোগে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও উপ-উপাচার্য তাদের পদে থাকার নৈতিক অধিকার হারিয়েছেন; অবিলম্বে তাদের পদত্যাগ করতে হবে।

২) উপ-উপাচার্যের কন্যাসহ সকল বিতর্কিত ও অবৈধ নিয়োগ অবিলম্বে বাতিল করতে হবে।

৩) ইউজিসির (UGC) নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে যারা নিয়োগ বোর্ড পরিচালনা করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।

৪) বিভাগীয় সভাপতিদের আপত্তি ও পরিকল্পনা কমিটির সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে দেওয়া সব নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রত্যাহার করতে হবে এবং স্বচ্ছ ও ন্যায্য নিয়োগ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে।

জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল স্পষ্ট করে জানিয়ে দিতে চায়, ছাত্র-জনতার রক্তের বিনিময়ে অর্জিত ফ্যাসিবাদমুক্ত এই নতুন বাংলাদেশে কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর দলীয়করণ বা স্বজনপ্রীতি বরদাশত করা হবে না। মেধার অবমূল্যায়ন করে এই জামায়াতপন্থী প্রশাসন যদি তাদের আজ্ঞাবহদের অবৈধ নিয়োগ বাতিল না করে, তবে সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিয়ে ছাত্রদল কঠোর আন্দোলন গড়ে তুলবে।

- Advertisement -spot_img
  • সর্বশেষ
  • পঠিত