ব্যক্তিগত ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত, অবৈধ হ্যান্ডসেট রোধ, চুরি হওয়া ফোন বন্ধ এবং মোবাইল বাজারের বিশৃঙ্খলা দূর করতে চালু হয়েছে ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার-এনইআইআর প্রকল্প। তবে বুধবার এই কার্যক্রম চালুর দিনই বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন-বিটিআরসি ভবনে হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয়েছে। এই ঘটনায় ৫৫ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং অজ্ঞাত ৫০০ থেকে ৬০০ জনকে আসামি ডিএমপি’র শেরেবাংলা নগর থানায় মামলা করা হয়েছে। গতকাল বিটিআরসি’র লিগ্যাল অ্যান্ড লাইসেন্সিং বিভাগের সহকারী পরিচালক মুহাম্মদ আশরাফুজ্জামান জাহেদ বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেন। একইসঙ্গে হামলা-ভাঙচুরের ঘটনায় আনুমানিক দুই কোটি এক লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলেও দাবি করেছে বিটিআরসি।
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, গত বৃহস্পতিবার বিকাল আনুমানিক সাড়ে ৩টার দিকে আগারগাঁও এলাকায় বিটিআরসি ভবনের সামনে জড়ো হন আন্দোলনকারীরা। তারা বিভিন্ন স্লোগান দিয়ে একপর্যায়ে পূর্বপরিকল্পিতভাবে বিটিআরসি ভবনের কাঁচের দেয়ালসহ বিভিন্ন অংশ ভাঙচুর করেন। ভাঙচুরের সময় বিটিআরসি ভবনের সামনে পার্ক করা ৫১ আসনবিশিষ্ট একটি এসি স্টাফ বাস (ঢাকা মেট্রো-ব-১৫-৭০৩৫) ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে প্রায় এক লাখ টাকার ক্ষতি হয়। সব মিলিয়ে বিটিআরসি ভবন ও যানবাহন ভাঙচুরে আনুমানিক দুই কোটি এক লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এজাহারে বিটিআরসি বলেছে, মোবাইল ফোন ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি অংশ এনইআইআর সিস্টেম চালুর বিরোধিতা করে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসছিল। তাদের দাবি-দাওয়া নিয়ে বিটিআরসি চেয়ারম্যানের সঙ্গে একাধিক বৈঠক হলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১লা জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে এনইআইআর সিস্টেম চালু করা হয়। পরে এনইআইআর চালুর খবরে আন্দোলনকারীরা আরও ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। তারা বিটিআরসি ভবনের সামনে সড়ক অবরোধ করেন এবং কমিশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেন। ঘটনাস্থলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা উপস্থিত হলে দুষ্কৃতকারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পালানোর চেষ্টা করেন। এ সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ঘটনাস্থল থেকে ৪৫ জনকে আটক করে। জিজ্ঞাসাবাদে আটক ব্যক্তিরা আরও ১০ জন পলাতক আসামির নাম প্রকাশ করেন এবং তাদের সহায়তায় এ নাশকতা চালানো হয়েছে বলে স্বীকার করেন।
এদিকে এনইআইআর কার্যক্রম চালুর প্রতিবাদে অনির্দিষ্টকালের জন্য সারা দেশে মোবাইল ব্যবসা সংক্রান্ত সব দোকান বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। মোবাইল আমদানিতে করহার কমানো, এনওসি প্রক্রিয়া সহজীকরণ, আটক ব্যবসায়ীদের মুক্তি ও মামলা প্রত্যাহারসহ তাদের ঘোষিত দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত এই কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছে মোবাইল বিজনেস কমিউনিটি বাংলাদেশ (এমবিসিবি)। গতকাল দুপুরে সংগঠনটির সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট শামীম মোল্লা বলেন, মোবাইল ব্যবসায়ীদের প্রধান দাবি হলো মোবাইল আমদানির ক্ষেত্রে বিটিআরসি নির্ধারিত বিভিন্ন ধরনের এনওসি (মাদার কোম্পানি এনওসি, লোকাল এনওসি ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল এনওসি) সহজীকরণ করা এবং করহার সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনা। একইসঙ্গে মোবাইল আমদানিতে মোট করহার সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ হওয়া উচিত। পাশাপাশি ইউজড (ব্যবহৃত) মোবাইল ফোন আমদানির জন্য আলাদা নীতিমালা প্রণয়নের দাবিও রয়েছে আমাদের। তিনি বলেন, এসব দাবি নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, এনবিআর, বিটিআরসি ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে আমাদের একাধিকবার আলোচনা হয়েছে। আলোচনায় ছয় মাস সময় চাওয়া হলেও একপর্যায়ে তিন মাসের একটি ‘গ্রেস পিরিয়ড’ দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয় আমাদেরকে। এই গ্রেস পিরিয়ডের মধ্যে আমাদের ব্যাবসায়ীদের স্টকে থাকা মোবাইল ফোনগুলো বিক্রির সুযোগ দেয়ার কথা বলা হয়েছিল এবং এরপরই এই এনইআইআর কার্যক্রম শুরুর আশ্বাস দেয়া হয়েছিল। তবে ব্যবসায়ীদের কোনো অভিযোগ, কর সংক্রান্ত সমস্যার কোনো সমাধান না করেই বিটিআরসি এনইআইআর কার্যক্রম চালু করেছে। বিটিআরসি চেয়ারম্যান একাধিকবার কর ইস্যু নিষ্পত্তির প্রতিশ্রুতি দিলেও শেষ পর্যন্ত তা রক্ষা করেননি। এমনকি বৃহস্পতিবার সকালেও এ বিষয়ে তার সঙ্গে ফোনে কথা হয়। এরপরও এনইআইআর কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। এই এনইআইআর চালু হওয়ার পর অনেক গ্রাহকেরই মোবাইল ফোন বন্ধ হয়ে গেছে। গ্রাহকদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে ব্যবসায়ীরা বিটিআরসি চেয়ারম্যানের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার চেষ্টা করলেও বৈঠক না হওয়ায় তারা বিকালে সেখান থেকে বের হয়ে যান। এ সময় বিটিআরসি ভবনের পূর্ব পাশ থেকে একদল লোক এসে ভাঙচুর শুরু করে। এ সময় আমরা ব্যবসায়ীরা পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করলেও পরে নিরাপত্তার কারণে এলাকা ত্যাগ করি। কিছু না করার পরও এখন পর্যন্ত আমাদের প্রায় ৪৬ জনকে আটক করা হয়েছে। একইসঙ্গে ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে মামলা দেয়া হয়েছে। তাই আমাদের আটক বন্ধুদের মুক্তি এবং মামলা প্রত্যাহারসহ আমাদের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমাদের কর্মসূচি চলবে। দোকান বন্ধ থাকবে।

