বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লীগ (বিপিএল) আবারো আলোচনায়, তবে এবার ভিন্ন এক চ্যালেঞ্জ নিয়ে। ক্রিকেট বিশ্বে সাড়া জাগানো এই টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্টকে সফল করতে এবার ফ্র্যাঞ্চাইজিদের সামনে রাখা হয়েছে ১০ কোটি টাকার ব্যাংক গ্যারান্টির এক কঠিন শর্ত, যা ফ্র্যাঞ্চাইজি পাওয়ার দিন থেকে পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে বিসিবিকে দিতে হবে। বিসিবি’র এই পদক্ষেপে একদিকে যেমন টুর্নামেন্টের আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নেয়া হয়েছে, অন্যদিকে তেমনি ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর আর্থিক সক্ষমতাও প্রশ্নের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। অতীতে একাধিক ফ্র্যাঞ্চাইজির বেতন পরিশোধে ব্যর্থতা এবং চুক্তিভঙ্গের তিক্ত অভিজ্ঞতা থাকায়, বিপিএল-এর দীর্ঘমেয়াদী বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষার জন্য এই কঠোর শর্তকে অপরিহার্য বলে মনে করা হচ্ছে। এই কঠিন আর্থিক বাধ্যবাধকতা টুর্নামেন্টের মানোন্নয়ন ও খেলোয়াড়দের স্বার্থ সুরক্ষার ক্ষেত্রে প্রাথমিক ধাপ হিসেবে কাজ করবে। এই শর্ত কতটা কার্যকর হবে এবং ফ্র্যাঞ্চাইজিরা তা পূরণ করতে পারবে কিনা, তা নিয়ে চলছে জোর জল্পনা-কল্পনা। বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিলের সদস্য সচিব ইফতেখার রহমান মিঠু এই বিষয়ে দৈনিক মানবজমিনকে বলেন, ‘বিশ্বাস রাখুন। এখানে কিন্তু আমাদের স্পষ্ট ক্লজ আছে। আপনি যদি এই গ্যারান্টিটা পাঁচ দিনের মধ্যে না দিতে পারেন, তাহলে তো উনাদের দুই কোটি টাকা বাজেয়াপ্ত (ফরফিট) হয়ে যাবে। অতএব, আশা করছি যে দুই কোটি টাকা সামান্য নয়। নিশ্চিতভাবেই সবাই বিষয়টি অবগত হয়েই এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন।’ যদিও দল পাওয়া ফ্র্যাঞ্চাইজিদের অনেকেই এ নিয়ে এখনই কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
গত আসরের অভিযোগ ও অনিয়মের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার বিপিএলকে বিতর্কমুক্ত করতে বদ্ধপরিকর বিসিবি। মাত্র এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে বিপিএল আয়োজনের মতো কঠিন কাজকে বাস্তবে রূপ দিতে গভর্নিং কাউন্সিল অক্লান্ত পরিশ্রম করেছে। এই স্বল্প সময়ের মধ্যেও টুর্নামেন্টকে সুশৃঙ্খল করতে বিসিবি গ্রহণ করেছে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি। আর্থিক সক্ষমতা যাচাইয়ের জন্য দুই দফা যাচাই-বাছাই, কাগজপত্রের খুঁটিনাটি বিশ্লেষণ এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণের পর শেষ পর্যন্ত পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে দল গঠনের চূড়ান্ত অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর পরীক্ষা এখনও শেষ হয়নি। আগামী পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে ১০ কোটি টাকার ব্যাংক গ্যারান্টি দিতে ব্যর্থ হলে চূড়ান্ত হওয়া প্রতিষ্ঠানও ড্রাফটের টেবিলে বসার সুযোগ পাবে না।
ফ্র্যাঞ্চাইজিদের আর্থিক প্রতিশ্রুতির চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে এই সময়সীমা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১০ কোটি টাকার ব্যাংক গ্যারান্টি কোনোভাবেই কমানো হবে না জানিয়ে ইফতেখার রহমান মিঠু এই বিষয়ে আরও বলেন, ‘না, না, এখানে কোনো এটা আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার না। ব্যাপারটা হচ্ছে এটা পুরো কমিটির ব্যাপার। আমরা যা যা বলে দিয়েছি, সে ব্যাপারে আমরা অত্যন্ত কঠোর। এ ক্ষেত্রে আমরা শূন্য সহনশীলতায় (জিরো টলারেন্স) রয়েছি।’ এই কঠোর নীতি ইঙ্গিত দেয় যে, বিসিবি এবার যেকোনো মূল্যে টুর্নামেন্টের মান ও বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষা করতে চায়, যা বিশ্ব ক্রিকেটে বিপিএল-এর ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারে সহায়তা করবে। আগের বিপিএল আসরগুলোতে টিম হোটেলে স্বচ্ছতার অভাব এবং অবাধ প্রবেশের মতো অভিযোগ উঠেছিল, যা ম্যাচ ফিক্সিং বা স্পট ফিক্সিংয়ের মতো দুর্নীতির পথ খুলে দিতে পারতো। এবার সেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিসিবি আন্তর্জাতিক মানের ইন্টিগ্রিটি বিশেষজ্ঞ অ্যালেক্স মার্শালকে নিয়োগ দিয়েছে। এরই অংশ হিসেবে বিসিবি তাদের ইন্টিগ্রিটি বিভাগকে ঢেলে সাজাচ্ছে। একজন বিশ্বখ্যাত অ্যালেক্স মার্শালকে আনা হয়েছে, যিনি একসময় আইসিসি’র ইন্টিগ্রিটি চিফ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে এবারের বিপিএলকে আন্তর্জাতিক মানের মনিটরিংয়ের আওতায় আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। এই ‘আন্তর্জাতিক স্তরের পর্যবেক্ষণ’-এর অর্থ হলো টিম হোটেলগুলোতে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা, খেলোয়াড়দের জন্য দুর্নীতিবিরোধী (অ্যান্টি-করাপশন) সেশন পরিচালনা, এবং সন্দেহজনক কার্যকলাপের ওপর নিরবচ্ছিন্ন নজরদারি। এই বিষয়ে ইফতেখার রহমান মিঠু আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, ‘দেখুন, আমি তো অ্যালেক্স মার্শাল নই। আমরা একজন বিশ্বখ্যাত বিশেষজ্ঞ অ্যালেক্স মার্শালকে এনেছি। আমরা আশা করছি যে আন্তর্জাতিক মানের পর্যবেক্ষণ থাকবে। আপনারা জানেন, যাকে আনা হয়েছে, তিনি একসময় আইসিসি’র ইন্টিগ্রিটি প্রধান ছিলেন। আমরা বিশ্বের সেরা লোকটিকে এনেছি, তাই আশা করছি এবার পরিস্থিতি উন্নত হবে।’ এই পদক্ষেপগুলো বিপিএলের
ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারে এবং টুর্নামেন্টের বিশ্বস্ততা নিশ্চিত করতে অত্যন্ত সহায়ক হবে।
ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি যখন উত্তাল থাকবে, তখন বিপিএল আয়োজন করাটাও এক বড় চ্যালেঞ্জ। দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে অস্থিরতা আন্তর্জাতিক খেলোয়াড়দের অংশগ্রহণ এবং নির্বিঘ্ন যাতায়াতের ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে খেলোয়াড়দের যাতায়াত, ভেন্যু নিরাপত্তা এবং পুলিশি সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। টুর্নামেন্টের সফল আয়োজনের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ নিরাপত্তা এবং লজিস্টিক সহায়তা প্রয়োজন। তবে বিসিবি আত্মবিশ্বাসী যে সরকারের পূর্ণ সহযোগিতা তারা পাবে। বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিলের সদস্য সচিব ইফতেখার রহমান মিঠু এই বিষয়ে দৃঢ?তার সাথে বলেন, ‘শুনুন, সরকারের সবুজ সংকেত (গ্রিন সিগনাল) নিয়েই কিন্তু আমরা বিপিএল করছি। সরকার সব সময়ই আমাদের অত্যন্ত সহায়ক। আমরা আশা করছি একই স্তরের সহযোগিতা বজায় থাকবে।’

